#তুমি_অনিবার্য
পর্ব: ১০
মেহু বাড়ির পেছনের সেই সংকীর্ণ কাঠের সিঁড়িতে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তখন বাইরের ধূসর আকাশটা যেন আরও গাঢ় হয়ে নামল। মাজেদুল রায়ের সেই ‘বজ্রগম্ভীর’ ডাকটা কেবল একটি প্রশ্ন ছিল না, ওটা ছিল এক অবরুদ্ধ খাঁচার বিচারকের অন্তিম পরোয়ানা। মেহুর সাদা সুতির কামিজের প্রান্ত তখনো জলঙ্গীর ঘাটের সেই সেঁতসেঁতে আর্দ্রতা আর ঈশানের আঙুলের অদৃশ্য স্পর্শের ভার বহন করছে। তার হৃৎপিণ্ডটা বুকের পাঁজরে এমনভাবে আঘাত করছিল, যেন তা কোনো বন্দি পাখির ডানার ঝটপটানি।
মাজেদুল রায় ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। তাঁর প্রতিটি পদধ্বনি কাঠের সিঁড়িতে এক একটা দণ্ডাদেশের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তাঁর পরনে ইস্ত্রি করা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টিতে কোনো শুভ্রতা ছিল না; সেখানে ছিল কেবল আভিজাত্যের কঠোর অহংকার। তিনি মেহুর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীরের সেই কড়া তামাক আর রাগী পারফিউমের গন্ধ মেহুর শ্বাসরোধ করে দিচ্ছিল।
—“বাইরে কেন গিয়েছিলে?”
মাজেদুল সাহেবের কণ্ঠস্বর এবার আরও নিচু, আরও তীক্ষ্ণ। যখন তিনি খুব নিচু স্বরে কথা বলেন, তখন তা কৃষ্ণনগরের বাতাসের চেয়েও বেশি শীতল শোনায়।
মেহু দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
—“একটু... হাওয়া খেতে গিয়েছিলাম বাবা। ঘরে দম বন্ধ হয়ে আসছিল।”
—“হাওয়া? নাকি কারো নেশার ভাগ নিতে গিয়েছিলে?” মাজেদুল সাহেবের ঠোঁটে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই জানালার বাইরের সেই বিষাক্ত ফিসফাস আবার ভেসে এল। জোহরা বিবি আর কুলসুম বেগম তখনো বাড়ির সীমানা ছাড়াননি। তাঁদের উচ্চকণ্ঠের আলোচনা ইচ্ছাকৃতভাবেই মাজেদুল সাহেবের কানে পৌঁছে দিচ্ছিল—
“ও বুবু, দেখেছো? মাজেদুল সাহেবের কলিজার টুকরো এখন রক্তের আলপনা আঁকা শিখছে! বাউন্ডুলে ছেলেটা তো রাস্তায় রক্ত গঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে মেয়ের জন্য!”
মাজেদুল সাহেবের মুখটা রাগে বেগুনি হয়ে উঠল। তিনি মেহুর হাতটা সজোরে চেপে ধরলেন। সেই মুঠোয় কোনো বাবার স্নেহ ছিল না, ছিল এক শাসকের অধিকারবোধ। ঠিক তখনই বাইরের সদর দরজায় সজোরে আঘাত করার শব্দ শোনা গেল। ডুম-ডুম-ডুম! সাথে এক আর্তনাদমাখানো কণ্ঠস্বর, যা মেহুর আত্মার ভেতর গিয়ে বিঁধল।
—“মেহু! বের হয়ে আয়! তুই চলে আসতেই এই আকাশটা আবার অন্ধ হয়ে গেছে! আমি তোকে ছাড়া এই ধূসরতা সইতে পারছি না মেহু!”
ওটা ঈশান। সেই শান্ত, সৌম্য, গাণিতিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী ঈশান নয়। এ এক অন্য মানুষ। এ যেন কোনো প্রাচীন ট্র্যাজেডির সেই ‘ম্যাড হিরো’, যে তার আরাধ্যকে পাওয়ার জন্য নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।
মাজেদুল রায় মেহুকে টেনে বারান্দায় নিয়ে এলেন। নিচে কৃষ্ণনগরের সেই পরিচিত রাস্তার মোড়ে এক অভাবনীয় দৃশ্য। ঈশান দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টিভেজা পিচঢালা রাস্তার ওপর। তার এক হাতে সেই প্রিয় স্কেচবুকটা তখনো ধরা, কিন্তু অন্য হাতের তালু থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে একটা তীক্ষ্ণ কাঁচের টুকরো দিয়ে নিজের হাতের তালুতে যেন কোনো জ্যামিতিক নকশা কাটার চেষ্টা করেছে। রক্ত চুইয়ে চুইয়ে তার সেই সাদা পাঞ্জাবিকে রাঙিয়ে দিচ্ছে যেন শ্বেতশুভ্র ক্যানভাসে এক অনিচ্ছাকৃত বিমূর্ত চিত্রকর্ম।
পাড়ার মানুষ জমে গেছে। জোহরা বিবি আর কুলসুম বেগম পানের বাটা হাতে নিয়ে উৎসুক চোখে এই ‘যৌবন-জ্বালা’ উপভোগ করছেন। ঈশানের চোখের সেই প্রখর জ্যোতিতে আজ কোনো লজিক নেই, আছে কেবল এক সর্বগ্রাসী আসক্তি। সে ওপরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল
—“মেহু! তুই বলেছিলি আমাদের বন্ধুত্ব স্থির আলো! কিন্তু দেখ, আমার এই অন্ধকারটা কত বেশি উজ্জ্বল! তুই আমার নেশা, তুই আমার কবিতার সেই শেষ শব্দ যা ছাড়া আমার জীবনটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে! তোর ওই রায়বাড়ির আভিজাত্যের চেয়ে আমার এই রক্ত অনেক বেশি সত্য, মেহু!”
