শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় চেতনার এক মহোৎসব। মহালয়ার মাধ্যমে দেবীপক্ষের সূচনা হলেও, ষষ্ঠীর দিন থেকেই পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দেবী দুর্গার আবাহন, আদিবাস ও চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠী হয়ে ওঠে দেবীপূজার প্রথম দ্বার। বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতিতে ষষ্ঠীর দিনটি তাই একদিকে ধর্মীয় তাৎপর্যপূর্ণ, অন্যদিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলার দিন।
পুরাণ ও শাস্ত্রে ষষ্ঠীর মাহাত্ম্য
মার্কণ্ডেয় পুরাণে বর্ণিত আছে দেবী মহাত্ম্যম্ বা শ্রীশ্রীচণ্ডী, যেখানে মহিষাসুর বধের কাহিনি দেবী দুর্গার অসীম শক্তি ও মহিমা প্রকাশ করে। শাস্ত্রমতে, ষষ্ঠীর দিন দেবী কৈলাস ত্যাগ করে মর্ত্যে আগমন করেন। তিনি কন্যারূপে, মাতৃরূপে আগমন করে ভক্তদের মাঝে আবির্ভূত হন।
চণ্ডীপাঠে বলা হয়েছে— দেবী অশুভ শক্তির বিনাশ করতে এবং ভক্তের হৃদয়ে শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা করতে আবির্ভূত হন। ষষ্ঠীর আবাহন অনুষ্ঠান সেই আবির্ভাবেরই প্রতীক।
ষষ্ঠীর প্রধান আচার-অনুষ্ঠান
১. আবাহন – দেবীর আগমন আহ্বান। পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীকে আহ্বান করেন এবং মর্ত্যে তাঁর উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত করেন।
২. আদিবাস – পূজার পূর্বদিন দেবীকে স্থান দানের আচার। দেবীর প্রতিমায় প্রতীকীভাবে “স্থাপন” করা হয়।
৩. চক্ষুদান – ষষ্ঠীর বিশেষ আচার। দেবীর মূর্তিতে চক্ষুদানের মাধ্যমে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস, প্রতিমার চোখ স্বয়ং শিল্পী আঁকেন না; দেবী নিজে তাঁর দৃষ্টিকে অর্পণ করেন।
৪. কালপরম্পরা – ষষ্ঠীর দিন থেকেই মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, ধুনুচি নাচ ও ঢাকের বেজে ওঠা শুরু হয়। এটি সমাজে উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে।
গ্রামীণ বাংলায় ষষ্ঠীর দিনে কাশফুলে ভরে ওঠে মাঠ। মানুষ নতুন পোশাক পরে পূজামণ্ডপে আসে, শুভেচ্ছা বিনিময় করে। নগরবাংলায় ষষ্ঠীর দিনেই বিশাল মণ্ডপ উদ্বোধন হয়, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। শিশুদের জন্য এটি আনন্দের সূচনা, আর প্রবাসী বাঙালির কাছে ষষ্ঠী হলো আবেগের দিন— যেদিন থেকে পূজার পরিবেশ প্রকৃত অর্থেই শুরু হয়।
ষষ্ঠীর মাধ্যমে দেবী দুর্গা কেবল অসুরবিনাশিনী নন, তিনি জননী, তিনি শক্তির আধার। ষষ্ঠী হলো তাঁর মাতৃমূর্তির প্রকাশ— যিনি সন্তানদের রক্ষা করেন, অশুভকে দূর করেন এবং সমাজে শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা ঘটান। নারীর মধ্যে এই শক্তির প্রতিফলনই ষষ্ঠীর অন্তর্নিহিত বার্তা।
আজকের দিনে ষষ্ঠী কেবল ধর্মীয় রীতি নয়, এটি সামাজিক সংহতি, মিলন ও আনন্দের দিন। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী সবাই পূজামণ্ডপে মিলিত হয়। শিল্প-সংস্কৃতি, সাজসজ্জা ও সামাজিক সম্প্রীতি ষষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে বিজয়া দশমী পর্যন্ত চলতে থাকে। তাই ষষ্ঠী বাঙালির জীবনে এক অনন্য সাংস্কৃতিক উৎসব।
দুর্গা ষষ্ঠী দেবীপক্ষের দ্বার উন্মোচন করে। এটি ভক্তির, ঐতিহ্যের, সমাজের এবং আনন্দের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। মহালয়ার পর যে প্রতীক্ষা, ষষ্ঠীর দিন সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটায়। দেবী দুর্গার আবাহনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা অশুভকে বর্জন করে শুভশক্তির স্বাগত জানান। তাই বলা যায়— ষষ্ঠী কেবল এক ধর্মীয় দিন নয়, এটি বাঙালির আত্মার উৎসবের সূচনা।
তথ্যসূত্র
Sri Sri Chandi (Devi Mahatmyam, Markandeya Purana) – Gita Press, Gorakhpur.
Swami Jagadiswarananda, Devi Mahatmyam: English Translation – Sri Ramakrishna Math, Chennai, 1953.
Brown, C. MacKenzie, The Triumph of the Goddess: The Canonical Models and Theological Visions of the Devi-Bhagavata Purana – SUNY Press, 1991.
Gupta, Shakti M., Festivals, Fairs and Fasts of India – Clarion Books, 1991.
Chakrabarti, Kunal, Religious Process: The Puranas and the Making of a Regional Tradition – Oxford University Press, 2001.
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।