প্রত্যাবর্তন—আঁধার থেকে আলোর পথে
রফিক আতা
১.
আদনান বড়লোক ঘরের ছেলে। সদ্য এসএসসি শেষ করেছে। বয়সে তরুণ, কিন্তু বাবার ব্যবসার ভার যেন অকালেই তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায়ই তাকে বাবার বিশাল অফিসে বসতে হয়। পালিশ করা টেবিল, ঘূর্ণায়মান চেয়ার আর কাচের দেওয়ালে মোড়ানো সেই অফিসে বসে আদনান মনে মনে গড়ে তোলে নিজের ভবিষ্যৎ। ভাবে—একদিন সেও বাবার মতো বড় অফিসার হবে।
কাগজে কলমে হিসাব নিকাশ করতে করতে হঠাৎই সে ডুবে যায় স্বপ্নে— অঢেল বাড়ি, দামী গাড়ি, অগণিত জমিজমা, শানদার ভিলা। তার মনে হয়, জীবনের সেরা আনন্দ এই ভোগ-বিলাসেই।
কিন্তু রাত নামলে অন্য এক আদনান জেগে ওঠে। বন্ধুদের সাথে ক্লাবে আড্ডা, টেবিলে সাজানো ক্যারাম বোর্ড, হাতে মদের গ্লাস, সিগারেটের ধোঁয়া আর নেশার অন্ধকারে সে খুঁজে ফেরে মুক্তি। অথচ জানে— এ প্রাচুর্য সবই বাবার সুদের টাকায় গড়া। অন্তরের গভীরে মাঝে মাঝে প্রশ্ন ওঠে— এ জীবন কি সত্যিই সুখের? কিন্তু সে প্রশ্নকে সে নিজেই নেশার ধোঁয়ায় চাপা দিয়ে রাখে।
২.
আদনানের বাবা শফিক সাহেব— একজন বড় ব্যবসায়ী। তিনি অবসরের স্বপ্ন দেখেন। বারবার মনে মনে ভাবেন— “আর ক’দিনের মধ্যেই সব দায়িত্ব আদনানের হাতে তুলে দেব। ছেলে আমার নাম উজ্জ্বল করবে।” বাহ্যত তাদের পরিবার সুখী, কিন্তু সেই সুখ যেন জোনাকির আলো— দেখতে উজ্জল, অথচ ভেতরে ক্ষণস্থায়ী আর ভঙ্গুর।
৩.
এমনই এক সময়ে ফেনীর এক অজপাড়াগাঁয়ে অন্য এক আলোর রেখা যেন স্বমহিমায় ভাস্বর। জামেয়া রশীদিয়া ফেনী— এক অনিন্দ্য সুন্দর প্রতিষ্ঠান। ইলম ও আমলের পুষ্পোদ্যান এই জামেয়া আজ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে দিগন্ত বিস্তৃত প্রবাসে। এখানকার ছাত্ররা শুধু দীনের জ্ঞান অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা ছড়িয়ে দেয় নবীর রেখে যাওয়া দাওয়াত বিশ্বময়।
প্রতি বছর সালানাহ ইমতেহানের পর দীর্ঘ ছুটিতে ছাত্ররা দলবদ্ধ হয়ে বের হয় তাবলিগের মেহনতের উদ্দেশ্যে। তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দাওয়াত দেয়, বোঝায়— “হে মানুষ! আল্লাহর পথে ফিরে আসো।”
এবারও জামেয়া থেকে প্রায় সাড়ে সাতশ ছাত্র ৩৩টি জামাতে বিভক্ত হয়ে বের হয়েছে। সেই জামাতগুলোর একটির দায়িত্য পেলেন ইয়াকুব ভাই। তরুণ বয়স, কিন্তু বুকে রয়েছে নবীসুলভ ফিকর। উম্মতের দুঃখে তার চোখ ভিজে ওঠে, মনে হয়— প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনতে পারলে তিনি ধন্য হবেন।
৪.
