সম্পর্কের শেষ কথাগুলো
পর্ব ৫ — সহ্য না করা?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৮ আগস্ট, ২০২৬
“আগের মানুষ সংসার টিকিয়ে রাখতে জানত, এখনকার মানুষ একটু সমস্যা হলেই আলাদা হয়ে যায়।” কথাটা আমরা প্রায়ই শুনি। বিশেষ করে কোনো দম্পতির বিচ্ছেদের খবর সামনে এলে কেউ না কেউ বলে ওঠেন, “আমাদের সময়ে এত বিচ্ছেদ ছিল না।” কথাটা শুনতে সত্যি মনে হলেও এর ভেতরে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে—আগের মানুষ কি সত্যিই বেশি সুখী ছিল, নাকি অনেকের সামনে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পথটাই খোলা ছিল না? আজ বিচ্ছেদের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও পরিচিতজনের আলোচনায় বেশি দৃশ্যমান। ফলে মনে হয়, সম্পর্ক ভাঙা বুঝি হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু দৃশ্যমানতা আর বাস্তবতা এক জিনিস নয়। আগে অনেক সংসার টিকে ছিল, ঠিকই; তবে সব টিকে থাকা সংসার যে ভালোবাসা, সম্মান আর শান্তিতে টিকে ছিল, এমনটা বলা কঠিন।
একসময় সংসার টিকিয়ে রাখাটাই ছিল সবচেয়ে বড় সামাজিক সাফল্য। একজন মানুষ সম্পর্কের ভেতরে সুখী কি না, সম্মান পাচ্ছেন কি না, নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারছেন কি না—এসব প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠত, “সংসারটা টিকে আছে তো?” বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল আরও কঠিন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা হলে বলা হতো, “একটু মানিয়ে নাও।” অপমান হলে বলা হতো, “সব সংসারেই এসব হয়।” দীর্ঘদিন কষ্ট পেলেও বলা হতো, “সন্তানের মুখের দিকে তাকাও।” অথচ খুব কম মানুষ জানতে চাইত—এই মানুষটি প্রতিদিন কীভাবে বেঁচে আছেন? অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বামীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, নিজের থাকার জায়গা ছিল না, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় ছিল, বাবার বাড়িতেও ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। ফলে কেউ ভালোবেসে সংসারে থেকেছেন, কেউ সন্তানদের জন্য থেকেছেন, কেউ সম্পর্ক ঠিক হয়ে যাবে এই আশায় থেকেছেন, আবার কেউ শুধু এই কারণে থেকেছেন যে যাওয়ার মতো কোনো নিরাপদ জায়গা ছিল না। বাইরে থেকে সেই সংসারকে বলা হয়েছে “টিকে থাকা সংসার”; ভেতরের কষ্টের হিসাব কেউ রাখেনি।
এখানে একটা পার্থক্য খুব জরুরি—সহ্য করার ক্ষমতা আর সহ্য করতে বাধ্য হওয়া এক জিনিস নয়। একজন মানুষ সম্পর্কের স্বার্থে নিজের কিছু অভ্যাস বদলালেন, সঙ্গীর ভুল ক্ষমা করলেন, রাগের সময় একটু চুপ থাকলেন কিংবা দুজন মিলে সমস্যার সমাধান করলেন—এটা সম্পর্কের পরিণত আচরণ। কিন্তু একজন মানুষ যদি বছরের পর বছর অপমান, ভয়, অবহেলা বা অন্যায় সহ্য করেন শুধু সমাজের ভয়ে, তাহলে সেটাকে অসাধারণ ধৈর্য বলে প্রশংসা করা ঠিক নয়। কখনো কখনো সেটার নাম অসহায়তা। তাই অতীতের মানুষকে শুধু “বেশি সহনশীল” বলে বিচার করলে তাদের বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটা বড় অংশ আমরা অস্বীকার করি।
