স্মার্টফোনের দূষিত প্রলেপ: আঁধারের গল্প
—রফিক আতা—
১.
দশ গ্রামে আদনানের মতো ছেলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল—তাকে দেখলেই মনে হতো, কোনো মাটির ঢেলার ভেতরে যেন আলোর শিশির জমে আছে। চোখে শান্ত বিস্ময়, কথায় সরলতা, আর মুখে এমন ভদ্রতা—যেন সে কারো কাছে কখনো কটু কথা বলতে শেখেনি। গ্রামের অনেকেই বলত,
“এমন ছেলে আর জন্ম নেবে? আশপাশের এতগুলো গ্রাম ঘুরলেও এমন চরিত্রের ছেলেপালাই পাওয়া কঠিন!”
আদনানের বাবা-মা সেই পুরনো দিনের মানুষ—সাদা মাটা, পরিশ্রমী, ছোট খাটো সুখেই যাদের পৃথিবী ভরা। তাদের স্বপ্ন খুব বড় নয়, তবে নির্মল—
"ছেলেটা মানুষ হোক, আলোকিত হোক, কোরআনের হাফেজ হোক, আমাদের মাথার উপরে নূরের মুকুট রাখুক।"
টানাটানির সংসার। সকাল বিকেল মজুরির খোঁজ। একবেলা খাওয়া হলে দুইবেলা হয়তো পেটে পাথর বাঁধা। তবুও আদনানের বাবার মনে কখনোই ক্লান্তি ঢোকার সুযোগ নেই। তিনি নিজে ক্ষুধার্ত থাকলেও আদনানের থালা খালি হয় না। নিজের শরীর শক্তিহীন হলেও মাসের প্রথম তারিখে ছেলের মাদ্রাসার বেতন ঠিক সময়ে পৌঁছে যায়—যেন তিনি নিজের ভেতরকার সমস্ত শক্তিকে কেবল একটি জায়গায় ব্যয় করছেন: ছেলের ভবিষ্যত।
বাবা-মায়ের এই নির্মল আশা থেকেই আদনানকে ভর্তি করানো হয় শএকটি ভালো মানের হিফজ বিভাগে।
২.
একদিন বৃষ্টি থামার পরের সেই কাঁচা বাতাসে আমি গ্রামের মোড় ঘুরে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি আদনানের বাপ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। মুখে এমন আলো, মনে এমন উচ্ছ্বাস—যেন এইমাত্র তিনি কোনো মহাখুশির খবর শুনেছেন। তার গালের ভাঁজগুলো পর্যন্ত হাসছে।
আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম—
— “কি অবস্থা চাচা? আজ তো বেশ হাসিখুশি লাগছে আপনাকে?”
চাচা মাথা চুলকে শুধু বললেন—
— “আলহামদুলিল্লাহ, আমার পুতরে হাফেজ বানাই ফেললাম বাবা!”
বলাটা এমন সরল, এমন গর্বমাখা—যেন তার কণ্ঠের ভেতর দিয়ে মেঘলা আকাশে সূর্যের আলো ফুটে উঠলো। আমি নিশ্ছিদ্র আনন্দে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। ভাবলাম—গরিব বাবা-মায়ের সংগ্রাম কি তাহলে ফল দিয়েছে? সত্যিই কি আদনান তাদের স্বপ্ন পূরণ করেছে?
সেই একই দিন, বাড়িতে ফিরে আদনানের মায়ের কথাগুলো মনে পড়ল।
এক বৃষ্টির দুপুরে, আদনানেরর কচি মাথায় হাত রেখে তিনি বলেছিলেন—
— “পুত! আমি তো জীবনে কোরান শিখতে পারি নাই। তয় আমার ইচ্ছে তুই কোরানের হাফেজ হবি। আমার ইচ্ছাডা রাইখো বাপ…”
তখন ছোট্ট আদনান ভেজা গলায় বলেছিল—
— “ কিযে কননা আম্মা! আমি আপনার কথাটা রাখমু, আমি হাফেজ হইমু।”
আজ সত্যিই সেই কথার মান রেখেছে আদনান। পাগড়ি মাথায়, চোখে নূরের দীপ্তি—মা-বাবার স্বপ্নপূরণ যেন ঈদের চাঁদের মতো ঝলমল করছে।
৩.
কয়েকদিন পর একদিন আদনানেরর বাবা নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন। পিছন থেকে ডাক পড়ল—
— “আদনানের বাপ! ও আদনানের বাপ…”
ডাক শুনে ঘুরতেই দেখলেন ইমাম সাহেব। তাঁর চোখে কেমন যেন গুরুত্ব, মুখে অল্প হাসি তবে সেই হাসির ভেতর একটুখানি চাপা ভাব।
— “কি অবস্থা হুজুর, কেমন আছেন?”
— “ভালা—কিন্তু আপনার সাথে জরুরি কথা আছে।”
আদনানের বাপ কিছুটা অস্থির।
— “কি কইবেন কন হুজুর, অসুবিধা নাই।”
ইমাম সাহেব মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন—
— “মিয়া, ছেলেতো হাফেজ হইছে—মাশাল্লাহ। কিন্তু…”
এই ‘কিন্তু’ শব্দটা যেন আদনানের বাপের বুকের ভেতর শীতল শিকল হয়ে পড়লো।
— “কিন্তু কি হুজুর?”
