#তুমি_অনিবার্য
লেখনি: ইসরাত জাহান
Part:08
-মেহু! ও মেহুলী! তোকে এখনও ওই বটগাছের তলায় বসে থাকতে হবে? আরে বাবা, তোর এই দার্শনিক-মুডটা আর কতদিন চলবে?”
মেহু মুখ তুলে দেখল, তার ছোটবেলার বান্ধবী ঝুমুর।
ঝুমুর একদম বিপরীত মেরুর চরিত্র। মেহুর শান্ত, মার্জিত রূপের পাশে ঝুমুর যেন এক ঝলমলে রঙিন ঘুড়ি। প্রাণশক্তিতে ভরপুর, ঠোঁটে সবসময় হাসি, আর পোশাকও মেহুর মতো সাদামাটা নয় আজ সে পরেছে হলুদ-সাদা কুর্তা, আর কানে ছোট ছোট ঝুমকা।
মেহুকে দেখে ঝুমুর আর অপেক্ষা করল না। দৌড়ে এসে ঝপ করে মেহুর পাশে বসে পড়ল।
-“কিরে! আবার কোন গল্পের বই নিয়ে বসেছিস? না কি মাজেদুল চাচার কড়া শাসনের দুঃস্বপ্ন দেখছিস?”
ঝুমুর মেহুর একটা হাত চেপে ধরে হাসল।
মেহু একটু হাসার চেষ্টা করল। এই ঝুমুরই একমাত্র মানুষ, যার সামনে মেহু তার সব ভয় আর সংকোচকে আলগা করে দিতে পারে।
-“ধুস! কোনো বই নয়। এমনি...”
-“এমনি না ছাই!
ঝুমুর মেহুর মুখের দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকাল।
- “তোর লাল চোখ দুটো আর শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট তো সব বলে দিচ্ছে। নির্ঘাত কোনো একটা দুশ্চিন্তা নিয়ে রাত কাটিয়েছে। কী রে, কাল রাতে কোনো অশুভ আত্মা এসেছিল নাকি? নাকি কোনো সুদর্শন, গম্ভীর পুরুষের ভাবনা?”
-আরে না কী জাতা বলছিস!
ঝুমুর উঠে দাঁড়িয়ে মেহুকে টেনে তুলল।
-যথেষ্ট হয়েছে! চল। আজ তোর এই বিষাদগ্রস্ত রায়বাড়ি থেকে একটু মুক্তি দরকার। আমি তোকে নিতে এসেছি। তোকে আজ আমার সঙ্গে সারাটা দিন থাকতে হবে। তোর ওই 'শিউলি-চত্বর' আর তোর এই ‘দুশ্চিন্তা-চত্বর’—আজ সব ছুটি!”
মেহু দ্বিধায় পড়ল।
- “কোথায় যাবি? বাবা যদি জানতে পারে?”
ঝুমুর চোখ বড় বড় করল।
-“তোর বাবা কি সারা দিন বাড়ি পাহারা দেবে? আর যদি দেয়ও, তুই তো আর চুরমার করতে যাচ্ছিস না ।
-আচ্ছা বেশ ! চল ডং
ঝুমুর বিজয়ী হাসি হেসে মেহুর হাত ধরে প্রায় টেনে নিয়ে চলল। রায়বাড়ির গেটের বাইরেই ঝুমুরের বাবার পুরনো স্কুটারটা অপেক্ষা করছিল। ঝুমুর দ্রুত স্কুটারের চাবি ঘোরাল।
- বস সিট বেল্ট বাঁধার দরকার নেই। কৃষ্ণনগরে আমরা, বেপরোয়া হওয়াটা নিয়ম!
ঝুমুর জোরে হাসল।
মেহু পেছনে বসে ঝুমুরের কাঁধ শক্ত করে ধরল। স্কুটারটা যখন শহরের দিকে মোড় নিল, তখন রায়বাড়ির ভারিক্কি ছায়া মেহুর মন থেকে সরে গেল।
-“কোথায় যাচ্ছি আমরা?” মেহু চেঁচিয়ে বলল।
-“প্রথমত, নতুন বাজারের মোড়ে সেই কাকিমার হাতের মিষ্টি আলুর জিলাপি খাব! তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে তোর শরীরের সব মিষ্টি-সুগার লেভেল নাকি তলানিতে চলে গেছে! তারপর যাব সেই রেশম তাঁতের দোকানে। তোর জন্য একটা হালকা নীল রঙের শাড়ি পছন্দ করব, যেটা দেখলে তোর ওই গম্ভীরা-বাবাও না হেসে পারবে না!ঝুমুর হাসতে হাসতে বলল।
-“কী যে বলিস না! বাবার সামনে শাড়ি পরতে আমার ভয় করে।”
-“ভয়? ভয়টাকেই তো আজ তোর পেছনে ফেলে যেতে হবে। আর শোন! বিকেলে আমরা যাব জলঙ্গী নদীর পাড়ে। সূর্য ডোবার সময় দেখব আর তোর জীবনের সব সমস্যাগুলো নদীর জলে ভাসিয়ে দেব!”