মেহু দুহাতে মুখ ঢাকল। তার চোখের জল হাতের আঙুল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। সে বুঝতে পারছিল, সে সেদিন গ্রন্থাগারে যা অস্বীকার করার চেষ্টা করেছিল, আজ তা এক ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী সত্য হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। ঈশান তাকে ভালোবাসে না, ঈশান তাকে ‘উপাসনা’ করে। আর এই উপাসনা যখন পাগলামির পর্যায়ে যায়, তখন তা উপাসক আর উপাস্য উভয়কেই পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।
মাজেদুল রায় বারান্দার গ্রিল ধরে রাগে কাঁপছিলেন। তিনি হুংকার দিয়ে উঠলেন,
—“অসভ্য ছোকরা! নিজের সীমা ভুলে যাস না। এটা রায়বাড়ি! এখানে শৌখিনতা আছে, কিন্তু তোর মতো পাগলের কোনো স্থান নেই। এখনই বিদায় হ, নয়তো আজ তোকে আমি জ্যান্ত কবর দেব!”
ঈশান পাগলের মতো হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত ‘কাব্যিক করুণা’ ছিল। সে মাজেদুল রায়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
—“কবর তো আমি আগেই হয়ে গেছি সাহেব! মেহু যখন এই বাড়িটার ভেতরে ঢোকে, তখন আমার পৃথিবীটা একটা কফিন হয়ে যায়। আমি তো সেই কফিন ভেঙে বেরিয়ে আসা এক ভূত! আপনি আমাকে কী মারবেন? আমি তো মেহুর প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসে আগে থেকেই মরে আছি!”
সে আবার মেহুর দিকে তাকাল। তার চোখের মণি দুটো এক অদ্ভুত তীব্রতায় জ্বলছে। সে হাতের রক্তমাখা আঙুল দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করল।
—“মেহু, তুই কি দেখতে পাচ্ছিস? মেঘেরা তোর কামিজের রঙের মতো সাদা হতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। কারণ তুই এই মাটির পৃথিবীর মেয়ে নোস, তুই আমার সেই ‘অনিবার্য’ ধ্বংস যা আমি সানন্দে বরণ করে নিয়েছি!”
মেহু আর থাকতে পারল না। সে বাবার শাসন উপেক্ষা করে নিচের দিকে নামার চেষ্টা করল। মাজেদুল সাহেব তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন।
—“ঘরে ঢোক! আজ থেকে তোর ওপর এই জানলা-দরজাও নিষিদ্ধ!”
ঈশান চিৎকার করে শেষ কথাটি বলল, যা পুরো কৃষ্ণনগরের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল
—“আমি যাচ্ছি মেহু! কিন্তু মনে রাখিস, তোর শরীরের সুতোর ঘ্রাণ আর তোর জানলার ওই শিউলি ফুলের গন্ধ সবকিছুর মধ্যে আমি মিশে থাকব। তুই পালাতে চাস তো? পালা! কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখবি, তোর চোখের ওই কালচে ছায়াটায় আমিই বসে আছি। তুই অনিবাৰ্যভাবেই আমার, আর আমি অনিবাৰ্যভাবেই তোর ধ্বংস!”
ঈশান টলতে টলতে অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে গেল। জোহরা বিবি আর কুলসুম বেগম ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, -“দেখলে বুবু? রক্তারক্তি কাণ্ড! এই প্রেমের শেষ তো গারদে না হয় শ্মশানে।”
মাজেদুল রায় মেহুর চুলের মুঠি ধরে তাকে অন্ধকার ঘরের ভেতর ঠেলে দিলেন। দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। জলঙ্গী নদীর পাড় ধুয়ে যাচ্ছে, ধুয়ে যাচ্ছে ঈশানের ফেলে যাওয়া রক্তের দাগ। কিন্তু মেহুর মনের সেই অদৃশ্য ক্ষত থেকে যে রক্তক্ষরণ শুরু হলো, তা মোছার সাধ্য কার?
মেহু অন্ধকার মেঝের ওপর পড়ে রইল। তার কানের কাছে ঈশানের সেই শেষ অট্টহাসি আর ‘অনিবার্য’ শব্দটি বারবার আছড়ে পড়ছিল। সে অনুভব করল, তার জীবনের সেই ‘স্থির আলো’টি আজ চিরকালের জন্য নিভে গেছে, আর সেখানে জায়গা করে নিয়েছে এক ‘প্রচ্ছন্ন অন্ধকার’ যেখানে শুধু নেশা আছে, আসক্তি আছে, আর
আছে এক ভয়ংকর সুন্দর পাগলামি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।