ইসলাম কি সত্যিই প্রচলিত দাসপ্রথাকে সমর্থন করে
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
বর্তমানে আমরা মুসলিম ব্যাতিত অন্যান্য জাতির ইতিহাস পড়লে দাসপ্রথার ব্যাপারে যে তথ্যগুলো জানি এবং দুনিয়াতে অন্যান্য জাতি ও সভ্যতা দাসেদের যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে তার সাথে ইসলামের নূন্যতম কোনো সম্পর্ক বিদ্যমান নেই। এই পৃথিবীর জমিনে যত মানুষ আছে তারা সবাই একমাত্র আল্লাহ দাস বা গোলাম। আল্লাহ দাস হওয়া ব্যাতিত ইসলামে অন্য কোনো মানুষ বা কথিত মূর্তির দাস হওয়ার কোনো অনুমোদন নেই। এই সম্পর্কে একটা হাদীস পেশ করছি। আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেন -
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাঃ) বলেনঃ তোমাদের কেউ যেন আমার দাস, আমার দাসী না বলে। ক্রীতদাসও যেন আমার প্রভু না বলে। সে বলবে, আমার যুবক, আমার যুবতী, আমার নেতা। তোমাদের প্রত্যেকেই দাস, কেবল মহামহিম আল্লাহই হচ্ছেন রব (প্রভু) (আবু দাউদ, নাসাঈ)।
( আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ২০৯)
এই একটা মাত্র হাদীসই যথেষ্ট নাস্তিক এবং ইসলামিক বিদ্বেষীদের ইসলামের ব্যাপারে দাসদের সম্পর্কিত করা সকল অভিযোগ খন্ডন করার জন্য! এই হাদীস থেকে আমরা মোটাদাগে তিনটা বিষয় পেয়ে যাচ্ছি -
১. কাওকে নিজের দাস বা দাসি বলা যাবে না
২. কাওকে নিজের প্রভু বলা যাবে না ( একমাত্র আল্লাহ ছাড়া)
৩. আমরা সবাই দাস কিন্তু তা একমাত্র আল্লাহর
তো যেসব মূর্খ নাস্তিকরা বলে যে ইসলাম অমানবিক কেননা এতে দাসপ্রথা আছে, এখন তাদের কি হবে? তারা কি এই হাদীস চোখ দিয়ে দেখে নি নাকি?
আচ্ছা আপনারাই বলুন তো অন্যান্য সভ্যতাতে যে দাসপ্রথা আছে এবং তাদের দাসদের সাথে তারা কি রকম করে সম্বোধন করে? বা তাদের সাথে কি রকম বর্বর আচরণটাই না করে! । অন্যন্য সভ্যতাতে তো কাজের লোক বা দাসকে মানুষই মনে করা হয় না, কিন্তু ইসলামে নিজপর বাড়ির যে কাজের লোক তাকে দাস বলেও সম্বোধন করার কোনো অনুমোদন নেই!
যাদেরকে মূলত নাস্তিক পশ্চিমারা দাস বলে সম্বোধন করে তাদের সাথে ইসলাম কি রকম ব্যবহার করতে বলে সে সম্পর্কে একটা হাদীস দেখুন। হাদীস -
মারূর ইবনু সুওয়াইদ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, একবার আমি আবূ যার গিফারী (রাঃ) -এর দেখা পেলাম। তার গায়ে তখন এক জোড়া কাপড় আর তার ক্রীতদাসের গায়েও (অনুরূপ) এক জোড়া কাপড় ছিল। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, একবার এক ব্যক্তিকে আমি গালি দিয়েছিলাম। সে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর কাছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন, তুমি তার মার প্রতি কটাক্ষ করে তাকে লজ্জা দিলে? তারপর তিনি বললেন, তোমাদের গোলামরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্ত করেছেন, কাজেই কারো ভাই যদি তার অধীনে থাকে তবে সে যা খায়, তা হতে যেন তাকে খেতে দেয় এবং সে যা পরিধান করে, তা হতে যেন পরিধান করায় এবং তাদের সাধ্যাতীত কোন কাজে বাধ্য না করে। তোমরা যদি তাদের শক্তির ঊর্ধ্বে কোন কাজ তাদের দাও তবে তাদের সহযোগিতা কর।
( সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২৫৪৫)
এই হাদীস থেকে যে বিষয়গুলো বুঝতে পারি তা হলো -
১. যাদেরকে পশ্চিমা দাস বলে, ইসলামের দৃষ্টিতে তারা আমাদের দাস না বরং তারা সেবক হলেও তারা আমাদের ভাই
২. আমরা যা খাবো তাদের তা খাওয়াবো
৩. আমরা যা পরিধান করব তাদের তা পরিধান করাবো
৪. তাদের এমন কাজ করতে দিব না যেটা তারা করতে পারবে না....
৫. যদি এমন কোনো কাজ হয় যেটা তারা একা করতে পারবে না, তাহলে সে কাজে আমরাও তাকে সাহায্য করব!
