নিশি উপাখ্যান সিরিজ
গল্প-৪
কথার দাগ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৯, জুন, ২০২৬
অভিক কোনো দিন নিশিকে বলেনি,
“আমি তোমাকে ঘৃণা করি।”
এমনও বলেনি,
“তুমি আমার জীবনের বোঝা।”
তবু একসময় নিশি নিজের সম্পর্কে এমন সব কথা ভাবতে শুরু করল, যেগুলো আগে কোনো দিন ভাবেনি।
শুরুর দিকে ব্যাপারগুলো খুব সাধারণ ছিল।
রান্নায় লবণ একটু কম হলে অভিক বলত,
“তোমার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আশা করাও ভুল।”
নতুন শাড়ি পরে নিশি জিজ্ঞেস করত, “কেমন লাগছে?”
অভিক একবার তাকিয়ে বলত,
“অন্য রঙটা পরলে ভালো লাগত।”
কথাটা বলেই টিভির চ্যানেল পাল্টে দিত। হয়তো ওর মনেও থাকত না। কিন্তু নিশির মনে রয়ে যেত।
অফিসের কোনো গল্প বলতে গিয়ে নিশি আটকে গেলে অভিক হেসে বলত,
“আগে একটু ভেবে বলো। সবাই এত ধৈর্য নিয়ে শোনে না।”
একটা কথাও খুব বড় ছিল না। কোনোটাই গালাগাল নয়। তবু প্রতিটা কথা কোথায় যেন জমছিল।
একদিন চাকরির ইন্টারভিউয়ের ডাক এল। চিঠিটা খুলে নিশি অনেকক্ষণ বসে রইল। তারপর ভাঁজ করে ড্রয়ারে রেখে দিল।
পাশের ঘর থেকে অভিক জিজ্ঞেস করল, “কী হলো?” “কিছু না।” আসলে ছিল।
সে শুধু মনে মনে ভাবছিল,
"আমার দ্বারা হবে না।"
কথাটা মনে হতেই নিজেই চমকে উঠল।
এটা কি সত্যিই তার নিজের কথা?
নাকি এত দিন ধরে শুনতে শুনতে একসময় নিজেরই হয়ে গেছে?
কয়েক দিন পর পুরোনো বন্ধু রিমির সঙ্গে দেখা। অনেকক্ষণ গল্প করার পর রিমি বলল,
“তুই আগে একটা কথা খুব জোর দিয়ে বলতে পারতিস। এখন প্রতিটা বাক্যের শেষে ‘হয়তো’, ‘জানি না’, ‘পারব না’ যোগ করিস কেন?”
নিশি হেসে বিষয়টা উড়িয়ে দিল। কিন্তু বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই কথাটা আবার মনে পড়ল।
সেদিন রাতেই ড্রয়ার খুলে ইন্টারভিউর চিঠিটা বের করল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভাঁজ খুলে ফেলল। পরদিন আবেদনপত্র জমা দিল।
ইন্টারভিউয়ের আগের রাতে অভিক বলল,
“কাল নীল শাড়িটা পরো। ওইটা পরলে তোমাকে বেশি মানায়।”
কথাটা মুখ থেকে বের হতেই সে থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিজেই হেসে বলল, “না… থাক। এটা আমার বলার কথা না। তুমি যেটায় স্বস্তি পাও, সেটাই পরো।” নিশি শুধু মাথা নাড়ল।
ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরে এলে অভিক জিজ্ঞেস করল, “কেমন হয়েছে?” “জানি না।”
একটু থেমে নিশি বলল, “তবে একটা কাজ করেছি। অনেক দিন পর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছি।” অভিক চুপ করে রইল। তারপর আস্তে বলল,
“আমি কি… তোমার আত্মবিশ্বাসটা ভেঙে দিয়েছি?”
নিশি উত্তর দিতে তাড়াহুড়ো করল না।
“তুমি হয়তো ইচ্ছে করে করোনি। কিন্তু তোমার কথাগুলো আমি একসময় নিজের কথা ভেবে ফেলেছিলাম।”
ঘরটা অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিল।
শেষ পর্যন্ত অভিক বলল, “আমি তো ভাবতাম সত্যিটাই বলছি।”
নিশি শান্ত গলায় বলল,
“সত্যি বলার আর কাউকে ছোট করে বলার মধ্যে পার্থক্য আছে।”
তারপর থেকে সবকিছু এক দিনে বদলে যায়নি। মাঝেমধ্যে অভিক আবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যেত। কোনো কথা বলতে গিয়েও থেমে যেত। নিজেকে ঠিক করত। নিশিও আর সব কথা চুপচাপ মেনে নিত না।
সেদিন রাতে ডায়েরি খুলে সে শুধু লিখল—"আজ গেছিলাম। হাত কাঁপে নাই।"
তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল। আর কিছু লেখার দরকার হলো না।
পরদিন সকালে শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ব্যাগটা কাঁধে তুলতেই আঁচলটা একটু সরে গেল। আগে হলে ঠিক করে নিত। আজ নিল না। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে আয়নায় একবার নিজের দিকে তাকাল। অনেক দিন পর নিজের হাসিটা নিজেরই মনে হলো।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।