ইমাম সাহেব একটু থেমে, গম্ভীর গলায় বললেন—
—মিয়া! “শুধু হাফেজ হলেই তো আর হয় না। এই হিফজটাকে ধরে রাখতে হয়। ভুলে গেলে সওয়াবের চেয়ে গুনাহই বেশি হয়। তাছাড়া শুধু মুখস্থ করলেই কোরআনের মর্ম বুঝা যায় না। আরও উঁচু শিক্ষার দরকার হয়। আর সেই জন্যই বলতেছি—ফেনীতে একখান মাদ্রাসা আছে। জামেয়া রশীদিয়া । মানুষ গড়ার কারখানা। বিশেষ করে তাদরিবুল হুফফাজ বিভাগ—যেখানে হিফজকে আয়রনের মতো মজবুত করা হয়। আরেকটা কথা—এই যুগের ছেলেপেলারা মোবাইলের কারণে সব নষ্ট হয়ে যাইতেছে। রশীদিয়াতে মোবাইলের ব্যাপারেও খুব কঠোর। আপনার ছেলের জন্য এটিই ভালো।”
আদনানের বাপ দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন—
— “তা হলে হুজুর, আমি ওখানে লইয়া যাই।”
৪.
বসন্তের শুরু। মাঠে মাঠে কচি পাতার উল্লাস। বাতাসে নতুন কুঁড়ির গন্ধ। সেই দিনই আদনানের বাপ তার আদরের ছেলেকে রশীদিয়ায় দিয়ে এলেন। মাদ্রাসার ভেতরে ইলমি হাওয়া, সবুজের মাঝখানে নিয়মের ছায়া—এ যেন এক নতুন পৃথিবী।
আদনান শুরুতে খুব ভালোই মানিয়ে নিল। ক্লাস, কোরআন, তিলাওয়াত, হিফজ—সবই তার জীবনের ছন্দ হয়ে উঠল। সন্ধ্যায় মাদ্রাসার বারান্দা দিয়ে যখন হিমেল হাওয়া বয়ে যেত, আদনান মনে মনে বলত—
"আম্মার স্বপ্নটা আরেকটু সাজাই। আব্বার কষ্টটা আরেকটু হালকা করি।"
কিন্তু সব গল্প এমন সরল পথে চলে না।
হঠাৎ একদিন—আদনান নেই!
ক্লাসে নেই, মাঠে নেই, বারান্দায় নেই। তার বিছানা খালি, বই খোলা কিন্তু মানুষ নেই।
ক্লাসে হৈচৈ পড়ে গেল। শিক্ষক থেকে সহপাঠী—কেউ জানে না ছেলেটা কোথায় গেল।
রাত গড়িয়ে সকাল।
দিন গড়িয়ে সপ্তাহ।
আদনান আর মাদ্রাসায় ফিরে এল না।
৫.
সময়ের নদী অনেক দূর বয়ে গেছে। আমি ভুলে যাইনি আদনানের সেই উজ্জ্বল মুখ আর পিতা-মাতার স্বপ্ন।
বহু বছর পর একদিন সেই একই রাস্তার মোড়ে আদনানের বাপকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি—একই জায়গা, কিন্তু অন্য আলো।
এবার তার চোখে নেই সেই উজ্জ্বলতা। মুখে কাঁচা হাসির বদলে গভীর ক্লান্তি। চোখের কোণ যেন শুকিয়ে গেছে বহুদিনের অপেক্ষায়।
আমি কাছে গিয়ে বললাম—
— “চাচা! অনেকদিন পর দেখছি। আদনান কেমন আছে?”
এক মুহূর্তে মনে হল চাচার বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে পড়ল। তিনি চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর মাটির দিকে তাকিয়ে ভাঙা কণ্ঠে বললেন—
“বাবা… আমার পুতরে তো আর পাই নাই।”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
চাচা ঠোঁট চাটলেন, গলায় ব্যথা মাখা স্বর—
— “তার দুলাভাই তাকে বলছিল—হিফজ শেষ করলে স্মার্টফোন কিনে গিফট দিবো। আমার পুতরে সেদিন সেইটা দিছে। আর ফোন পাইয়া সে মাদ্রাসা থেইকা পালায়। শুরু করলো সারারাত ফোন। গেম, ভিডিও… কিসু বুঝবার আগেই আমার পুত ফোনে অশক্ত হইয়া গেলো। পড়ালেখা বাদ দিল। মাদ্রাসা বাদ দিল। এখন কোথায় আছে—আমি কই জানি?”
কথাগুলো বলতে বলতে চাচার চোখ লাল হয়ে উঠল।
রাস্তার বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
যেখানে একদিন তাকে উজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম—সেই জায়গাতেই আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন মেহেদী রং হারানো এক চারা গাছের মতো ক্লান্ত।
তিনি খুব ক্ষীণ গলায় বললেন—
— “বাবা, গরিবের একটা পুত—স্বপ্ন ছিল, দোয়া ছিল। কিন্তু এই মোবাইল জিনিসডা… আমার পুতরে শেষ কইরা দিছে।”
তার চোখের নিচে কালি, গলায় কান্নার দাগ, আর মুখে এমন এক দীর্ঘশ্বাস—যেন পুরো গ্রামের বেদনা তিনি একা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
হাওয়াটা নিস্তব্ধ।
মানুষ আসা-যাওয়া করছে, কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে যেন সময় কয়েক মুহূর্ত থেমে গেল।
আমি অনুভব করলাম—হাফেজের পাগড়ি পরা আদনানের সেই আলোকিত ভবিষ্যত—মোবাইল নামের একটি ছোট যন্ত্র গিলে ফেলেছে, ঠিক যেমন আগুন একটুকরো কাগজকে মুহূর্তে গায়েব করে দেয়।
চাচা আর কিছু বললেন না।
শুধু আকাশের দিকে তাকালেন—যেখানে তার স্বপ্ন একসময় নূরের মতো ঝলমলে ছিল।
রচনাকাল—
ছয়, বারো, পঁচিশ ইং
শনিবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।