এখন আপনারাই বলুন তো পশ্চিমা জাহেলগুলো কি দাসদের নিজেদের ভাই ভাবে? তারা যে দামি পোষাক পড়ে তা কি তাদের দাসদের পড়তে দেয়? তারা যা খায় তা কি তার গোলামকে খাওয়ায়? এগুলোর সকল প্রশ্নের উত্তর হলো না! একদমই না!
যাদেরকে পশ্চিমা জাহেলগুলো দাস বলে সম্বোধন করে তাদেরকে ইসলাম এমন পর্যাদা আর অধিকার দিয়েছে যে এমন মর্যাদা আর অধিকার এই পৃথিবীর যমিনে অন্য কোনো জাতি- ধর্ম বা কোনো সভ্যতা প্রদান করে নি!
এখন আরেকটা হাদীস দেখুন -
আবূ মাস’ঊদ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, একদা আমার এক ক্রীতদাসকে প্রহার করছিলাম। এ সময় আমার পিছন হতে একটি শব্দ শুনতে পেলাম, হে আবূ মা’সঊদ! জেনে রাখো, আল্লাহ তোমার উপর এর চেয়ে বেশী ক্ষমতাবান যতটুকু তুমি তার উপর ক্ষমতাবান। আমি পিছন হতে তার এরূপ ডাক দু’বার শুনতে পেলাম। আমি পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখি, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল! সে আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য স্বাধীন (আমি তাকে মুক্ত করে দিলাম)। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তুমি যদি তাকে মুক্ত না করে দিতে তাহলে জাহান্নামের আগুন তোমাকে গ্রাস করতো।
( সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১৫৯)
লক্ষ্য করুন হাদীসটা। একজন তার গোলামের উপর প্রহার করেছে বলে নবীজি সাঃ সরাসরি বলে দিলেন যে তার উপর প্রহার করার জন্য জাহান্নামের আগুন তোমাকে গ্রাস করত, কিন্তু তুমি তাকে মুক্ত করে দিয়েছো বলে বেঁচে গেলে....
এখন আপনারাই বলুন তো, পশ্চিমা শয়তানগুলো যারা মানবতার কথা বলে কিন্তু দুনিয়াতে সকল অমানবিক কাজ করে তারা দাসদের সাথে কি রকম জানুয়ারের মতো ব্যবহারটাই না করে! তারা আফ্রিকার মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে দাস বানিয়ে অত্যাচার করে মেরেছে! তার বিপরীতে ইসলাম দাসদের উপরে প্রহার করার শাস্তি হিসাবে জাহান্নাম নির্ধারণ করে দিয়েছে....
আল্লাহর রাসূল সাঃ আরও বলেন -
যে তার মামলুক ( যাকে পশ্চিমারা দাস বলে) কে একটা চড় মারবে বা মারধর করবে সে তার কাফফারা হিসাবে দাসকে মুক্ত করে দিবে ( আবু দাউদ -৫১৬৮)
সুবহানাল্লাহ ! আপনারাই চিন্তা করুন ইসলাম কত বড় উদারতার পImage রিচয় দিয়েছে। আমরা যদি ভুল করে কোনো গোলামকে থাপ্পড়ও মারি তাহলে তাকে সাথে সাথে মুক্ত করে দেওয়া ইসলামের নির্দেশ!
আর ইসলামে কোনো আযাদ মানুষকেও দাস হিসাবে বিক্রি করার অনুমোদন নেই। এই সম্পর্কে হাদীস দেখুন -
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন যে, কিয়ামতের দিবসে আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হব। এক ব্যক্তি, যে আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করল। আরেক ব্যক্তি, যে কোন আযাদ মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করল। আর এক ব্যক্তি, যে কোন মজুর নিয়োগ করে তার হতে পুরো কাজ আদায় করে এবং তার পারিশ্রমিক দেয় না।
( সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২২২৭)
কোনো স্বাধীন মানুষকে যদি কেও বিক্রি করে তাহলে তার বিরুদ্ধে নবী নিজে সাক্ষ্য দিবে! আর সেখানে তো কাওকে দাস বানানোর কথা মাথাতেও আনা মূর্খামি এবং চরম গুনাহ এর কাজ....
তো আমরা এসব হাদীস থেকে অতি সহজে বুঝতে পাচ্ছি যে অন্যান্য সভ্যতা এবং জাতি ধর্ম দাস বলতে যা বুঝানো হয় তার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে একজন অসহায় ব্যক্তি যে আপনার বাড়িতে কাজ করে সে আপনার দাস না বরং আেনার পরিবারের লোক এবং আপনার ভাই, আপনার পরিবারের লোকের যে অধিকার আছে মৌলিক, সেগুলো সেও প্রাপ্য! আর তাদের উপর প্রহারও করা যাবে না.....
আমি এখানে যেসব হাদীস দেখালাম সেসব হাদীস নাস্তিকরা কখনো চোখ দিয়ে দেখে নি এবং দেখলেও তা বলবে না, তারা হলো সত্য গোপনকারী মূর্খ জাহেল ইসলাম বিদ্বেষী ছুপা হেদু শয়তান।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের হেদায়েত দান করুল, আমিন, আমিন, সুম্মা আমিন
তো সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।
লেখক : মোঃ মেহেদী হাসান ✍️
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
প্রিন্স ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।