সময় বদলেছে। মেয়েরা এখন বেশি পড়াশোনা করছে, চাকরি করছে, ব্যবসা করছে, নিজের আয় করছে। নিজের নামে ব্যাংক হিসাব রাখছে, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফলে অনেক নারীর সামনে অন্তত কিছু বিকল্প তৈরি হয়েছে। একটি সম্পর্ক তাকে সম্মান না দিলে তিনি প্রশ্ন করতে পারছেন, “আমি কেন সবসময় একাই মানিয়ে নেব?” নিজের আয় থাকলে তিনি হয়তো আরও দৃঢ়ভাবে বলতে পারছেন, “আমার সঙ্গেও সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে হবে।” এই পরিবর্তনকে শুধু “নারীরা বেশি স্বাধীন হয়ে গেছে” বলে দেখলে আসল বিষয়টি ধরা পড়ে না। অনেক সময় স্বাধীনতা সম্পর্ক ভাঙে না; বরং সম্পর্কের ভেতরে এতদিন লুকিয়ে থাকা সমস্যাগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। যে সম্পর্ক একজন মানুষের নীরবতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেই নীরবতা ভাঙলেই যদি সম্পর্ক কেঁপে ওঠে, তাহলে সমস্যাটা নীরবতা ভাঙার মধ্যে নয়—সমস্যাটা ছিল সম্পর্কের ভিতের মধ্যে।
তবে এখানেই আরেকটি সত্য স্বীকার করতে হবে। আজকের সময়ে স্বাধীনতার পাশাপাশি তাড়াহুড়োও এসেছে। আমরা দ্রুত উত্তর চাই, দ্রুত সিদ্ধান্ত চাই, দ্রুত সুখ চাই। সেই অভ্যাস কখনো কখনো সম্পর্কেও ঢুকে পড়ে। সামান্য মতের অমিলকে আমরা বড় সংকট মনে করি। একটি ভুলের পর পুরো মানুষটাকেই খারাপ ঘোষণা করি। রাগের মুহূর্তে মনে হয়, “এই সম্পর্ক আর চলবে না।” অথচ দুটি মানুষ একসঙ্গে জীবন কাটালে মতের অমিল হবেই। দুজনের পরিবার আলাদা, অভিজ্ঞতা আলাদা, স্বভাব আলাদা, চাহিদা আলাদা। তাই ঝগড়া বা মতভেদ থাকা মানেই সম্পর্ক ব্যর্থ নয়। বরং ঝগড়ার পরে দুজন কীভাবে কথা বলেন, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা কি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন? ক্ষমা চাইতে পারেন? সঙ্গীর কষ্টটা বুঝতে চেষ্টা করেন? প্রয়োজনে নিজেদের আচরণ বদলাতে পারেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেয় সম্পর্কটি বাঁচানোর মতো জায়গা এখনো আছে কি না।
আবার সব সমস্যাকে এক মাপে বিচার করাও ঠিক নয়। সংসারের কাজ ভাগাভাগি নিয়ে মতভেদ, সময় কম দেওয়া, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে অমিল, শ্বশুরবাড়ি নিয়ে সমস্যা কিংবা ব্যক্তিত্বের পার্থক্য—এসব কঠিন হলেও অনেক ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। দুজন বসে কথা বলতে পারেন, দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারেন, ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করতে পারেন, প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নিতে পারেন। দীর্ঘদিনের সমস্যা হলে পেশাদার সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রতিদিনের অপমান, ভয় দেখানো, নির্যাতন, গুরুতর প্রতারণা কিংবা নিরাপত্তার জন্য হুমকিকে “আরও একটু সহ্য করো” বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। সম্পর্ক বাঁচানোর চেষ্টা অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু সেই চেষ্টার অর্থ একজন মানুষকে অসীম কষ্টের মধ্যে আটকে রাখা নয়।
তাহলে সত্যিই কি বিচ্ছেদ বেড়েছে? হয়তো কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি প্রকাশ্যে নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে পারছে। আগে যে সম্পর্কগুলো সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা বা পরিবারের ভয়ে টিকে থাকত, সেগুলোর কিছু এখন ভেঙে যাচ্ছে। তাই শুধু সংখ্যা বা চোখে পড়া ঘটনাগুলো দিয়ে পুরো সমাজকে বিচার করা কঠিন। একইভাবে “এখন সবাই নিজের স্বাধীনতার নামে সম্পর্ক ভেঙে দিচ্ছে”—এই কথাটাও অতিরঞ্জিত। সত্যিটা সম্ভবত মাঝখানে। মানুষ এখন নিজের মর্যাদা ও মানসিক শান্তির মূল্য আগের চেয়ে বেশি বুঝতে শিখেছে। এটি ভালো পরিবর্তন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ধৈর্য, ক্ষমা, দায়িত্ব আর সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে।
