আপনার সন্তানকে কখনোই দেখার সাথে সাথেই জিজ্ঞেস করবেন না," তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে? পরিক্ষার কি খবর?"আমরা প্রায়ই খাবার টেবিলে কিংবা সন্তানের সাথে দেখা হওয়ার সাথে সাথেই এই প্রশ্ন গুলো করি৷ আমাদের কাছে এটি স্বাভাবিক মনে হতে পারে৷ কিন্তু একটা সময় আসে,যখন সন্তান আপনাকে ভয় পেতে শুরু করবে,আপনাকে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে৷
আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলি৷ ছোটবেলায় আমি যেকোনো কথাই বাবা মার সাথে ভাগ করতাম৷ বাবা বাসায় এলে উৎফুল্ল হয়ে দৌড়ে যেতাম৷ কিন্তু এখন এমন হয়েছে যে ১০টাকা লাগলেও বাবা বা পরিবারের কাছে সহজে চাই না৷ যদিও আমি জানি দশ টাকা চাইলে বাবা হয়তো পঞ্চাশ টাকা দিবে৷ কিন্তু বাবাকে দেখলেই নিজেকে লুকিয়ে রাখি৷ কেন? কারণ আমাদের ছোট বেলায় বাবা মা যেমন বকা দিয়েছে,তার প্রভাব এখনো রয়েছে৷
উদাহরণসরূপ : খাওয়ার সময় ও যদি বাবা মা বলেন–
"তুমি তো কিছু খাওয়াও শিখো নাই৷ দেখোতো ওমুকের মেয়েটা কত সুন্দর সব কিছু খায়৷ আসলে তোমরা পাও তো তাই গায়ে লাগে না৷ ওমুকের মেয়েটা কিছু বাছে না সব খায়৷ আর তোমার এটা খাওয়ার সিস্টেম হলো?"
এই ধরনের কথা সন্তানের মনে কষ্ট দেয়৷ খাওয়া হলো শান্তির মুহূর্ত৷ সেই সময়ও যদি সন্তানকে অপমান,তুলনা করা হয়,তা তার উপর গভীর প্রভাব ফেলে৷ খাওয়ার সময় শুধু একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা যায়,কিন্তু এর মানে এই নয় যে–সেই সময় সন্তানকে খাওয়া,পড়াশোনা, গোসল,পরিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করা হবে৷
আপনি যদি নিজে বিশ্বাস করতে না পারেন,আপানার সন্তান ও বিশ্বাস শিখবে না৷ অনেক বাবা মা চায় সন্তান পরিক্ষায় অনেক এবং সবথেকে ভালো করুক৷ কিন্তু এর মানে এই নয় যে সন্তান সবসময় ভালো করবে৷ ছোট বেলায় পরিক্ষা হলে যখন বাবা মা জানতে চান কেমন হয়েছে পরিক্ষা?ভালো হলে ভালো বলতাম আবার খারাপ হলেও সাহস নিয়ে সত্য বলতাম যে খারাপ হয়েছে৷ বাবা মা তখনই শুরু করতো প্রশ্ন :
কেন খারাপ হলো? তোমার বান্ধবী সব পেয়েছে তুমি কেন পেলে না? পড়ো নাই? এগুলো কোনো কথা সহজ উত্তর পারো নাই? ইত্যাদি৷
এই ধরনের প্রশ্ন শিশুর মনোবল ভেঙে দেয়৷ ফলে শিশু শেখে সত্য বললে বকা খেতে হয় সুতরাং মিথ্যা বলাই নিরাপদ৷
এইভাবেই সন্তান বড় হয়ে জীবনের যেকোনো সমস্যার কথা আপানাকে আর বলবে না৷ বললেও বলে ' কোনো কিছু হয় নি,আমার সব ঠিক আছে৷ এর জন্য তার দোষ নেই কারণ আপানার সন্তান কে আপনি সত্য বলা শিখালেও আপনারই ব্যবহার এ সে সত্য ভয়ে পেয়ে মিথ্যা বলে নিজেকে রক্ষা করতে শিখেছে৷
আমাদের বাবা মা আমাদের জন্য অনেক ত্যাগ করেন,এটি সত্য৷ কিন্তু শুধু টাকা,সময়,বা সারাক্ষণ বকা-শাসন করলেই সন্তান ভালো হয় না৷ সন্তানের নিজের অনুভূতি, স্বাধীনতা এবং বিশ্বাস বজায় রাখাও খুব জরুরি৷
আপনি চাইলে সন্তানের সঙ্গে খেলাধুলার কথা বলুন,তাদের সঙ্গে সম্পর্কটা ধীরে ধীরে গড়ে তুলুন৷ খাওয়ার সময়, পড়াশোনার সময় বা যেকোনো মুহুর্তে চাপ দেওয়ার বদলে উৎসাহ দিন,বিশ্বাস দিন৷ শিশুর মনে নিরাপত্তা তৈরি করুন৷ তখনই তারা সত্য বলবে,ভুল করলেও বলবে বুঝবে,আপনাকে বিশ্বাস করবে৷
ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে বুঝাই _
আমার ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে৷ যখন বলতাম আজকে স্যার প্রাইভেট বন্ধ দিয়েছে৷ বাবা বলতো' দেখি নিপুকে কল দেই,আসলেই বন্ধ দিয়েছে কিনা?'''তুৃমি তো ছোট কি বুঝছো না বুঝেছো!"
ঠিক এই ধরনের আচরণ এই বাচ্চার সাহস কেটে যায়৷ ফলে এখন আমি আর কিছু বলি না,কোনো কথা ভাগ করিনা৷ যদিও কেউ কিছু বলবে না কিন্তু সাহস টা চলে গেছে৷
আপনি সন্তানকে সত্য বলা শিখাচ্ছেন কিন্তু যদি নিজের আচরণ এ সন্তান কে মিথ্যা শেখান,তা তার উপর গভীর প্রভাব ফেলে৷ সত্য বলার মাধ্যমে শিশু নিজেকে নিরাপদ মনে করে,কিন্তু সত্য বললেই বকা বা সন্দেহ প্রকাশ করলে সে মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়৷
আমাদের সন্তানকে ভালেবাসা,সম্মান ও স্বাধীনতা দেওয়া প্রয়োজন৷ শুধু ধন,সময়,আর কঠোর নিয়ম দিয়ে তারা ভালে হবে না৷ তাদের মনের শান্তি, বিশ্বাস এবং নিরাপত্তা বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা৷
নাহলে আপনার সন্তানও সত্য কে ভয় পেয়ে মিথ্যার আশ্রয়ই নিরাপদ মনে করে বাঁচতে শিখবে৷
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।