রশীদিয়ার অলিখিত গল্প:
হিমালয়-ছোঁয়া সাফল্যের ইতিকথা
— রফিক আতা—
শরহে বেকায়া ও মেশকাত জামাতের বেফাক বোর্ড পরীক্ষা শেষের দিকে। রাত তখন ১২টা ৪৯ মিনিট। কামরার বাতিগুলো হলুদ আলো ছড়িয়ে ইলমি কোলাহলে ভরা অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি করেছে। কেউ ইখতেলাফি মাসআলা মুখস্থ করছে, কেউ আবার শেষ মুহূর্তের তাকরার ঘষে নিচ্ছে। কাগজের পাতায় কলমের ছুটে চলা খটখট শব্দের মধ্যে হঠাৎ করেই দরজায় কেউ একজন এসে দাঁড়ালেন ।
আমরা তাকিয়ে দেখি— নায়েব সাহেব হুজুর মুফতি ফয়জুল্লাহ সাহেব দা. বা., শান্ত মুখে ভিতরে প্রবেশ করছেন। গভীর রাতে তাঁর হঠাৎ আগমন—সারা কামরা যেন মুহূর্ত সময়ের জন্য থমকে যায়।
হুজুর ডাক দিলেন। সবাই বই গুছিয়ে একত্র হয়ে বসলাম। বাইরে শীতের কাছাকাছি পৌষের হাওয়া, গভীর নীরবতা। খানিক আগেই তারিখ বদলেছে । এই রাতটাকেই যেন সময় ভুলে গেছে। আমরা কৌতূহল-ভরা চোখে তাকিয়ে আছি হুজুরের দিকে।
হুজুর বয়ান শুরু করলেন—
স্বরে যেন সেই পুরোনো দিনের চরম আবেগ, নির্যাসভরা অভিজ্ঞতা। তিনি মাদ্রাসার শুরুযুগের খণ্ড-খণ্ড, বিচিত্র ঘটনাগুলো বলতে লাগলেন। প্রতিটি শব্দ তাঁর স্মৃতির ভিতর থেকে যেন নতুন করে জন্ম নিচ্ছে। আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে লিখে নিচ্ছি, শুনে নিচ্ছি।
১. নদীর পাড়ের ঘটনা—
মাদ্রাসার শুরুযুগ। ছাত্রদের দল নদীর পাড়ে কাজ করছে—কেউ মাটি কাটছে, কেউ জংলা পরিষ্কার করছে। হঠাৎ এক লোক এসে ছাত্রদের হাত থেকে কোদাল ছিনিয়ে নিয়ে নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয়। ছাত্ররা রাগে-ক্ষোভে লোকটিকে ঘিরে ফেলে। তাদের কথা— “এবার এই লোকটাকেই নদীতে ফেলবো!”
খবর পৌঁছায় হযরত ওয়ালা দা. বা. এর কাছে। তিনি তখন সাধারণ গেঞ্জি পরে ছিলেন। কোনো প্রটোকল ছাড়াই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন। এসে বললেন— “তোমরা লোকটাকে ছেড়ে দাও।”
তাঁর দৃঢ় অথচ মমতাপূর্ণ কণ্ঠে ছাত্রদের রাগ মুহূর্তেই শান্ত হয়ে যায়।
২. হযরতের নীতি—ক্ষমাই মহত্ত্ব
হযরতের নীতি এটাই: যে ক্ষতি করে, তাকে মাফ করে দাও।
রাসূলে কারিম সা. এর সেই অমর শিক্ষা—
“صِلْ مَنْ قَطَعَكَ، وَاعْفُ عَمَّنْ ظَلَمَكَ، وَأَحْسِنْ إِلَى مَنْ أَسَاءَ إِلَيْكَ”
(আদবুল মুফরদ, হাদীস ৪৫)
নায়েব সাহেব হুজুর বললেন—
“রাসুলে কারীম সা. এর এই তরিকা মেনে চলার কারণেই আজকের মাকামে হযরত ওয়ালা দা. বা. আলোকিত।”
৩. ছদ্মবেশী সাংবাদিকের ঘটনা
একবার এক সাংবাদিক কালো চশমা, ক্যাপ, ছদ্মবেশে মাদ্রাসায় আসে। মাতবাখে ঢুকে ভিডিও ধারণ করতে শুরু করে—মনে শত্রুভাব, বাইরে যাওয়ার পর যাতে খারাপ রিপোর্ট বানাতে পারে সেই উদ্দেশ্যে।
কিন্তু কেউ তাকে হয়রানি করল না। বরং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁকে সম্মানের সঙ্গে মেহমানদারি করল। সাংবাদিক নিজেই পরদিন স্বীকার করে—
“আমি ভুল উদ্দেশ্যে এসেছিলাম; যা দেখলাম, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।”
৪. জঙ্গিবাদের অপবাদ—ডিআইবির তদন্ত
এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ডিআইবিকে ভুল তথ্য দেয়—“রশীদিয়াতে জঙ্গি ট্রেনিং হয়!”