আসল প্রশ্ন তাই “বিচ্ছেদ কেন বাড়ছে?” নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—মানুষ কেন আলাদা হচ্ছে? সম্পর্কটি কি বহুদিন ধরে ভেতর থেকে ভেঙে যাচ্ছিল? দুজন কি সত্যি কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন? দুজনেই কি নিজের ভুলের অংশটুকু স্বীকার করেছিলেন? সমস্যার সমাধানের কোনো চেষ্টা হয়েছিল? নাকি একজন শুধু সমাজের ভয়ে থেকে গেছেন, আর অন্যজন নিজের সুবিধার জন্য সম্পর্কটাকে টেনে নিয়েছেন? আবার এমনও হতে পারে, সামান্য অমিলকে কেন্দ্র করে দুজনই কথা বলার আগেই সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছেন। এই দুই পরিস্থিতিকে একই চোখে দেখা অন্যায়।
কারণ একটি সম্পর্ক ভেঙে গেছে মানেই সেটি ব্যর্থ নয়। আবার একটি সম্পর্ক বহু বছর টিকে আছে মানেই সেটি সফলও নয়। সম্পর্কের সাফল্য শুধু তার স্থায়িত্বে মাপা যায় না; মাপতে হয় তার ভেতরে থাকা মানুষের জীবন দিয়ে। তারা কি একে অপরকে সম্মান করেছেন? মতের অমিল হলেও কি মানুষ হিসেবে মর্যাদা রেখেছেন? কষ্টের সময়ে পাশে থেকেছেন? ভুল হলে ক্ষমা চেয়েছেন? প্রয়োজন হলে নিজেদের বদলেছেন? একজনের স্বাধীনতাকে অন্যজনের পরাজয় মনে করেননি? যদি এসব থাকে, তাহলে সেই সম্পর্কের ভিত শক্ত। আর যদি এগুলোর কিছুই না থাকে, শুধু সামাজিক পরিচয়টুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য সম্পর্ক টেনে নেওয়া হয়, তাহলে সেই টিকে থাকা নিয়ে গর্ব করারও খুব বেশি কারণ নেই।
হয়তো আমাদের “আগের মানুষ বেশি সহ্য করত” কথাটাকে একটু নতুনভাবে দেখা দরকার। আগে মানুষ অনেক কিছু সহ্য করত—কেউ ভালোবাসার জন্য, কেউ সন্তানের জন্য, কেউ পরিবারের জন্য; আবার অনেকে সহ্য করতেন কারণ তাদের সামনে অন্য কোনো পথ ছিল না। আজ মানুষ অনেক কিছু সহ্য করতে চায় না—কারণ তারা নিজের জীবন, মর্যাদা এবং মানসিক শান্তির মূল্য বুঝতে শিখেছে। এই পরিবর্তনকে আমরা ভয় না পেয়ে বুঝতে পারি। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা মানে সম্পর্কের প্রতি সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। নিজের অধিকারের পাশাপাশি অন্যের অধিকারের কথাও ভাবতে হয়। নিজের কষ্টের কথা বলার পাশাপাশি অন্যের কষ্টটাও শুনতে হয়।
শেষ পর্যন্ত একটি সম্পর্কের লক্ষ্য শুধু টিকে থাকা নয়; সুস্থভাবে টিকে থাকা। সেখানে ছাড় থাকবে, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন থাকবে না। ক্ষমা থাকবে, কিন্তু অন্যায়কে স্বাভাবিক বানানো হবে না। দায়িত্ব থাকবে, কিন্তু একজন মানুষ সবকিছু একা বহন করবেন না। ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু ভালোবাসার নামে ভয় থাকবে না।
তাই প্রশ্নটা হয়তো এমন হওয়া উচিত নয়—“এখনকার মানুষ কেন আর সহ্য করে না?”
প্রশ্নটা হওয়া উচিত—আমরা কি এমন সম্পর্ক তৈরি করতে শিখেছি, যেখানে ভালোবাসার জন্য কিছুটা সহ্য করতে হয়, কিন্তু ভালোবাসার নামে নিজেকে হারাতে হয় না?
কারণ সম্পর্ক টিকে থাকাই শেষ কথা নয়।
সম্পর্কের ভেতরে দুজন মানুষ মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে পারছেন কি না—শেষ পর্যন্ত সেটাই আসল কথা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।