মরণোত্তর দেহদান: ইসলাম কী বলে?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ। জানুয়ারি ২০,২০২৬
যা কিছু মানুষের জন্য কল্যাণকর—ধর্ম মূলত তারই পৃষ্ঠপোষক। ধর্ম মানুষকে শেখায় দয়া, সহানুভূতি ও পারস্পরিক কল্যাণবোধ। একজন মানুষ যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন, ধর্মের মৌলিক দাবি হলো—সে যেন অন্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; বরং উপকৃত হয়। মানুষের বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাই কোনো ব্যতিক্রমী বিষয় নয়; এটি মানবিকতা ও ধর্মীয় নৈতিকতার স্বাভাবিক প্রকাশ।
এই প্রেক্ষাপটে মরণোত্তর দেহদান নিঃসন্দেহে একটি কল্যাণকর কাজ।
যা আজ আমাদের কাছে স্বাভাবিক বাস্তবতা, একসময় তা মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে ঘিরে এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—এগুলো বৈধ না অবৈধ? অথচ আল্লাহ তাআলার ক্ষমতাকে যদি আমরা সঠিকভাবে অনুধাবন করি, তবে এই প্রশ্নের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা এমন নন যে, একটি নির্দিষ্ট দেহ ছাড়া তিনি মানুষকে পুনরুত্থিত করতে পারবেন না। যদি কোনো দুর্ঘটনায় কারো দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং দেহের অংশবিশেষ পাওয়া না যায়, তাহলে কি সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন হিসাবের বাইরে থাকবে? স্পষ্টতই নয়। আল্লাহর বিচার বাহ্যিক দেহের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়।
মানুষ মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহর কাছে ফিরে যায় আত্মা, দেহ নয়। আমরা কেবল দেহ ত্যাগ করি। আর দেহকে সম্মানের সঙ্গে দাফন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কোনো অমর্যাদা না হয় এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ও রোধ করা যায়। ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই তার বিধানও বাস্তবসম্মত ও কল্যাণমুখী।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—মানুষের দেহ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলেও তিনি তা পুনরায় একত্র করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। তিনি বলেন—
“তারা বলে, আমরা যখন হাড়গোড়ে পরিণত হব এবং চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাব, এরপরও কি আমরা নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?
তুমি বল, তোমরা পাথর বা লোহা হয়ে গেলেও, কিংবা তোমাদের ধারণায় এর চেয়েও কঠিন কিছু হলেও—তোমাদের পুনরুত্থান অবশ্যম্ভাবী।”
(সুরা বনি ইসরাইল: ৪৯–৫২)
চোখ, কান, হৃদয়—সবই আল্লাহর সৃষ্টি। তাঁরই দেওয়া দেহের কোনো অংশ দিয়ে যদি তাঁর আরেক বান্দার জীবন রক্ষা করা হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ হওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়? আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তিনিই তোমাদের জন্য কান, চোখ ও হৃদয় সৃষ্টি করেছেন… তিনিই প্রাণ দেন ও মৃত্যু ঘটান।”
(সুরা মুমিনুন: ৭৮–৮০)
হাদিসেও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ দাজ্জালের পরিচয় বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন—
“সে এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে, অতঃপর তাকে আবার জীবিত করবে।”
(বুখারি ও মুসলিম)
আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমরা কী দেখছি? হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর হৃদপিণ্ড সাময়িকভাবে অপসারণ করে যান্ত্রিক হৃদযন্ত্রের মাধ্যমে তাকে জীবিত রাখা হচ্ছে; আবার সদ্য মৃত ব্যক্তির সুস্থ হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করে একজন মানুষকে নতুন জীবন দেওয়া হচ্ছে। অপারেশনের সময় রোগী কার্যত মৃতবৎ অবস্থায় থাকে, পরে পুনরুজ্জীবিত হয়।
এই বাস্তবতা কি রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায় না?
যদি এসব চিকিৎসা-পদ্ধতি ইসলামে অবৈধ হতো, তবে রাসুলুল্লাহ ﷺ অবশ্যই আমাদের সে বিষয়ে সতর্ক করতেন। তিনি শুধু নবী নন; আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য পথনির্দেশক ছিলেন, যিনি জানতেন একসময় বিজ্ঞান কোন দিকে অগ্রসর হবে।
আমার মৃত্যুর পর যদি আমার দেহের কোনো অঙ্গ আরেকজন মানুষকে জীবন দেয়, তাকে সমাজের জন্য কল্যাণকর করে তোলে—তাহলে তা কি আমার জন্য পাপ হবে?
বরং এটি সদকায়ে জারিয়া হওয়ার অধিক সম্ভাবনাই রাখে, যার সওয়াব চলমান থাকবে।
নিয়তই এখানে মূল বিষয়। আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরের নিয়ত দেখেন। নিয়ত যদি হয় মানুষের কল্যাণ, তবে প্রতিদানও হবে কল্যাণের।
যারা আশঙ্কা করেন—মরণোত্তর দেহদানের অনুমতি দিলে লাশ চুরি বা পাচার বাড়বে—এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। চুরি, ডাকাতি ও অপরাধ সমাজে আগে থেকেও ছিল। তাই বলে একটি সম্ভাব্য অপব্যবহারের আশঙ্কায় একটি কল্যাণকর কাজকে অবৈধ ঘোষণা করা যুক্তিসংগত নয়।
আল্লাহ তাআলা চাইলে মানুষের দেহ এক খণ্ডে সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী দেহকে বিভিন্ন অঙ্গে বিভক্ত করে সৃষ্টি করেছেন—যাতে একটি অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার চিকিৎসা সম্ভব হয়। কুরআন ও সুন্নাহ উভয়ই রোগের চিকিৎসাকে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন এবং অন্যকে চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন।
অতএব, কারো দেহের কোনো অংশ অকেজো হয়ে গেলে সে যদি অন্যের দানকৃত অঙ্গের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠে—এ বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সুতরাং কোনো বিষয়কে “হারাম” বা “অবৈধ” আখ্যা দেওয়ার আগে আমাদের দায়িত্ব—কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে গভীরভাবে চিন্তা করা। প্রকৃত ইসলাম সবসময় মানুষের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পরের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্রঃ
জাগোনিউজ২৪.কম
(মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০)
#মরণোত্তরদেহদান
#ইসলামওমানবকল্যাণ
#ধর্মওচিকিৎসাবিজ্ঞান
#কল্যাণইইসলাম
#ফিকহিচিন্তা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।