উপন্যাসঃ-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-২ -সাপের ঝাঁপির আড়ালে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
যে সাপ দেখে আমরা ভয়ে পালাই, সেই সাপই কারও সংসারের একমাত্র ভরসা।
রোদের তেজ বাড়তেই নদীর ঘাট থেকে ডাঙার দিকে হাঁটা দিল একদল মানুষ। কাঁধে বাঁশের বাঁক, তার দুই মাথায় ঝুলছে কাঁঠাল কাঠের গোল দুটি ঝাঁপি। ঝাঁপির ওপর মেটে রঙের মোটা কাপড় প্যাঁচানো। দূর থেকে দেখলে মনে হয় নিতান্ত সাধারণ দুটি ঝুড়ি, অথচ ভেতরে রয়েছে মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ — গোখরো, কালনাগিনী, খইয়া গোখরো। সাধারণ মানুষ যেখানে পায়ের কাছে একটু সাড়া পেলেই আঁতকে ওঠে, সেখানে বেদে বহরের রহমত শেখ সেই বিষধর সাপের ঝাঁপি কাঁধে নিয়ে পরম নিশ্চিন্তে হেঁটে চলেছেন খর রোদের মধ্য দিয়ে।
আমাদের কাছে যা আতঙ্কের অন্য নাম, সেই সাপই তাদের হাঁড়িতে ভাত ফোটায়, সন্তানের মুখে এক মুঠো অন্ন তুলে দেয়। বেদেদের কাছে সাপ কোনো ভয়ের প্রতীক নয়, সে তাদের সংসারের অন্নদাতা।
গ্রামের মোড়ে কিংবা কোনো বটতলায় ঝাঁপির মুখ খুলতেই উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যায়। বেদে যখন হাত বাড়িয়ে বিষধর গোখরোটার মাথা চেপে ধরে, তখন চারপাশে দাঁড়ানো মানুষের বুক কেঁপে ওঠে ভয় আর বিস্ময়ে। কিন্তু এই উত্তেজনার আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে এক নির্মম বাস্তবতা। সাপের সঙ্গে এই বসবাস কেবল রোমাঞ্চ নয়, প্রতি মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই।
রহমত বলছিলেন, "বাবু, সাপরে আমরা যতই যত্ন করি, ও তো পশু। সুযোগ পাইলেই ছোবল মারতে একটুও ভাবে না। কোনো মন্ত্র-টন্ত্র নাই, সবই অভিজ্ঞতার খেলা। একটু নজর এদিক-ওদিক হইলেই শেষ।"
আজকের দিনে এই পেশার টানাপোড়েন আরও বেশি। একদিকে আধুনিক চিকিৎসা আর সচেতনতার যুগে মানুষের আর আগের মতো সাপের খেলার প্রতি টান নেই। অন্যদিকে বন-জঙ্গল কমে যাওয়ায় বুনো সাপ ধরাও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তার ওপর এক ছোবলে জীবন চলে যাওয়ার ভয় তো প্রতি পদে লেগেই আছে। অথচ এত ঝুঁকি নিয়েও দিনশেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে আজকের বাজারে চারজনের সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।
ঝাঁপির ঢাকনা বন্ধ হলেই ভিড় পাতলা হয়ে যায়। মানুষ ফিরে যায় যার যার নিরাপদ ঘরে, আর রহমতরা ফিরে আসে নদীর পাড়ে, তাদের ছইওয়ালা নৌকার আস্তানায়। এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটা আজ বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় যা ছিল তাদের ঐতিহ্য, আজ তাই যেন তাদের দারিদ্র্যের শেকল হয়ে পায়ে জড়িয়ে আছে। পেটের টানে সাপের বিষের চেয়েও তীব্র হয়ে ওঠে জীবনের বাস্তবতা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।