#তুমি_অনিবার্য
লেখনি : ইসরাত জাহান
Part : 06
কৃষ্ণনগরের বাতাসে ভোরের কুয়াশা তখনো হালকা রূপকথার মতো ঝুলে ছিল। পরের দিনের সকাল—কিন্তু মেহুর রাতের দুঃশ্চিন্তা যেন এখনও চোখে লেগে আছে। রায়বাড়ির দীর্ঘ বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে সে তাকিয়ে আছে উঠোনের বটগাছটার দিকে যে গাছের নিচে তার শৈশবের কত হাসি, কত কান্না লুকিয়ে আছে। ঠিক তার পাশেই শিউলি-গাছের ঝরাপাতারা এখনো মাটিকে ধবধবে সাদা করে রেখেছে।
মেহুর চোখ দুটো লালচে। গত রাতের ঈর্ষা, অস্থিরতা, আর নিজের অনুভূতি স্বীকার করার ভয়—সব মিলিয়ে সে ঠিকমতো ঘুমোতেই পারেনি।
রায়বাড়ির সকালটা সাধারণত বেশ সরব থাকে। কিন্তু আজ ঘরে অস্বস্তিকর এক নিস্তব্ধতা। কারণ মেহুর বাবা—মাজেদুল রায় যাকে কৃষ্ণনগরে সবাই চেনে তার কঠোরতা আর দূরত্বের জন্য আজও সকালেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন কোনো কথা না বলেই।
মেহু অভ্যস্ত তার বাবা মা ও এক মাএ মেয়ের খোঁজ খুব একটা নেন না। কখনো কেমন আছে, কখনো কিছু খেয়েছে কিনা এসব প্রশ্ন যেন তার অভিধানে নেই। মা-ও বহুদিন ধরেই নিরুপায় হয়ে গেছেন। রায়বাড়ির লম্বা করিডোরের প্রতিটি দরজায় যেন বাবার অবহেলা জমে আছে ধুলো হয়ে।
এই পরিবেশেই মেহুর বেড়ে ওঠা স্বাভাবিকভাবেই তার হৃদয় কিছুটা নরম, কিছুটা ভীত, আর খুব সহজে আঘাতপ্রবণ।
আজ এসব আরো তীব্রভাবে টের পাচ্ছে মেহু।
কারণ ঈশান আর আলিয়ার গতকালের কথোপকথন তার মনে দগদগে হয়ে আছে।
৹ ঈশান এখনো জানে না আলিয়া তাকে তিন বছর আগেই পছন্দ করতে শুরু করেছিল।
তখন কৃষ্ণনগরের এক সাহিত্য সম্মেলনে ঈশান অতিথি বক্তা হিসেবে গিয়েছিল। বয়স কম হলেও তার ভাবনা-প্রবাহ, শব্দচয়ন, আর চোখের শান্ত গভীরতা অনেককে মুগ্ধ করেছিল। ভিড়ের মাঝেও আলিয়ার নজর ঈশানের ওপর আটকে গিয়েছিল। সেই থেকে একতরফা টান শুরু হয় তার।
কিন্তু ঈশান তাকে কখনোই বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি না অপমান করেছে, না আগ্রহ দেখিয়েছে। আলিয়া বহুবার ঈশানের কাছে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের শহর আলাদা ছিল, যোগাযোগের মাধ্যমও আলিয়ার হাতে ঠিকমতো ছিল না। তাই টানটা চেপে রাখা অনুভূতি হয়ে থেকে যায়।
তারপর তিন বছর পর মেহুর মাধ্যমে আবার ঈশানের সঙ্গে দেখা আর সেই দেখাতেই আলিয়ার মনে পুরনো আকর্ষণ জেগে উঠল। কিন্তু তার স্বভাবের সেই হালকা অহংকার, সেই লুকানো অধিকারবোধ তাকে আজও বদলাতে পারেনি।
আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার । আলিয়া মেহুকে কখনোই মন থেকে পছন্দ করতে পারেনি।কারণ ছোট থেকেই মেহুর সেই মার্জিত সরলতা, চুপচাপ স্বভাব, আর সবাইকে সম্মান করার অভ্যাস আলিয়ার চোখে সবসময় “অতিরিক্ত ভালো” মনে হতো। এছাড়া, মেহুর সৌন্দর্যও তাকে অস্বস্তিতে ফেলত—সাদামাটা পোশাকেও মেহুর চোখদুটো এত শান্ত আর গভীর হয়ে ওঠে যে আলিয়া চাইলেও উপেক্ষা করতে পারে না।
অবচেতনে মনে মনে সে ভাবত—
“মেহুকে ঈশান থেকে দূরে রাখা দরকার।”
এই কারণেই তার কথাবার্তায় সবসময় একটা লুকানো তীক্ষ্ণতা থাকে।
