একটু দাঁড়াও হে পথিক
—রফিক আতা—
রিকশা পঞ্জি —৪
সেই রাতে আবহাওয়া ছিল থমথমে—মৃদু সমীরণ, মেঘেদের সঙ্গে করে চাঁদ তারার খুনসুটি। নীরব সময়—শহর ঘুমিয়ে নেই, কিন্তু অচেনা একটি শান্তি বিরাজ করে। কোন এক উদ্দেশ্যের বিষাদ টানে শহরে আমি, আর আমার পথ।
ফেনী শহর—রাতের শহরটার মরিচ বাতির আলোকরোদ, ল্যাম্পপোস্টের হাতছানিতে অন্যরকম হলেও শহরতলি আঁধারি ও নিঃশব্দে ঢাকা। পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার এলাকা ঘেঁষে আমরা ব্যাটারি চালিত রিকশায় এগুচ্ছি—বলতে না চাওয়া প্রত্যাশা নিয়ে। দেয়ালে ঘেরাও করা একটি পুরোন কবরস্থান দেখলে প্রথমে বুঝিনি, এটি কবরস্থান; অচেনা নীরবতার দিকে ঠেকলাম।
একটি সাইনবোর্ডে দুই কলম লেখা আমাকে পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করালো। আমি থমকে গেলাম।
সাইনবোর্ডে লেখা:
হে পথিক! একটু ঘুরে দাঁড়াও। একটু পিছন ফিরে তাকাও। যদি একটুকু সময় হয়, দোয়ায় শামিল করো আমায়।
কবরের দেওয়ালে একটু সবুজ, একটু ধূসর—জমাটবদ্ধ শ্যাওলা। শ্যাওলাজমা আমি হালকা করে হস্তদ্বয় রাখলাম। আনমনা মুখে অস্ফুট স্বরে বের হলো—“আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল-কুবুর।”
আহা! একদিন আমারও আসবে সে সময়—যখন আমি হব অনন্ত নিবাসী। আমি আর ‘আমি’ থাকব না; লোকমুখে আমি হয়ে যাবো প্রয়াত, মৃত, কিংবা মরহুম। হয়তো সেই সময় সন্নিকটেই—বসন্ত পেরুলেই, কিংবা বসন্ত ফুরোবার আগেই।
একদিন রাস্তার পাশের কলাবাগানে, বা কোন এক বাঁশবাগানে—মাটির নিঃশব্দ কফিনে আমি নিথর হয়ে পড়ে থাকবো। আমার পাশ দিয়ে অনেকে হেঁটে যাবে—অনেক অচেনা পথিক, যারা আমার কেউ নয়; আমি তাদের কেউ নই। তবু তাদের কাছে আমার নীরব, মুখচোরা আবদার এটাই থাকবে—
হে পথিক! একটু ঘুরে দাঁড়াও। একটু পিছন ফিরে তাকাও। যদি একটুকু সময় হয়, দোয়ায় শামিল করো আমায়।
আজ নিশীথে অচেনা কবরপাড়ে কয়েক লুমহা দাঁড়ালাম—একটাই প্রত্যাশা: হয়তো আমার কবরপাড়েও কোনো অচেনা পথিক আনমনে দাড়িয়ে—একবার বলবে। শুধু একবার!—“ওহে আল্লাহ্! এই কফিনধারীকে তুমি মাগফিরাত দান করো, ওর ওপর রহম করো।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।