ছবির হাসি আর জীবনের খুশি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
“খুশিটা ভাগ্যে থাকা দরকার, ছবির মধ্যে তো সবাই হাসে।”
কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু একটু থেমে ভাবলে বোঝা যায়, এর ভেতরে আমাদের সময়টার একটা গভীর সত্যি লুকিয়ে আছে।
এখন কারও জীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে তার ঘরে যেতে হয় না। একটা ছবি দেখলেই যেন অনেক কিছু জানা হয়ে যায়। কেউ পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে, কেউ সমুদ্রের ধারে, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঈদের নতুন পোশাকে। জন্মদিন, বিয়ে, ঘোরাঘুরি—সব জায়গাতেই হাসি।
ছবিগুলো দেখে মনে হয়, সবাই ভালো আছে।
কিন্তু ছবির বাইরে মানুষটা কেমন আছে, সেটা ছবির ফ্রেম জানে না।
অফিস থেকে বের হওয়ার আগে একজন মানুষ হয়তো সহকর্মীদের সঙ্গে ছবি তুলল। মুখে হাসি। অথচ সকাল থেকে তার মাথায় ঘুরছে—চাকরিটা থাকবে তো? মাসের শেষে বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, ব্যাংকের কিস্তি—সব মিলিয়ে হয়তো সে ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত।
কেউ ঈদের দিন পরিবারের সঙ্গে ছবি দিল। সবাই নতুন পোশাকে। ছবির নিচে কেউ লিখল, “সুখী পরিবার।”
কিন্তু সেই ছবির কয়েক ঘণ্টা আগে ঘরের ভেতর কী কথা হয়েছে, কে কার ওপর অভিমান করে ছিল, কার বুকের মধ্যে কোন কষ্ট জমে ছিল—ছবি তার কিছুই জানে না।
ছবি একটা মুহূর্ত ধরে রাখে। জীবনকে নয়।
আমাদের ভুলটা হয় তখনই, যখন আমরা অন্যের একটা সুন্দর মুহূর্তকে তার পুরো জীবন ভেবে নিই। তারপর নিজের পুরো জীবনটার সঙ্গে তার তুলনা করি।
ওরা ঘুরতে যাচ্ছে, আমি পারছি না। ওর সন্তান ভালো করছে, আমার সন্তান করছে না। ও নতুন গাড়ি কিনেছে, আমি এখনও পুরোনোটাই চালাচ্ছি। ওদের সংসারে সবাই একসঙ্গে, আমার সংসারে এত দূরত্ব কেন?
তারপর প্রশ্নটা নিজের কাছেই ফিরে আসে—আমি কি তাহলে ভালো নেই?
অথচ অন্য মানুষের জীবন সম্পর্কে আমরা খুব অল্পই জানি।
আমরা দেখি তার ভ্রমণ, নতুন পোশাক, দামি খাবার, সন্তানের সাফল্য। দেখি না তার ঘুমহীন রাত। দেখি না ঋণের চাপ, দাম্পত্যের নীরবতা, অসুস্থ বাবা-মায়ের চিন্তা কিংবা একা ঘরে ফিরে তার দীর্ঘশ্বাস।
নিজের জীবনের ক্ষেত্রে কিন্তু কিছুই আমাদের চোখ এড়ায় না। নিজের ব্যর্থতা জানি, অভাব জানি, ভুল জানি, একাকিত্বও জানি।
ফলে তুলনাটা শুরু থেকেই অসম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অসম তুলনাটাকে আরও সহজ করে দিয়েছে। এখন আনন্দ শুধু অনুভব করলেই হয় না, অনেক সময় সেটার একটা ছবি দরকার হয়।
ভালো খাবার—ছবি। বেড়াতে যাওয়া—ছবি। নতুন কিছু কেনা—ছবি। সন্তানের সাফল্য—ছবি। ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে সময় কাটানো—সেটাও ছবি।
ধীরে ধীরে সুখী হওয়ার চেয়ে সুখী দেখানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অথচ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর অনেকগুলোর কোনো ছবি নেই।
