শোনো অবেলার পথিক
কলমে: হিমানী হিমাদ্রি
পর্ব: ০৪
চক্রবর্তী বাড়িতে ফেরার পর থেকে এক গুমোট নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ইরাকে তার ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে মহিমবাবু বারান্দায় পায়চারি করছেন। তার মনে খটকাটা এখনো পুরোপুরি মেটেনি। তিনি দয়া দস্তিদারকে ডেকে নিচু স্বরে বললেন, "দয়া, ছেলেটার চোখের চাহনি কিন্তু পাওনাদারের মতো ছিল না। তুই কাল থেকে ওর ওপর একটু নজর রাখিস তো। নিচুজাতের মানুষ বড্ড সেয়ানা হয়।"
এদিকে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে অন্ধকারের মধ্যে জানলার ধারে বসে রইল ইরা। তার গলায় সেই চেইনটার জায়গাটা এখন খালি, কিন্তু বুকের ভেতরটা তার চেয়েও বেশি ফাঁকা লাগছে। অহিদত্ত তাকে সবার সামনে 'বামুনপিসি' বলে ব্যঙ্গ করল, চোর সেজে নিজেকে কলঙ্কিত করল—সবই শুধু ইরার সম্মান বাঁচাতে।
ইরা মনে মনে বলল, "তুমি নিজেকে ছোট করলে ঠিকই অহি, কিন্তু আমার চোখে তুমি আজ আরও অনেক উঁচুতে উঠে গেলে। এই ঋণ আমি শোধ করব কী করে?"
পরদিন ভোরবেলা। অহিদত্ত নদীর ধারে কাজে যাওয়ার সময় দেখল ইরা তার সখীদের নিয়ে মন্দিরের দিকে যাচ্ছে। মহিমবাবুর লোক দয়া দস্তিদার আড়াল থেকে সব লক্ষ্য করছে। অহিদত্ত ইচ্ছা করেই উল্টো পথ ধরল। কিন্তু যাওয়ার সময় সে চড়া গলায় একটা গান গাইতে শুরু করল— যা কেবল ইরাই বুঝতে পারবে:
"পুরানো সেই দিনের কথা কি রে ভোলা যায়? ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়?" ইরা থমকে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, অহিদত্ত তাকে ইশারা দিচ্ছে যে তাদের সেই 'রূপকথা' এখনো শেষ হয়নি। অহিদত্ত পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবারও ইরার দিকে তাকাল না, বরং অবহেলার ছলে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটা দিল। কিন্তু তার গলার গানের সুরটা ইরার কানে এসে ফিসফিস করে বলে গেল— "আমি আছি ইরাবতী, আমি ছায়ার মতো পাশেই আছি।"
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।