পঞ্চাশ টাকার জাদু
—রফিক আতা
রিকশা পঞ্জি —৫
হঠাৎ হঠাৎ রিকশাটা থেমে যায়। হুটহাট ব্রেক কষলে যেন পুরোটা কেঁপে ওঠে। মিটারটা তো নষ্টই হয়ে আছে অনেক দিন ধরে—ডিসপ্লেতে শুধু কয়েকটা ভাঙা লাইন আর ঝিকমিক করে। ব্রেকের প্যাডও প্রায় শেষ, চাপ দিলেই একটা কর্কশ শব্দ হয়। এই রিকশা নিয়ে ফেনী শহরে আর ক'দিন টিকবো জানি না। যাত্রী উঠলেই মুখ ভার করে, কেউ কেউ তো নেমেই চলে যায় অন্য রিকশায়। টাকা-পয়সা ওঠে না বললেই চলে।
মাঝে মাঝে গ্যারেজে নিয়ে যাই। ভাবি, আজ হয়তো ঠিক করে দেবে। অন্তত একটা সমস্যা তো মিটিয়ে দেবে। হয়তো...
কিন্তু গ্যারেজওয়ালার রিকশা তো। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা ভাড়ার টাকা তুলে দিতে হয়। শর্তে কথা ছিল, কোনো সমস্যা হলে গ্যারেজ থেকেই ঠিক করে দেবেন। এখন অবশ্য তাদের যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। "পরে দেখব" বলে ঠেলে দেন।
গ্যারেজে গেলেই ওই মেকানিকটা—যে সবসময় ওখানে থাকে—মুখ ভার করে বলে, "তোমার দ্বারা তো রিকশা চালানোই হয় না। দু'দিন পর পর ভালো রিকশাটারে নষ্ট করে ফেলো। কেন যে এসব ছেলে-পেলেকে কোম্পানি রিকশা দেয়!"
আজ আবার গ্যারেজে গেলাম। মালিককে না জানিয়ে, চুপিচুপি পঞ্চাশ টাকার একটা চকচকে নোট মেকানিকের হাতে গুঁজে দিলাম। ব্যস, আর কোনো কথা নেই। কোনো বকাঝকা নেই। সবার কাজ ফেলে রেখে আমার রিকশাটাই প্রথমে তুলে নিলো। আধা ঘণ্টার মধ্যে মিটারটা চালু করে দিলো, ব্রেকের প্যাড বদলে দিলো। আরো প্রাসঙ্গিক যে কাজগুলো ছিলো, তাও সেরে দিলো।
আমি তো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সামান্য পঞ্চাশ টাকায় এতটা পাওয়ার! এতদিন যে বকুনি খেলাম, যে অপমান সহ্য করলাম—সব যেন ওই একখানা নোটের কাছে হার মানলো।
মনে মনে হাসলাম। এই দুনিয়াটা বোধহয় এমনই। কথায় নয়, টাকায় কথা বলে। আজ থেকে জেনে গেলাম—পরেরবার সমস্যা হলে সোজা পকেটে হাত দিয়ে একটা নোট বের করব। কাজ হয়ে যাবে।
রিকশায় উঠে প্যাডেল করতে করতে ভাবলাম, এই শহরে বেঁচে থাকতে গেলে এটুকু শিখে নিতেই হবে। নইলে রিকশাই থেমে যাবে, জীবনও থেমে যাবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।