আদর্শ পরিবার: স্বামীর ভূমিকা ও দায়িত্ব (দ্বিতীয় পর্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ। ডিসেম্বর ২৯, ২০২৫
পরিবারে স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য:
স্বামী পরিবারের দায়িত্বশীল প্রধান। তিনি সদস্যদের সাথে উত্তম ব্যবহার করবেন—এটি তার অপরিহার্য কর্তব্য। পরকালে এ বিষয়ে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন: "إِنَّ اللهَ سَائِلٌ كُلَّ رَاعٍ عَمَّا اسْتَرْعَاهُ أَحَفِظَ ذَلِكَ أَمْ ضَيَّعَهُ حَتّى يَسأَلَ الرَّجُلَ عَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ" — ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন যে, সে তা পালন করেছে না নষ্ট করেছে? এমনকি পুরুষকে তার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন’।[1]
আদর্শ পরিবার গঠনে স্বামীর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তার করণীয়কে দু’ভাগে ভাগ করা যায়: বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর। এ পর্বে বিবাহপূর্ব করণীয়ের মধ্যে প্রধানটি হলো ঈমানদার ও উত্তম স্ত্রী নির্বাচন।
১. ঈমানদার ও উত্তম স্ত্রী নির্বাচন:
পরিবারের কল্যাণ, শান্তি-শৃঙ্খলা নির্ভর করে ঈমানদার নারীর উপর। মুমিনা স্ত্রী সংসার, সন্তান ও দ্বীনী কাজে সচেষ্ট থাকেন। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন মুশরিক নারীকে বিবাহ না করতে। তিনি বলেন: "وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ..." (সুরা বাকারা ২/২২১)।
রাসুল (সা.) বলেন: "تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأَرْبَعٍ... فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ" — ‘নারীকে বিবাহ করা হয় চার কারণে: সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারি। তুমি দ্বীনদারিকে অগ্রাধিকার দাও, নইলে কল্যাণ বঞ্চিত হবে’।[2] অন্যত্র: "إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ..." — ‘যার চরিত্র ও ধার্মিকতায় সন্তুষ্ট হও, তার সাথে বিবাহ দাও; না হলে পৃথিবীতে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা ছড়াবে’।[3]
উত্তম স্ত্রী পাওয়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন। রাসুল (সা.) বলেন: "احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللهِ"।[4]
উত্তম নারীর বৈশিষ্ট্যসমূহ:
মুমিনা হওয়ার পরও যেসব গুণ তাকে শ্রেষ্ঠ করে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
ক. সতী-সাধ্বী, অনুগত ও লজ্জাস্থান হেফাযতকারিণী: আল্লাহ বলেন: "فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللهُ" (সুরা নিসা ৪/৩৪)। রাসুল (সা.) বলেন: "إِذَا صلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا... دَخَلَتْ مِنْ أَيِّ أَبْوابِ الجَنَّةِ شَاءَتْ"।[5] লজ্জাস্থান হেফাযত পরিবারের শান্তির চাবিকাঠি।
খ. দ্বীন ও ঈমানের কাজে সহযোগী: আল্লাহ বলেন: "وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ..." (সুরা তওবা ৯/৭১)। রাসুল (সা.) বলেন: শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো "...وَزَوْجَةٌ مُؤْمِنَةٌ تُعِينُهُ عَلَى إِيْمَانِهِ"।[6][7]
গ. প্রেম-ভালোবাসা বিনিময়কারিণী: রাসুল (সা.) বলেন: জান্নাতী নারী "...الْوَدُوْدُ الْعَؤُوْدُ... لاَ أَذُوْقُ غَمْضًا حَتَّى تَرْضَى"।[8][9] এতে স্বামীর মন অন্যদিকে যায় না।
