মৃত প্রিয়জনদের জন্য জীবিতদের করণীয় আমল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ | জানুয়ারি ০৫, ২০২৬
মৃত্যু এসে দাঁড়ালে সবকিছু থেমে যায়। আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রিয়জনের চলে যাওয়ার পর মন কিছুতেই মানতে চায় না। আমরা চাই, কোনোভাবে তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দিতে। তাদের কবরে শান্তি, মাগফিরাত, জান্নাতের ছায়া পৌঁছে দিতে চাই। এই চাওয়াটা খুব স্বাভাবিক, খুব মানবিক। কিন্তু কোন পথে এই সাহায্য পৌঁছাবে? কোন আমল সত্যিই তাদের উপকার করবে? আজ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব কুরআন-হাদিসের আলোয়।
হাদিসে এসেছে, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়—তবে তিনটি আমল ছাড়া। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মানুষ মারা গেলে তার আমল কেটে যায়, তবে তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।”
এই তিনটির মধ্যে প্রথম দুটি মৃত ব্যক্তি নিজে জীবিত অবস্থায় করে যান—যেমন মসজিদ-মাদরাসা গড়ে যাওয়া, কূপ খনন করা, দ্বীনি কিতাব রচনা করা বা ছাত্র তৈরি করা, যা মৃত্যুর পরও মানুষকে উপকার করে। আর তৃতীয়টি জীবিতদের হাতে—নেক সন্তানের দোয়া। এ ছাড়াও জীবিতরা আরও কিছু আমল করতে পারেন, যার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে যায়।
সবচেয়ে সহজ ও শক্তিশালী আমল: দোয়া ও ইস্তিগফার
কবরে শুয়ে থাকা প্রিয়জনের জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো দোয়া। হজরত উসমান বিন আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) জানাজার পর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন, “তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য মাগফিরাত কামনা করো।” কবর জিয়ারতের নির্দেশও দিয়েছেন। এতে প্রমাণ হয়, দোয়া মৃতের কাছে পৌঁছে, তাকে উপকৃত করে। প্রতি নামাজের পর, তাহাজ্জুদে, সেহরিতে—যখনই মন কাঁদে, তখনই হাত তুলে বলুন: “আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মু’মিনিনা ওয়াল মু’মিনাত...”। এই দোয়া কবরের অন্ধকারে আলো হয়ে পৌঁছায়।
দান-সদকা: সবচেয়ে প্রিয় উপহার
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক সাহাবি এসে বললেন, “আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন, অসিয়ত করতে পারেননি। আমি তার পক্ষে সদকা করলে তিনি সওয়াব পাবেন?” রাসুল (সা.) বললেন, “হ্যাঁ।”
একটা গরিবকে খাবার দেওয়া, কাউকে চিকিৎসার খরচ দেওয়া, কূপ খোদাই করা—এসবের সওয়াব মৃতের আমলনামায় যোগ হয়। সদকায়ে জারিয়া হলে তো কথাই নেই।
**হজ-উমরা ও কোরবানি**
মৃতের পক্ষে হজ করা যায়। এক মহিলা রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, তার বোন হজের মানত করেছিলেন কিন্তু মারা গেছেন। রাসুল (সা.) বললেন, “তুমি তার পক্ষে হজ করো। আল্লাহর হক আদায় করা অধিক হকদার।”
একইভাবে নফল কোরবানি করে সওয়াব পৌঁছানো যায়। ঋণ থাকলে রোজা রাখাও জায়েজ।
যেসব প্রথা ইসলাম সমর্থন করে না
আমাদের সমাজে অনেক ভালো উদ্দেশ্যে কিছু প্রথা চালু আছে—চল্লিশা, মৃত্যুবার্ষিকীতে ভোজ, টাকা দিয়ে কোরআন খতম করানো, কবরে ফুল দেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোর কোনো দলিল কুরআন-হাদিসে নেই। বরং এতে বিদআত ও অপচয়ের আশঙ্কা থাকে। রাসুল (সা.) বা সাহাবিরা এমন করেননি। তাই এসব থেকে বিরত থেকে সুন্নাহসম্মত আমলে মন দিন।
প্রিয়জন চলে গেলেও আমাদের সাথে তাদের সম্পর্ক শেষ হয় না। দোয়া, সদকা, হজ—এসবের মাধ্যমে আমরা তাদের কাছে ভালোবাসা পৌঁছে দিতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যসূত্রসমূহ:
১. সদকায়ে জারিয়া ও তিন আমলের হাদিস:
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৩১ (কিতাবুল ওয়াসিয়্যাত)
২. জানাজার পর দোয়ার হাদিস:
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩২২১
৩. মৃতের পক্ষে সদকার হাদিস:
সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৩৮৮ (কিতাবুজ জাকাত);
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০০৪
৪. মৃতের পক্ষে হজের হাদিস:
সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৮৫২ (কিতাবুল হজ)
#মৃতদেরজন্যদোয়া #ঈসালেসওয়াব #সদকায়েজারিয়া #ইসলামিকআমল #মাগফিরাত
#কবরেরশান্তি #দোয়াকরুন #ইসলামিজীবন #পরকাল #আল্লাহররহমত
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।