যয়তুন ছায়াতলে আফনানের শেষ ডায়েরি
—রফিক আতা—
ছোট্ট শিশু আফনান। সেই বিধ্বস্ত গাজার কোনো এক ধুলোমাখা ঘরে তার জন্ম। এখন তার বয়স মাত্র সাত। নিয়ম করে সে ডায়েরি লেখে—এই ডায়েরিই যেন তার সবচেয়ে আপন সঙ্গী। ডায়েরি লিখতে শিখিয়েছিলেন তার বাবা—সেই মানুষটি, যিনি গত বছর ইসরায়েলি বোমা হামলায় শহীদ হয়েছেন।
বাবা তাকে বলতেন—
“বেটা, নিয়ম করে লিখবি। এখানের ভোরের কথা, এখানের সন্ধ্যার কথা। এখানের চাঁদ আর যয়তুন পাতার কথা। যাতে একদিন, যখন বারুদের গন্ধে পৃথিবী নীরব হয়ে যাবে—মানুষ জানতে পারে গাজার নিভৃত সত্যকথা। যেন তোর লেখা ডায়েরির প্রতিটি পাতা বিলাসিতায় নিমগ্ন প্রভুদের অন্তত এক মুহূর্তের জন্য হলেও জাগিয়ে দেয়।”
গতরাতেও আফনান বাবার রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি—লাল রঙের জায়নামাজে বসে শান্ত মনে নামাজ পড়েছিল। তারাবির পর বসে নিজের ছোট্ট ডায়েরিতে দিনের কথা লিখছিল ধীরস্থির হয়ে।
সেদিনের লেখা ছিল এমন—
“এখন রাত। যুদ্ধবিরতির দিনগুলো একটু শান্তিতে কাটছে। রোজা, সালাত—সবই যেন মনোযোগ দিয়ে করতে পারছি। আলহামদুলিল্লাহ।
আজ বাবা’কে খুব মনে পড়ছে। জানি না বাবা কেমন আছেন! ঠিক এই সময়েই গত বছর বাবা শহীদ হয়েছিলেন। খুব ইচ্ছে করে বাবার কাছে যেতে… অথবা অন্তত বাবা যে স্বপ্নের জন্য জীবন দিলেন, সেই অপূর্ণ স্বপ্নের সামান্য অংশ যেন আমি পূরণ করতে পারি…”
কিন্তু হায়—
ছোট্ট আফনান কি জানত, এটাই তার ডায়েরির শেষ পাতা?
এটাই হবে তার জীবনের শেষ রাত?
সে কি জানত—
তার সেই শিশুসুলভ আকুলতাই পূর্ণ হতে চলেছে?
বাবার সাথে জান্নাতে, যয়তুন বৃক্ষের ছায়ায় পুনর্মিলন হতে চলেছে?
ডায়েরি লিখতে লিখতেই লাল জায়নামাজের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছিল আফনান। ডায়েরিটা তার পাশেই পড়ে ছিল। রাত শেষে, ভোর যখন আলো নিয়ে উদিত হওয়ার অপেক্ষায়—হঠাৎ গর্জে উঠল এক বিকট বিস্ফোরণ…
তারপর?
তারপর আর কিছুই শোনা যায়নি।
কারণ—শোনার জন্য যে জীবন প্রয়োজন—
সেই জীবন তখনই জান্নাতের সবুজ পাখি হয়ে উড়ে গেছে আকাশের দিকে।
তার ছোট্ট ডায়েরিটিও আর খুঁজে পাওয়া গেল না।
নিষ্ঠুর বোমা হামলার সেই ভোরে
আফনানের নিষ্পাপ দেহের সাথে সাথে
ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তার স্বপ্ন, তার লেখা, তার দিনলিপিও…
তবু, হয়তো কোথাও—
জান্নাতের যয়তুন ছায়ায় বসে
আফনান আবার লিখে চলেছে নতুন এক ডায়েরি।
যেখানে বেদনা নেই—
আছে শুধু শান্তি আর আলোর ভাষা।
দিনলিপি
২০/৩/২০২৫ইং
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।