ঘ. স্বামীকে মুগ্ধকারিণী: রাসুল (সা.) বলেন: "الَّتِى تَسُرُّهُ إِذَا نَظَرَ وَتُطِيْعُهُ إِذَا أَمَرَ..."।[10] শ্রেষ্ঠ সম্পদ: "...إِذَا نَظَرَ إِلَيْهَا سَرَّتْهُ..."।[11] কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেক নারী বাইরে সুশোভিত হয়, স্বামীর সামনে অপরিচ্ছন্ন থাকে।
ঙ. বিপদে সান্ত্বনাদানকারিণী: রাসুল (সা.) বলেন: উত্তম নারী "...الْمُوَاسِيَةُ..."।[12] খাদিজা (রা.)-এর সান্ত্বনা ও উম্মে সুলাইম (রা.)-এর ধৈর্যের উদাহরণ অনুকরণীয়।[13][14]
চ. স্বামীর চাহিদা পূরণকারিণী: রাসুল (سা.) বলেন: "إِذَا دَعَا الرَّجُلُ زَوْجَتَهُ... فَلْتَأْتِهِ وَإِنْ كَانَتْ عَلَى التَّنُّورِ"।[15][16]
ছ. স্বামীর অধিকার পূরণে অগ্রগামী: রাসুল (সা.) বলেন: "...فَإِنَّهُ جَنَّتُكِ وَنَارُكِ"।[17]
জ. খরচে মিতব্যয়ী: আল্লাহ বলেন: "...لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا..." (সুরা ফুরকান ২৫/৬৭)। অপব্যয় ধ্বংস ডেকে আনে।[18][19]
ঝ. নে‘মতের শুকরিয়া জ্ঞাপনকারিণী: রাসুল (সা.) বলেন: "لاَ يَشْكُرُ اللهَ مَنْ لاَ يَشْكُرُ النَّاسَ"। অকৃতজ্ঞতা জাহান্নামের কারণ।[20][21][22][23]
ঞ. স্বামীকে সম্মান ও কষ্ট না দেওয়া: রাসুল (সা.) বলেন: "لَوْ كُنْتُ أُمِرَ أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ..."।[24] কষ্ট দিলে হুররা বদদো‘আ করে।[25] স্বামীর হক আদায় না করলে আল্লাহর হক আদায় হয় না।[26]
ট. গৃহে অবস্থানকারিণী: আল্লাহ বলেন: "وَقَرْنَ فِيْ بُيُوْتِكُنَّ..." (সুরা আহযাব ৩৩/৩৩)। বাইরে গেলে শয়তান উদ্বুদ্ধ করে।[27]
ঠ. গোপনীয়তা রক্ষাকারিণী: রাসুল (সা.) বলেন: কিয়ামতে নিকৃষ্ট ব্যক্তি যে গোপনীয়তা প্রকাশ করে।[28][29]
ড. সন্তানের প্রতি স্নেহশীলা: রাসুল (সা.) বলেন: কুরাইশ নারীরা শিশুতে স্নেহশীল।[30]
ঢ. লজ্জাশীলা: লজ্জা ঈমানের অংশ।[31][32]
এছাড়া স্বামীর উপদেশ মানা, শালীন ভাষা, পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের প্রতি ইহসান—এসব উত্তম নারীর গুণ।
আসুন, ঈমানদার সঙ্গী নির্বাচন করে আদর্শ পরিবার গড়ি। এতে দুনিয়া-আখিরাতের শান্তি আসবে।
[চলবে]
তথ্যসূত্র:
[1] নাসাই, আস-সুনানুল কুবরা হা/৯১৭৪; সহিহাহ হা/১৬৩৬।
[2] বুখারি হা/৫০৯০।
[3] তিরমিজি হা/১০৮৪; ইরওয়া হা/১৮৬৮।
[4] মুসলিম হা/২৬৬৪।
[5] ইবনে হিববান হা/৪১৬৩; সহিহ আত-তারগিব হা/১৯৩১।
[6] ইবনে মাজাহ হা/১৮৫৬; সহিহাহ হা/২১৭৬।
[7] তিরমিজি হা/৩০৯৪।
[8][9] সহিহুল জামে‘ হা/২৬০৪; সহিহাহ হা/২৮৭, ৩৩৮০।
[10] নাসাই হা/৩২৩১; সহিহাহ হা/১৮৩৮।
[11] আবু দাউদ হা/১৬৬৪।
[12] সহিহুল জামে‘ হা/৩৩৩০।
[13] বুখারি হা/৩।
[14] মুসলিম হা/২১৪৪।
[15][16] তিরমিজি হা/১১৬০; সহিহাহ হা/১২০২, ১২০৩।
[17] সহিহুল জামে‘ হা/১৫০৯।
[18][19] মুসলিম হা/২২৫২; সহিহাহ হা/৫৯১।
[20] আবু দাউদ হা/৪৮১১।
[21][22] বুখারি হা/২৯; আহমাদ, সহিহাহ হা/৮২৩।
[23] সহিহাহ হা/২৮৯।
[24] তিরমিজি হা/১১৫৯।
[25] তিরমিজি হা/১১৭৪।
[26] ইবনে মাজাহ হা/১৮৫৩।
[27] তিরমিজি, মিশকাত হা/৩১০৯।
[28] মুসলিম হা/১৪৩৭।
[29] আহমাদ, ইরওয়া ৭/৭৪।
[30] বুখারি হা/৩৪৩৪।
[31][32] বুখারি হা/২৪; মিশকাত হা/৫০৭০, ৫০৭২।
ইন্টারনেট।
#আদর্শপরিবার #স্বামীরদায়িত্ব #উত্তমস্ত্রী #ইসলামীবিবাহ #পারিবারিকশান্তি #IslamicMarriage #IdealWife #FamilyInIslam
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।