অভিশপ্ত শৈশবের রেলগেইট
—রফিক আতা—
রিকশা পঞ্জি —২
রাত তখন প্রায় ১১টা। সারাদিনের কর্মব্যস্ততায় ক্লান্ত শহরটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। ক্লান্তির ভার আমাকেও আচ্ছন্ন করছে। বিলবোর্ডের বড় অক্ষরে লেখা “To Late” চোখে পড়লো। পাশে ঝোলানো এক প্ল্যাকার্ডে অচেনা কোনো কবিরাজের বিজ্ঞাপন। শহরের উদাস হাওয়ায় নিথর দেহটাকে ছেড়ে দিলাম আমি।
অদূরেই! যেখানে ময়লাদের বসবাস—একটি ছেঁড়া বস্তা কাঁধে ছোট্ট এক ছেলে টোকাই সেজে ঘুরছে। বস্তার ভেতর বোতল ভরতে ভরতে মুখে গুনগুন করছে নাম না জানা কোনো কাওয়ালী। হঠাৎ বস্তা নামিয়ে সে এগিয়ে গেলো এক হকারের দিকে। সিগারেট চাইলো। আশ্চর্য হইনি—ভাবলাম হয়তো তার মহাজন বা কারও জন্য নিচ্ছে।
কিন্তু সিগারেট পকেটে ঢুকিয়ে সে এগিয়ে এলো আমার রিকশার দিকে।
—মামা, যাবেন?
—কই যাবি?
—রেলগেইটের পাশে।
—ঠিক আছে, চলো।
ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলো ভেদ করে রিকশা এগিয়ে চলে। উইপিন গাছের সরু পাতায় ভিজে থাকা বর্ষার গন্ধ। আকাশে হালকা মেঘ, তবু জোছনার স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে। হিমেল বাতাস বইছে—মনে হলো, খানিক বাদেই বৃষ্টি নামবে। মাদরাসায় দ্রুত ফিরতে হবে ভেবে প্যাডেলের গতি বাড়ালাম।
হঠাৎ ছেলেটির কণ্ঠ ভেসে এলো—
—মামা, সিগারেট খাবেন?
চাপা বাকরুদ্ধতা লুকিয়ে বললাম, —না।
—আমি খাইলে কিছু মনে করবেন না তো?
কিছু বললাম না, শুধু প্যাডেলে জোর দিলাম। বাতাসে পাক খেতে খেতে ছড়ালো সিগারেটের তীব্র গন্ধ।
ভাবলাম—এগারো বছরের শিশুটি আজ এমন অবস্থায় কেন? দোষ কি শুধু পরিবেশের? নাকি বন্ধু-বান্ধবের বখাটে সংশ্রব? আজ সে টোকাই, কাল হয়তো মাদক ব্যবসায়ী, কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের এক নেতা! কে জানে তার অনাগত ভবিষ্যৎ কোন অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে!
প্রশ্ন করলাম,
—কয়টা বাজে কাজে নামছিস?
—আটটা।
—আটটা থেকে এখন পর্যন্ত এইটুকুই কুড়ালি?
—হ, এইডাই।
—এসব কতো টাকায় বিক্রি হবে?
—৫০ টাকা।
—মাত্র পঞ্চাশ টাকা! এই টাকা দিয়ে কী করবি?
—এইডা দিয়া সকাল বেলা খাবার খামু।
অবাক হয়ে গেলাম। তার সংগ্রাম কেবল এক মুঠো ভাতের জন্য। আমার সংগ্রাম ইলমের খাতিরে, আর তার সংগ্রাম জীবন বাঁচানোর জন্য। বয়সের পার্থক্য হয়তো দশ বছর, কিন্তু সংগ্রামের গভীরতায় সে আমার চেয়ে অগণিত ধাপ এগিয়ে। তার লড়াই বড্ড নিষ্পাপ, ছোট্ট এক ফুলের মতো—যা অযাচিত পরিবেশে ঝরে যাচ্ছে।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
—তোর আব্বু আম্মু আছে?
—মায় আছে, আর একডা ছোট বোনও আছে।
—আব্বু?
প্রথমে চুপ করে থাকলো। পরে বললো,
—হেয় আরেকডা বিয়া কইরা ভাইগ্যা গেছে।
—মা কোথায় থাকে?
—মা একটা বাড়িতে কাজ করে। ও আমার জন্য সময় পাই না, আর ছোট বোনকে দেখাশোনা করি আমি।
দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো আমার বুক থেকে। আমার তো বাবা আছেন, অথচ তার বাবা থেকেও নেই। বাবার হাতের স্নেহ থেকে বঞ্চিত শিশুটি বড় হচ্ছে শুধু দুঃখের ছায়ায়। তার মা পরিশ্রমী হলেও দূরে, আর ছোট বোনের যত্ন সব তার কাঁধে।
কথা বলতে বলতে পৌঁছে গেলাম রেলগেইটে। সে নেমে কুঁচকানো ২০ টাকার একটা নোট বের করলো।
—নেন মামা।
—না, দরকার নাই।
—আপনি তো কষ্ট করে রিকশা চালাইলেন, দশ টাকা হলেও নেন।
তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। শিশুটি যেন ভিখারি নয়, সম্মানের প্রতীক। আমার হাত কেঁপে উঠলো। নিতে পারলাম না।
আকাশে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। আমি তাকিয়ে রইলাম তার চলে যাওয়া পিঠের দিকে। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এই নিষ্পাপ কুঁড়িরা শুধু ভালো পরিবেশ আর যথাযথ সহচর না পাওয়ায় ঝরে যায় অকালে। তাদের মৃত্যু হয়—নেই কোনো শোকগাথা, নেই কোনো কান্না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।