আদর্শ পরিবার: শান্তির আধার (প্রথম পর্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ। ডিসেম্বর ২৯, ২০২৫
ভূমিকা:
মানব সমাজের ভিত্তি হলো পরিবার—যেখানে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন থেকে শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে গভীর যাত্রা। আদম-হাওয়া (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রথম মানব পরিবার গড়ে উঠেছিল, আর সেই ধারা আজও অটুট। সারাদিনের কর্মক্লান্তি, মনের গভীরে জমে ওঠা দুঃখ-বেদনা—সবকিছুর মাঝে যে আশ্রয় দেয় শান্তি, তা হলো পরিবার। কল্পনা করুন, একটি বাড়ি যেখানে হাসি-কান্না মিলেমিশে একাকার, যেখানে প্রত্যেক সদস্য একে অপরের জন্য ছায়া হয়ে দাঁড়ায়। যদি পরিবারে শান্তি-শৃঙ্খলা থাকে, জীবন হয় সুখময়; না থাকলে, সবকিছু হয়ে যায় বিষাদময়, বিতৃষ্ণ। তাই আজকের এই লেখায়, আমি আলোচনা করব আদর্শ পরিবার গঠনের করণীয়গুলো—যা মানুষের আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তির আকর হয়ে উঠতে পারে। এমন এক পরিবার, যা শুধু দুনিয়াতে নয়, আখিরাতেও বন্ধন অটুট রাখবে।
পরিবারের পরিচিতি:
পরিবার গঠিত হয় স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা, দাদা-দাদী মিলিয়ে। অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধানে বলা হয়েছে: "A group consisting of one or two parents and their children." অর্থাৎ, পরিবার হলো পিতা বা মাতা অথবা উভয়ের এবং তাদের সন্তানদের সমষ্টি।[1] এটি শুধু একটি গ্রুপ নয়, এটি হৃদয়ের সেতু, যেখানে প্রত্যেকের অনুভূতি জড়িয়ে থাকে।
পরিবারের সূচনাকাল:
পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-কে কেন্দ্র করে জান্নাতে গড়ে উঠেছিল প্রথম পরিবার। আল্লাহ বলেন: "يَاآدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُوْنَا مِنَ الظَّالِمِيْنَ" (সুরা বাকারা ২/৩৫)। এই প্রথম পরিবার থেকে মানবজাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। আল্লাহ বলেন: "يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيْرًا وَنِسَاءً..." (সুরা নিসা ৪/১)। অন্যত্র: "يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَّأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوْبًا وَّقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوْا" (সুরা হুজুরাত ৪৯/১৩)।
সকল নবী-রাসুলের জীবনেও পরিবার ছিল। আল্লাহ বলেন: "وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً" (সুরা রা‘দ ১৩/৩৮)। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া: "رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَكَ..." (সুরা বাকারা ২/১২৮)।
পরিবারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
পরিবার হলো মানব সমাজের মূল ভিত্তি, যা ছাড়া সভ্যতা কল্পনাতীত। এটি শান্তি-শৃঙ্খলা, উন্নতির চাবিকাঠি। কল্পনা করুন, একটি বাড়ি যেখানে সকলে একে অপরের জন্য আশ্রয়—যদি তাতে ফাটল ধরে, সমাজ হয় বিশৃঙ্খল। তাই আদর্শ পরিবার গঠন অপরিহার্য।
১. মানব বংশ বৃদ্ধি: আল্লাহ বলেন: "وَاللهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ بَنِيْنَ وَحَفَدَةً..." (সুরা নাহল ১৬/৭২)। রাসুল (সা.) বলেন: "تَزَوَّجُوْا الْوَدُوْدَ الْوَلُوْدَ فَإِنِّىْ مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ"।[2]
২. মানব বংশ সংরক্ষণ: আল্লাহ বলেন: "وَهُوَ الَّذِيْ خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا فَجَعَلَهُ نَسَبًا وَصِهْرًا..." (সুরা ফুরকান ২৫/৫৪)। পরিবারে স্নেহ-মায়া তৈরি হয়, যা বংশ রক্ষা করে। কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণ বা ভ্রূণহত্যা হারাম—এতে মানবতা হারায়।