ঢাকা থেকে দল পাঠানো হয়।
চক্রান্ত এতদূর যায় যে: এক দরিদ্র মহিলাকে টাকা দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হয়—“মাদ্রাসাতে গোলাগুলির শব্দে আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না।”
কিন্তু ডিআইবিরা ছিলেন বিচক্ষণ। মহিলার আচরণে অসঙ্গতি তারা বুঝে ফেলেন। মাদ্রাসার ভেতরের পরিবেশ, ছাত্রদের আমল-আখলাক দেখে তারা বুঝতে পারে— “সব অপবাদ। সব মিথ্যা।”
৫. তিনটি স্টার—হেড কোয়ার্টারের রিপোর্ট:
এক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা হুজুরকে বলেছেন— “হযরতের নামের মধ্যে হেড কোয়ার্টারের রিপোর্টে তিনটি স্টার দিয়ে রাখা আছে।” তার মানে—হযরতের নামে ভবিষ্যতে যেসব অপবাদ আসবে সব অগ্রিম মিথ্যা বিবেচিত।
৬. প্রতিবাদহীনতার মাকাম
নায়েব সাহেব হুজুর বললেন—
“হযরত কোনোদিন প্রতিশোধও নেননি, প্রতিবাদও করেননি। শান্তি, সহনশীলতা, ধৈর্য—এই তিন অস্ত্রেই মাদ্রাসাকে টিকিয়ে রেখেছেন।”
সমস্ত কামরা নীরব হয়ে যায়—আমরা উপলব্ধি করি ধৈর্য যে কত বড় শক্তি।
৭. ‘পাগল’ ছদ্মবেশীরা—
তখনকার দিনে মাদ্রাসার আশেপাশে অনেক “পাগল” ঘুরে বেড়াত। আমরা ভাবতাম তারা দিশেহারা মানুষ। পরে জানা গেল—তারা আসলে গোয়েন্দা বিভাগের ছদ্মবেশী—মাদ্রাসার বিরোধীরা যাদের পাঠাতো ত্রুটি খুঁজতে।
৮. লস্করহাটের অন্যায়—
একবার লস্করহাট বাজারে মাদ্রাসার এক ছাত্রকে অকারণে মারধর করা হয়। ছাত্ররা উত্তাল হয়ে ওঠে। কিন্তু হযরত তখনো প্রতিবাদ করেননি। বলেছিলেন— “ধৈর্য ধরো, আল্লাহ দেখছেন।”
৯. হাঁসের ঘটনা ও জরিমানা
মাদ্রাসার হাঁস ক্ষেতে ঢুকে কিছু ধান খেয়ে ফেলেছিল। স্থানীয় একদল লোক হাঁসকে মারধর করে এবং তিন হাজার টাকা জরিমানা চাপায়।
এটা অন্যায়—তবু হযরত মাফ করে দেন।
১০. পিলখানা হত্যাকাণ্ডে রশীদিয়া জড়িত—
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের একদিন পরে যুগান্তরের পাতায় সংবাদ ছাপা হয়—
“এই ঘটনার সঙ্গে রশীদিয়া যুক্ত!”
মামলায় আসামিতে দেওয়া হয় "রশীদ আহমাদ" নাম। তদন্ত দল এসে দেখে— এটি হযরতের অতি অল্পবয়সী ছেলে। তার পক্ষে তো এমন কাজ কল্পনাও করা যায় না। সংবাদ—ভুয়া। অভিযোগ—ভুয়া। সবকিছু—শত্রুর চক্রান্ত।
—রাত আরও গভীর হয়। বাইরে থেকে হিমেল হাওয়ার গুঞ্জন ভেসে আসে। তখনো আমাদের কামরায় কেবল একটি আলো—শিক্ষার আলো—জ্বলছে।
নায়েব সাহেব হুজুর দা. বা. একের পর এক ঘটনার স্তর খুলে দিচ্ছেন—জামেয়ার চড়াই উৎরাই, রক্তে-ঘামে লেখা সাফল্যের ইতিহাস, প্রতিটি আঘাতের পেছনে ধৈর্যের দীপ্তি।
আমরা মুহূর্তের জন্য ভুলে যাই—ভোরে পরীক্ষা।
রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে হুজুর বয়ান শেষ করেন। আমরা বিস্ময়ভরা চোখে, কিতাব হাতে, আসনে ফিরে যাই। কিন্তু হৃদয়ের ভেতর গড়ে উঠেছে এক নতুন অনুভব— রশীদিয়ার প্রতিটি ইট, প্রতিটি কণায় আছে সংগ্রামের ইতিহাস আর হযরত ওয়ালা দা. বা. এর নববী আদর্শের প্রতিফলন।
নোট- ২৩, ১, ২০২৫ইং
দিনলিপি-৬,১২,২০২৫ইং
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।