মাগরিবের আজান
রফিক আতা
সন্ধ্যা নামলেই আমাদের গ্রাম
কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যেত—
পশ্চিম আকাশের শেষ রোদটুকু
তালগাছের মাথায় আটকে থাকত,
ধানের গন্ধ মাখা বাতাসে
দিনের সমস্ত কোলাহল ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ত।
আমরা তখন মাঠের আল ধরে
শেষ বিকেলের খেলায় মগ্ন—
কারও হাতে বাঁশের কঞ্চি,
কারও পকেটে কাঁচা আমের টুকরো,
কারও পায়ে কাদামাটি;
মা দূর উঠোন থেকে বারবার ডাকতেন—
“বাবা, বাড়ি আয়—সন্ধ্যা হয়ে গেছে!”
কিন্তু বাড়ি ফেরার কী তাড়া!
আরেকটু খেলা, আরেকটু দৌড়,
আরেকবার কে কাকে ছুঁতে পারে—
শৈশবের কাছে
সন্ধ্যারও যেন কোনো অধিকার ছিল না।
হঠাৎ—
পাশের মসজিদের মিনার ছুঁয়ে
ভেসে আসত মাগরিবের আজান।
আল্লাহু আকবার...
এক মুহূর্তে থেমে যেত
আমাদের ছুটে চলা পৃথিবী।
বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে
আজানের সুর ভেসে যেত দূর পুকুরে,
পুকুরের জলে কাঁপত সন্ধ্যার আকাশ,
ঘাটে বসে থাকা সাদা বকগুলো
ডানা গুটিয়ে নিত নীরবে।
গরুগুলো ফিরত গোয়ালে,
ধুলো উড়িয়ে ফিরত রাখাল,
কোনো কোনো উঠোনে
হারিকেন জ্বলে উঠত টিমটিম করে।
আর আমরা—
খেলার মাঠ থেকে ছুটতাম বাড়ির দিকে,
কেউ খালি পায়ে,
কেউ জামার পকেটে কাঁচা পেয়ারা নিয়ে,
কেউ আবার শেষবারের মতো
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখত
মাঠের ওপরে নেমে আসা অন্ধকার।
তারপর অজুর পানি—
টিউবওয়েলের ঠান্ডা জল,
মায়ের ব্যস্ত হাত,
বাবার গম্ভীর কণ্ঠ,
আর মসজিদের দিকে যাওয়া
চেনা মানুষের সারি।
কী আশ্চর্য ছিল সেই সন্ধ্যাগুলো!
তখন জানতাম না—
একদিন এই সামান্য দৃশ্যগুলোকেই
মানুষ বুকের ভেতর
সারাজীবন বহন করে বেড়ায়।
আজ কত শহরের আলো দেখি,
কত উঁচু দালানের জানালা দেখি,
কত কোলাহলের ভেতর দিয়ে
দিন শেষ হয়ে যায়—
তবু কোথাও মাগরিবের আজান শুনলেই
আমি আর আজকের মানুষটি থাকি না।
আমি ফিরে যাই সেই কাঁচা রাস্তায়,
সেই ধুলোমাখা বিকেলে,
সেই পুকুরঘাটে,
সেই মায়ের ডাকে—
যেখানে পশ্চিম আকাশে
সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে
আমার ছোট্ট পৃথিবীটাও
আজানের সুরে
আস্তে আস্তে সন্ধ্যা হয়ে যেত।
রচনাকাল—
১৬,৯,২৬|বুধবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।