#তুমি অনিবার্য
Part -2
মেহুর স্পষ্ট, প্রায় প্রতিজ্ঞার মতো উচ্চারিত শব্দগুলো ঈশানের কৈশোরিক হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে এক তীক্ষ্ণ শেলের মতো বিঁধেছিল। প্রেম নয়। কখনও হবেও না। সেই বিকেলে কৃষ্ণনগরের পুরোনো ছাদটি সাক্ষী ছিল এক নির্বাক বিদায়ের। ঈশানের না বলা প্রেমটি তার মনের গভীরে চিরতরে সমাধিস্থ হলো, শুধু মেহুকে হারানোর ভয়টুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য। তাদের হাতের তালু তখনও একাকার, কিন্তু ঈশান সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করল তাদের সম্পর্কের মানচিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি রেখা দ্বারা আঁকা। একটি বন্ধুর, অন্যটি প্রেমিকের; আর এই দুটি রেখা কখনওই মিলিত হবে না।
____
সেদিন ছিল শনিবার। স্কুলের লম্বা ছুটির পর বিকেলে তাদের মিলনস্থল ছিল তাদের পাড়ার পুরোনো, বিশাল বটগাছটার নিচের চাতাল। বটগাছটি ছিল যেন তাদের নীরব অভিভাবক।
“কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি,”
মেহু বটগাছের শিকড়ে হেলান দিয়ে বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল। তার পরনে হালকা সবুজ সালোয়ার, আর চুলে একটা এলোমেলো বিনুনি।
ঈশান ঘাসের ওপর বসে একটি ভাঙা কাঠি দিয়ে মাটি খুঁড়ছিল।
“কেন?"
তার স্বরটি ছিল নির্লিপ্ত, কিন্তু চোখ মেহুর দিকে স্থির।
“স্বপ্ন দেখছিলাম। সেই পুরোনো ভূতের সিনেমাটা, মনে আছে? ‘নিশুতি রাতের যাত্রী’।
সেই যে এক কোনে বসে থাকা মেয়েটা, যে আসলে মানুষ নয়...?”
মেহু হেসে উঠলো, কিন্তু তার হাসিটা যেন একটু কৃত্রিম শোনাল।
ঈশান আলতো হেসে বলল, “ধুর! তুই তো সেই তখন থেকেই ভীতু। আজ তোকে একটা নতুন গল্প বলব, মেহু। রূপকথার নয়, একেবারেই মাটির গল্প।”
মেহু বই বন্ধ করে মনোযোগ দিল।
“বলো। তোমার নতুন দর্শন শোনাও।”
“কাল রাতে ভাবছিলাম, এই যে আমাদের বড় হয়ে যাওয়াটা,” ঈশান গভীর শ্বাস নিল, “এটা আসলে কী? এটা কি শুধু উচ্চতা আর ওজন বাড়া? নাকি আমাদের চারপাশের মানুষের চোখে আমাদের সংজ্ঞাও পাল্টে যাওয়া?”
মেহু তার দিকে ঝুঁকে এলো।
“কী বলতে চাইছিস স্পষ্ট করে বল।”
“দেখ, আমাদের যখন বয়স চার ছিল, তখন কেউ আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে কথা বলেনি। আজ, এই কৈশোরে, কেন তবে আমাদের দিকে বাঁকা চোখ? কেন এত ফিসফাস? সমাজ কেন আমাদের স্বাভাবিকতা দেখতে পায় না? কেন সবসময় একটা ‘অন্য কথা’ খুঁজতে হয়?” ঈশানের কন্ঠে ছিল এক চাপা ক্ষোভ।
মেহু বুঝতে পারল ঈশানের মন এখনও গতকালের কথোপকথনের ভারে আচ্ছন্ন। সে ঈশানের হাত ধরল। তাদের স্পর্শটি ছিল একান্তই বন্ধুর, স্নেহময়।
“শোন,” মেহু দৃঢ় স্বরে বলল। “মানুষের চোখ হল তাদের মনের আয়না। যারা নিজেদের জীবনে সরলতা খুঁজে পায় না, তারা অন্যের জীবনে জটিলতা আরোপ করতে চায়। আমরা তাদের চোখে বাঁচি না, ঈশান। আমাদের সম্পর্কটা একটা স্বচ্ছ নদীর মতো। এতে কোনো ঘোলা জল নেই। লোকে যা খুশি ভাবতে পারে। তুই আর আমি যতক্ষণ জানি যে এই বন্ধুত্বতা আকাশ আর মাটির মতো সত্য, ততক্ষণ বাইরের কোনো ঝড় আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।”