কেউ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। পাশে একজন মানুষ সারারাত জেগে আছে।
কেউ মন খারাপ করে চুপ করে আছে। পাশে থাকা মানুষটা কোনো প্রশ্ন না করে এক কাপ চা এগিয়ে দিল।
কেউ বিপদে পড়ে ফোন করল। ওপাশ থেকে শুধু একটা কথা এলো—“চিন্তা করিস না, আমি আছি।”
এই মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরা পড়ে না। কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার সাহস অনেক সময় এখান থেকেই আসে।
খুশি মানেই সবসময় উচ্ছ্বাস নয়।
কখনো খুশি হলো নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারা। কখনো এমন একজন মানুষ থাকা, যার সামনে নিজের দুর্বলতাগুলো লুকাতে হয় না। কখনো হাতে টাকা কম থাকলেও মনে হওয়া—ঘরে ফিরলে নিজের মানুষগুলো আছে। কখনো দীর্ঘ অসুস্থতার পর সকালে জানালার পর্দা সরিয়ে একটু রোদ এসে মুখে পড়া।
আমরা খুশিকে বোধহয় একটু বেশি জটিল করে ফেলেছি।
বড় বাড়ি, দামি গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, নতুন ফোন—এসব আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু এগুলো থাকলেই মানুষের ভেতর শান্তি থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
কারণ ভাগ্য শুধু টাকা-পয়সার বিষয় নয়।
মানুষের ভাগ্যেও মানুষ থাকে।
কারও ভাগ্যে এমন একজন বাবা থাকে, যে সন্তান ব্যর্থ হলেও বলে, “আবার চেষ্টা কর।”
কারও ভাগ্যে এমন একজন বন্ধু থাকে, যে সাফল্যের দিনে ছবি তোলে না, কিন্তু বিপদের রাতে ফোনটা ধরে।
আবার কারও জীবনে টাকা আছে, পরিচিতি আছে, অসংখ্য ছবি আছে—শুধু পাশে বসে নিজের কথা বলার মতো একজন মানুষ নেই।
সেখানেই ছবির হাসি আর জীবনের খুশির পার্থক্য।
ছবিতে হাসি রাখা যায়। আলো ঠিক করা যায়। মুখের ক্লান্তি লুকানো যায়। পছন্দ না হলে ছবিটা মুছেও দেওয়া যায়।
কিন্তু একা ঘরে ফিরে নিজের মনকে এভাবে সম্পাদনা করা যায় না।
তাই অন্যের ছবি দেখে নিজের জীবন নিয়ে হতাশ হওয়ার আগে একটু থামা দরকার। যে মানুষটাকে দেখে আপনার মনে হচ্ছে, “ও কত সুখে আছে”, সে হয়তো কোনো এক রাতে অন্য কারও ছবি দেখে একই কথাই ভাবছে।
এই তুলনার কোনো শেষ নেই। কারণ আমরা নিজের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে অন্যের জীবনের নির্বাচিত কয়েকটা মুহূর্তের তুলনা করি।
বহু বছর পর পুরোনো ছবিগুলো খুলে বসলে আমরা কত হাসিমুখ দেখতে পাব। বন্ধুদের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে, কোনো উৎসবে, কোনো ভ্রমণে।
ছবিগুলো দেখে হয়তো মনে হবে—দিনগুলো কত সুন্দর ছিল!
কিন্তু সেই ছবির দিনটায় আমাদের মন কেমন ছিল, সেটা আমরা নিজেরাই জানি।
কোন হাসির আড়ালে ক্লান্তি ছিল, কোন ছবির আগে চোখের পানি মুছতে হয়েছিল, কোন দিনটা সত্যিই আনন্দের ছিল—একটা ছবি তার হিসাব রাখে না।
খুশিটা ভাগ্যে থাকা দরকার।
কারণ ছবির মধ্যে তো সবাই হাসে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।