স্কুটারটা ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল। দু’জনের হাসি আর খুনসুটি মিশে গেল কৃষ্ণনগরের সকালের কোলাহলে।
মিষ্টি আলুর জিলাপি খেতে গিয়ে মেহু জিলাপির রসে নিজের কুর্তায় দাগ লাগিয়ে ফেলল।
-“দেখলি! তুই তো এখনো সেই ছোট্ট মেহুই আছিস!” ঝুমুর টিপ্পনি কাটল।
-“আর তুই? তুই তো দেখছি বড় হয়ে গেছিস! স্কুটার চালানো শিখে গেছিস!” মেহু হাসল।
-“হ্যাঁ! শেখার একটাই কারণ। যাতে তোর মতো শান্তশিষ্ট রাজকন্যার জন্য যখন খুশি তখন ছুটে আসতে পারি! চল, এবার শাড়ি দেখব।
শাড়ির দোকানে গিয়ে মেহু যখন হালকা নীল আর সাদা রঙের একটা শাড়ি নিয়ে বলল,
'“এটা খুব সুন্দর কিন্তু খুব দামি মনে হচ্ছে,”
ঝুমুর সঙ্গে সঙ্গে শাড়িটা মেহুর হাতে ধরিয়ে দিল।
-“নে, এটাই তোর আজকের দিনের উপহার।
কৃষ্ণনগরের বাতাস এখন সন্ধ্যার স্নিগ্ধতা নিয়ে বইছে। মেহুর মনটা হালকা। স্কুটারের পেছনে বসে সে মনে মনে ভাবল, -"ঝুমুরের ভালোবাসা আর এই সহজ জীবনটাকেই কেন সে ভুলে গিয়েছিল?"
সূর্য তখনো পুরোপুরি ডোবেনি। আকাশজুড়ে কমলা, বেগুনি আর লালের এক অদ্ভুত রঙের খেলা চলছে। নদী শান্ত, জলের ওপর শেষ বেলার আলো চিকচিক করছে।
মেহু আর ঝুমুর নদীর পাড়ে বালির ওপর পাশাপাশি বসল। নদীর ওপার থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাস মেহুর ভেজা চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিল।
-“দেখ, মেহু,” ঝুমুর ফিসফিস করে বলল,
-“এই সূর্যটা যেমন রোজ ডোবে, আবার কাল সকালেই ঠিক ওঠে, তোর জীবনেও সমস্যাগুলো ওইরকম। আজ কষ্ট হচ্ছে? কাল সকাল ঠিক নতুন আলো নিয়ে আসবে।”
মেহু কথা বলল না, শুধু মাথা নেড়ে ঝুমুরের কাঁধে মাথা রাখল। সারাদিনের স্বাধীনতার আনন্দ আর ঝুমুরের নিঃশর্ত ভালোবাসা যেন তাকে একটা অদ্ভুত শান্তি দিচ্ছিল।
-“আজ তোকে একটা জিনিস দিতে চাই,” ঝুমুর বলল, তারপর তার হলুদ-সাদা কুর্তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট, হালকা নীল রঙের পুঁতির মালা বের করল।
-“এটা আমি নিজের হাতে গেঁথেছি। এটা তোর নতুন শাড়ির সঙ্গেও দারুণ মানাবে। এটা রাখ। যখনই মন খারাপ হবে, যখন মনে হবে তোর জগৎটা ছোট হয়ে আসছে, তখন এই মালাটা ছুঁয়ে দেখবি। মনে করবি আমি তোর পাশেই আছি।”
মেহু মৃদু হেসে মালাটা নিল। পুঁতিগুলো হাতে নিয়ে সে দেখল, ওগুলো সূর্যের শেষ আলোয় হীরার মতো জ্বলছে।
-“ঝুমুর,”
তার গলা একটু ভারী শোনাচ্ছিল,
- “তুই না থাকলে আমি হয়তো এই রায়বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যেই শুকিয়ে মরতাম। ধন্যবাদ, সবকিছুর জন্য।”
“ রাখ তোর ধন্যবাদ!”
ঝুমুর মেহুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। -
-“আমার তো মনে হয়, আমারও তোকে দরকার। তোর মতো শান্ত আর সহজ মানুষ না থাকলে আমার এই 'ঝলমলে রঙিন ঘুড়ি'-সত্ত্বাটা হয়তো আকাশে ওড়ার মানেই খুঁজে পেত না।”
সূর্য অবশেষে ডুবে গেল। চারদিকে নেমে এল সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার। নদীর জল এখন আর চিকচিক করছে না, শান্ত, গাঢ় রঙের চাদরের মতো দেখাচ্ছে।
ঝুমুর উঠে দাঁড়াল।
-“চল এবার! অন্ধকার হওয়ার আগে তোকে নামিয়ে দিতে হবে। তোর বাবার শাসনের কাছে আমার বন্ধুত্ব হারুক, সেটা চাই না।” সে হাসল।স্কুটারটা আবার চলতে শুরু করল। মেহু পেছনে বসে ছিল। তার এক হাতে নতুন শাড়ি, অন্য হাতে সেই নীল পুঁতির মালা। নদীর পাড়ের শীতল বাতাস এখন তার মনে আনন্দের ঢেউ তুলেছিল। তার ভেতরের ভয় আর দুশ্চিন্তার ভার অনেকটাই কমে গেছে। সে বুঝতে পারল, জীবনের সরল আনন্দগুলো সবসময় হাতের কাছেই ছিল, শুধু সে দেখতে ভুলে গিয়েছিল।
রায়বাড়ির গেটের সামনে এসে ঝুমুর স্কুটার থামাল।
-“শোন, মেহু,”
ঝুমুর হাসিমুখে বলল, “
-কাল সকালে তোর জন্য গরম গরম সিঙাড়া আর গোলাপজাম নিয়ে আসব। আর তুই তখন তোর ওই দার্শনিক-মুডটা বাদ দিয়ে আমার সঙ্গে গল্প করবি।”
মেহু হাসল। এটা তার জীবনের সবচেয়ে সহজ, মুক্ত হাসি। -“ঠিক আছে,”
ঝুমুর দ্রুত স্কুটার ঘুরিয়ে চলে গেল। মেহু গেট পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুক
কল। রায়বাড়ির ছায়া আজ আর তার মনে ভার চাপাতে পারল না।
চলবে...??
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।