এই মুহূর্তে তাদের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল পাড়ার নতুন আসা এক ছেলে, অর্ণব। অর্ণব সদ্য শহরে এসেছে, তার মধ্যে একটি তীক্ষ্ণ, কৌতূহলী দৃষ্টি। বয়স তাদের কাছাকাছিই।
“তোমরা কী এমন গভীর বিষয়ে আলোচনা করছ যে এই বটতলার শান্ত পরিবেশও তোমাদের কথায় মুখরিত?” অর্ণবের গলায় ছিল কিছুটা তির্যক কৌতুক।
ঈশান এবং মেহু দুজনেই চমকে উঠল। তারা অপরিচিত কারও সাথে সহজে কথা বলে না।
“আমরা বন্ধু। আর বন্ধুত্ব নিয়ে কথা বলছিলাম,”
ঈশান উত্তর দিল। তার চোখে ছিল এক প্রকারের বিরক্তি।
অর্ণব আলতো হেসে এগিয়ে এলো।
“বন্ধুত্ব? এই বয়সে বন্ধুত্ব শব্দটার মানে পাল্টে যায়, ভাই। এই বয়সে, ছেলে-মেয়ে পাশাপাশি বসলে, তার নাম হয় ‘সম্পর্ক’।
যার শেষ পরিণতি শুধু প্রেম। প্রকৃতি তো এটাই চায়।”
সে একটি ডাল ভেঙে মাটিতে কিছু আঁকার চেষ্টা করল।
মেহু এবার শান্ত কিন্তু ধারালো স্বরে জবাব দিল,
-“প্রকৃতি যা চায়, তা তার নিজস্ব গতিতে ঘটে। কিন্তু মানুষের মন তো শুধু প্রকৃতির দাস নয়, অর্ণব। আমাদের মনের একটা নিজস্ব আকাশ আছে, যেখানে বন্ধুত্ব আর প্রেম—দুটো আলাদা নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে। তুমি সেই দুটোর দূরত্ব বোঝ না বলেই সব এক করে দেখছ।”
অর্ণব মেহুর দিকে তাকাল। তার চোখে ছিল মুগ্ধতা। এমন স্পষ্টবাদী মেয়ে সে আগে দেখেনি।
“দারুণ যুক্তি! কিন্তু তোমার চোখে এত আগুন কেন? তুমি কি ভয় পাও? ভয় পাও যে তোমাদের বন্ধুত্বও একসময় প্রেমের গভীর অতলে তলিয়ে যাবে?”
ঈশানের রক্ত গরম হয়ে উঠল। সে অর্ণবের সামনে উঠে দাঁড়াল।
“আমাদের সম্পর্কের সংজ্ঞা আমরা ঠিক করি। তুমি তৃতীয় ব্যক্তি, তোমার মন্তব্যের কোনো মূল্য নেই। তুমি বরং তোমার পথে যাও।”
অর্ণব হাসল। সে জানত না, তার এই সামান্য উস্কানি ঈশান আর মেহুর বন্ধুত্বকে আরও মজবুত করবে।
“বেশ! তোমরা তোমাদের নক্ষত্রদের নিয়ে থাকো। তবে একটা কথা মনে রেখো। যা অনিবার্য, তা একদিন আসবেই। বিদায়, নক্ষত্রযুগল!” অর্ণব চলে গেল।
অর্ণবের কথাগুলো ঈশানকে ভেতরে ভেতরে নাড়িয়ে দিল। অনিবার্য। এই শব্দটি তার মনে গভীর রেখাপাত করল। মেহুর প্রেম নয় বলার পরেও, তার ভেতরের অব্যক্ত অনুভূতিটি কি সত্যিই অনিবার্য?
“বাদ দে ওর কথা। ওর মন নোংরা,”
মেহু ঈশানকে শান্ত করতে চাইল।
ঈশান আবার মেহুর হাত ধরল। এইবার স্পর্শে কোনো জড়তা ছিল না, ছিল এক ধরণের প্রত্যয়।
“মেহু, যদি কোনোদিন এই পৃথিবী, বা সমাজ, বা অর্ণবের মতো কোনো মানুষ আমাদের মাঝখানে চলে আসে, তুই কি এই হাত ছেড়ে দিবি?”
মেহু তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল।
“কষ্ট করে তোকে বিশ্বাস করেছিলাম, ঈশান। আর একবার বিশ্বাস কর। আমি কোনোদিন আমার বন্ধুকে হারাবো না। এই বটগাছ, এই কৃষ্ণনগরের ছাদ—এরা সাক্ষী। তুই আমার ‘অনিবার্য’ অংশ। প্রেম থাকুক বা না থাকুক, তুই আমার জীবনে আছিস, এটাই সত্য। এই সম্পর্কটা একটা স্থির আলো, যা কোনো ঝড়ে নিভবে না।”
চলবে...??
( আগের অংশটা অনেকেই পড়েছেন… আর এখন আপনাদের সামনে Part–2।✨️
কেমন লাগল এই অংশটা—সেটা জানার অপেক্ষায় আছি।
আপনারা চাইলে আমি গল্পটা আরও এগিয়ে নিয়ে যাব… আর যদি মনে হয় এখানেই থামা উচিত, তাও বলতে পারেন।
আপনাদের প্রতিটা রিয়্যাকশনই ঠিক করে দেবে
গল্পটা কি সামনে এগোবে… নাকি এখানেই শেষ হবে।🤍🕊 )
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।