ঐতিহাসিক রায়বাড়িটা কৃষ্ণনগরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক গল্পভরা দালান । মাটির রঙের পুরনো দেওয়ালে শ্যাওলা আর সময়ের দাগ, ভাঙা বারান্দার রেলিং, আর পুরনো কাঠের দরজার কড়িকাঠ থেকে যেন ধ্বনিত হয় অতীতের স্মৃতি।রায়বাড়ির উত্তর দিক ঘেঁষেই সেই পুরনো বটগাছ। তার নিচে ছোট্ট জায়গাটা পরিবারে “শিউলি-চত্বর” নামে পরিচিত—কারণ সেখানে শিউলি গাছের পাতা সারা বছর ধরে ঝরে পড়ে।সেই জায়গাটাই মেহুর প্রিয়।সেখানে বসে সে বই পড়ে, কখনো ডায়রিতে লেখে, কখনো কাঁদে।
আজও সেখানে বসে মাটি থেকে শিউলি কুড়িয়ে হাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে।
সকালের একটু পরে ঈশান চলে এল রায়বাড়িতে। সে মেহুকে দেখামাত্র বুঝল মেয়েটার চোখে কালচে ছাপ, ঠোঁট শুকনো, মন ভাঙা।
কিন্তু সে কোনো জোরাজুরি করল না।
মেহুর কাছে গিয়ে কেবল এভাবে বলল,
“আজ খুব চুপচাপ তুই।”
শব্দগুলো ছিল কোমল, কিন্তু তাতে কোনো চাপ ছিল না। যেন বলতে চাইছে—
“চাইলে কথা বলবে, চাইলে না।”
এই ভদ্র দূরত্বটাই ঈশানের বিশেষত্ব।
এদিকে মেহুর মনে আবার সেই দৃশ্য আলিয়ার ঈশানের কাছে ঝুঁকে গিয়ে ফিসফিস করে কথা বলা।
আর ঈশান চুপ করে শোনে। যদিও ঈশানের মুখে তখন বিরক্তি ছিল, যা আলিয়া বুঝতেই পারেনি।
মেহু মাথা নিচু করল।
“ভালো ঘুম হয়নি।”
ঈশান একটু চিন্তিত হলো, কিন্তু কিছু বলে চাপ দিতে চাইল না।অনেকক্ষণ পর রায়বাড়ির গেট দিয়ে আলিয়া ঢুকল। আজও তার আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি চোখে পড়ার মতো। আধুনিক পোশাকে, লাল ঠোঁট, হালকা পারফিউম সব মিলিয়ে সে যেন তার উপস্থিতি দৃঢ় করে তুলতে চায়।
দূর থেকেই চোখে পড়ল ঈশান শিউলি-চত্বরে দাঁড়ানো, আর মেহু পাশেই।মেহুর মুখে ক্লান্তি।ঈশানের মুখে নীরবতা । আলিয়া বুঝতে দেরি করল না মেহুর দুর্বলতার জায়গাটা আজই।
সে এগিয়ে এসে হাসল।
“ওহ, সবাই এখানে? মেহু, আজও তোকে খুব ফ্যাকাসে দেখাচ্ছো। সব ঠিক তো?”
কথাটা যত্নের মতো শোনালেও তাতে ছিল সূক্ষ্ম খোঁচা।
ঈশান বুঝল আলিয়ার এতো আগ্রহের কারণ শুভ না।
কিন্তু তার স্বভাব অনুযায়ী সে তর্কে গেল না।
বরং হালকা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে রইল।
আলিয়া ঈশানের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল
“গত রাতের কথা ভাবছিলাম। তুমি সত্যিই গভীর কথা বলো। তোমার সঙ্গে… আরও কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলে ভালো লাগত।”
ঈশানের চোখে স্পষ্ট বিরক্তির ছায়া ভেসে উঠল।
কিন্তু সে সরাসরি কিছু বলল না।
শুধু ভদ্রভাবে বলল
“আজ অনেক কাজ আছে, আলিয়া। পরে কথা হবে।”
এই “পরে” কথাটা যতটা ভদ্র, তার ভেতরকার দিকটা ততটাই “দূরে থাকো”।
কিন্তু আলিয়া তা বুঝল নাবরং মনে করল ঈশান ভদ্রতা দেখাচ্ছে।
হঠাৎ রায়বাড়ির ভেতর থেকে এক কড়া গলার ডাক
“মেহু! কোথায় তুই?”
মেহুর কাকা, আবদুল কাদের রায়।মাঝ বয়সী, কিন্তু উদার মন, হাসিখুশি স্বভাব। মেহুর বাবার মতো কঠোর নন। তিনিই আসলে মেহু আর তার মায়ের সবচেয়ে বড় ভরসা।
কাকা এসে ঈশানকে দেখে মৃদু হাসলেন।
“তুমি সেই ঈশান তো? কৃষ্ণনগরে এখন তোমার বেশ নাম শুনছি।”
ঈশান সম্মান দিয়ে সালাম করল।
কাকা মেহুর মাথায় হাত রেখে বললেন
“আমার মাটাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আজ ওর একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার।”
মেহু মুখ নিচু করে রইল।
ঈশান বুঝতে পারল বাড়ির ভেতরকার টানাপড়েনেও মেহুর মানসিক ক্লান্তি বাড়ছে।
চলবে..??
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।