এক বিকেলে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঝুঁকছে। আছরের নামাজ শেষে ইয়াকুব ভাইয়ের জামাত বের হলো গাস্তে। ধীর পায়ে তারা এগিয়ে এলো শহরতলীর একটি ক্লাবের সামনে। ভেতরে তখন বাজছে উচ্চস্বরে সাউন্ড বক্স, টেবিলজুড়ে ক্যারাম খেলা, হাসি-ঠাট্টায় মশগুল তরুণেরা। তাদের ভিড়েই আছে আদনান।
হঠাৎ দরজার সামনে দাঁড়াল জামাতের দল। পাগড়িওয়ালা তরুণদের দেখে মুহূর্তেই থেমে গেল সাউন্ড বক্স। চারপাশে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা।
ইয়াকুব ভাই শান্ত কণ্ঠে বললেন——“ভাইয়েরা, আমরা সবাই জানি জীবন ক্ষণস্থায়ী। আল্লাহ আমাদের কেবল খেলা আর আনন্দের জন্য সৃষ্টি করেননি। তিনি আমাদের পরীক্ষা করেন। অনেক সময় আমরা পথ হারাই, ভ্রান্ত পথে চলি। কিন্তু হেয় নয়—কারণ তিনি ফেরার পথ রেখেছেন। যেমন তিনি বলেন:
‘قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ’
‘বলুন, আমার সেই বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর অনিয়ম করেছে, হে বান্দারা! আল্লাহর রহম্য থেকে হতাশ হইও না।’ [সূরা যুমার: ৫৩]
কথাগুলো যেন সরাসরি আদনানের অন্তরে গিয়ে বিঁধল। বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো কিছু। সে প্রথমবার নিজের ভেতর শুনলো এক ভিন্ন সুর—যেন কেউ তাকে ডাকছে। বারবার হৃদয় মাঝে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই আয়াতের একটি অংশ—
لا تقنطوا من رحمة الله
ক্লাবের বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকালো, কেউ হাসলো, কেউ আবার মাথা নিচু করে রইল। কিন্তু আদনান স্থির হয়ে বসে রইল। ইয়াকুব ভাই আবার বললেন—“একদিন এই জীবন শেষ হবে। তখন শুধু আমলই কাজে লাগবে। কিন্তু আজ—আজই তুমি ফিরে আসো, এখনই ফিরে আসো। সময় না নষ্ট করো, আল্লাহর কাছে ফিরে যাও। মনে রেখো, যারা ফিরবে, তাদের জন্য রয়েছে মুক্তি, শান্তি, ও আশীর্বাদ।”
আদনান চোখ নামিয়ে ফেললো। মনে হলো, এই ডাক তার জন্যই। ইয়াকুব ভাইয়ের দৃষ্টি ও কথার মায়ায় সে আর নিজের ভেতরের টানকে অস্বীকার করতে পারলো না। অবশেষে সে রাজি হলো এক চিল্লায় বের হতে।
৫.
চিল্লার দিনগুলো আদনানের জীবন পাল্টে দিলো। ভোরের ফজর নামাজে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, এটাই প্রকৃত শান্তি। দিনের পর দিন দাওয়াত, কুরআন তেলাওয়াত, নামাজ আর সাথীদের মেহনত— সবকিছু তার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করলো।
রাতের নেশা, জুয়ার টেবিল, মদের গ্লাস— সব যেন অনেক দূরের স্মৃতি হয়ে গেলো। একসময় যে আনন্দে সে ডুবতো, এখন সেগুলো মনে হয় বিষের মতো। তার বদলে আল্লাহর পথে সময় কাটানোর স্বাদ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখলো।
চিল্লা শেষে যখন সে বাড়িতে ফিরলো, তখন তার মনে বড় এক দ্বিধা। ব্যবসার মোহ আর নবপাওয়া আলোর টান— কোন পথ বেছে নেবে?
৬.
ঠিক তখনই জামেয়া রশীদিয়ার কিছু ছাত্র তাকে জানালো—
“ভাই, এখানে কুল্লিয়্যাতুশ শরীযাহ নামে একটি বিশেষ বিভাগ আছে। স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির ছাত্ররাও এখানে ভর্তি হয়ে কুরআন-হাদিস শিখতে পারে। এখানে তোমার মতো অনেকেই এসেছে—যারা আগে ভিন্ন পথে ছিলো, পরে আল্লাহর পথে ফিরো এসেছে। তুমিও চলে এসো”
আদনানের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মনে হলো, তার খোঁজা উত্তর মিলেছে এখানেই। ছাত্রদের উৎসাহ, স্নেহমাখা দাওয়াত আর নিজের অন্তরের টান মিলিয়ে সে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলো— ব্যবসার জগত নয়, তার জীবন হবে দীনের পথে নিবেদিত।
৭.
অবশেষে সে ভর্তি হলো জামেয়া রশীদিয়ার কুল্লিয়্যাতুশ শরীয়হ বিভাগে। বাবার ব্যবসার স্বপ্নকে পেছনে ফেলে সে বেছে নিলো নবীর রেখে যাওয়া দীনের উত্তরাধিকার। নতুন বই, নতুন পাঠ, নতুন সাথী আর নতুন জীবনের আলোয় আদনান যেন নতুন করে জন্ম নিলো।
তার প্রত্যাবর্তন শুধু নিজের জীবনে নয়, বরং আশপাশের মানুষদের কাছেও হলো এক নতুন দৃষ্টান্ত। সবাই বুঝলো— আল্লাহ ডাকলে ফিরবার দরজা কখনোই বন্ধ হয় না।
সমাপ্তি
অন্ধকার থেকে আলোর পথে, বিভ্রান্তি থেকে নিশ্চয়তার পথে আদনানের এই প্রত্যাবর্তন যেন এক জীবন্ত শিক্ষা— দুনিয়ার মোহ যতই টানে, আল্লাহর পথে ফেরার আনন্দ তার চেয়ে অগণিত গুণ গভীর।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।