৩. শিক্ষা প্রদান: পরিবার এক অনন্য শিক্ষাগার। রাসুল (সা.) বলেন: "كُلُّ مَوْلُوْدٍ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ..."।[3] পিতা-মাতা সন্তানকে আল্লাহভীতি, দায়িত্ব শেখান—যাতে তারা সুনাগরিক হয়।
৪. শান্তি লাভ ও মহব্বত সৃষ্টি: আল্লাহ বলেন: "وَمِنْ آَيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجاً لِتَسْكُنُوْا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً..." (সুরা রুম ৩০/২১)। পরিবারে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি হয়, ভালোবাসা বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে—যা সামাজিক বিপর্যয়। ইসলামের বিধান মেনে ব্যক্তি সংশোধন দিয়ে শুরু করুন। রাসুল (সা.) বলেন: "مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيْرَنَا وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيْرِنَا فَلَيْسَ مِنَّا"।[4]
পারিবারিক জীবনের সুফল:
পরিবার মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক শান্তির উৎস। এটি শিশুকে সামাজিক করে তোলে, ইসলামী তাহজিব শেখায়। পরিবার সমাজের আয়না—যেখানে নিরাপত্তা, স্নেহ-মায়া আবদ্ধ। ব্যক্তি ভালো হলে পরিবার ভালো, সমাজ ভালো। আল্লাহ বলেন: "جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُوْنَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ..." (সুরা রা‘দ ১৩/২৩)।
৫. জৈবিক চাহিদা পূরণ: রাসুল (সা.) বলেন: "يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ..."।[5] বৈধ পথে চাহিদা পূরণে ছওয়াব।[6]
৬. মুমিনের বৈশিষ্ট্য: মুমিনের দোয়া: "رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ..." (সুরা ফুরকান ২৫/৭৪)।
পরিবার না থাকার ক্ষতিকর দিক:
পরিবার না থাকলে জীবন হয় নিরাপত্তাহীন, সহযোগিতাহীন। বিপদে কেউ এগিয়ে আসে না, অর্থ-সেবা কেউ দেয় না। বন্ধনহীনতা নৈতিক অবক্ষয় ডেকে আনে—পর্নোগ্রাফি, পরকীয়া, মাদকাসক্তি বাড়ে। বর্তমানে যুবকরা উচ্ছৃঙ্খল, পিতা-মাতা অসহায়। ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণিতে এ সমস্যা। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোই সমাজের ভারসাম্য রাখে—তাদের সংস্কার দরকার।
ইসলামে বৈরাগ্য নিষিদ্ধ: আল্লাহ বলেন: "وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا..." (সুরা হাদিদ ৫৭/২৭)। রাসুল (সা.) নিষেধ করেছেন।[7][8] পরিবার ছাড়া জীবন উদ্দেশ্যহীন।
আসুন, আদর্শ পরিবার গড়ি—ইসলামের আলোয়। এতে শান্তি ফিরবে, সমাজ উজ্জ্বল হবে।
[চলবে]
তথ্যসূত্র:
[1] Oxford Advanced Learner's English Dictionary (New York: Oxford University Press, 8th edn, 2010), p. 551.
[2] আবু দাউদ হা/২০৫০; মিশকাত হা/৩০৯১, সনদ সহিহ।
[3] বুখারি হা/১৩৬৫; মুসলিম হা/২৬৫৮; মিশকাত হা/৯০।
[4] আবু দাউদ হা/৪৯৪৩; তিরমিজি হা/১৯১৯; সহিহাহ হা/২১৯৬।
[5] বুখারি হা/৫০৬৬; মুসলিম হা/১৪০০; মিশকাত হা/৩০৮০।
[6] মুসলিম হা/১০০৬; মিশকাত হা/১৮৯৮।
[7] বুখারি হা/৫০৭৩; মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮১।
[8] নাসাই হা/৩২১৩; তিরমিজি হা/১০৮২; ইবনু মাজাহ হা/১৮৪৯; সহিহুল জামে‘ হা/৬৮৬৭।
ইন্টারনেট।
#আদর্শপরিবার #পারিবারিকশান্তি #ইসলামীজীবন #পরিবারগঠন #মুসলিমফ্যামিলি #শান্তিরআধার #FamilyGoals #IslamicFamily
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।