এক শিশিরসিক্ত প্রত্যুষের আওলিয়ানগর
—রফিক আতা —
ভোরের হিমেল হাওয়া। হেমন্তিকার ছড়াছড়ি চারদিকে। ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকা শিশিরবিন্দু, সিমগাছের শুভ্র ফুলের পাশে রঙিন প্রজাপতির নীরব উড়াল।
সকালটা ভারি সুন্দর। এমন মোহনীয় ভোর কতদিন আর উপভোগ করা হয়? বা উপভোগ্য হয়ে ওঠে?
সূর্য তখনও কোমল রশ্মি ছড়াতে শুরু করেনি। আমি আনমনে হেঁটে চলেছি পূবের অজানায়। ঠিক সেদিকেই, ছোটবেলায় যেখানে তাকিয়ে মনে হতো—আকাশ বুঝি একটু নিচে নেমে এসেছে, ছুঁয়ে ফেলেছে পৃথিবীকে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কদম থেমে যায় এক সোনালি উদ্যানের মায়ায়—আওলিয়া নগর। নামের মতোই যেন বাস্তবতাও। সত্যিকারের আওলিয়াদের শহর।
সেই শহরের এক আলোকদায়ী পুরুষ—আল্লামা খালেদ সাইফুল্লাহ হাফিজাহুল্লাহ। যিনি হাফেজ্জি হুজুর রহ. এর ইজাযতপ্রাপ্ত খলিফা। এমনকি জামাতার মর্যাদাও তাঁর প্রাপ্ত। কোথা থেকে এসে, কীভাবে যেন এক অজপাড়াগাঁ চর কাদিরার বুকে জ্বালালেন আলোর এক অনন্ত প্রদীপ।
প্রদীপটির নাম আতহারুল উলুম, আর সেই প্রদীপের আলোয় এই স্থান হয়ে উঠেছে 'আওলিয়া নগর' নামে প্রসিদ্ধ।
দুই দশকের অধিককাল ধরে এই আলোকিত প্রতিষ্ঠান ছড়াচ্ছে জ্ঞানের আলো। গড়ে তুলছে অসংখ্য হাফেজ ও আলেম। এক সময়কার নিভৃত অজপাড়াগাঁ আর অজপাড়া নেই—এখন তা যেন এক আত্মপ্রত্যয়ী আলোর কেন্দ্র।
এই মহান সাধকের সোহবত ও সংস্পর্শে সুরভিত হতে থাকে গ্রামের পর গ্রাম, মানুষ থেকে মানুষ—শিক্ষিত ও সাধারণ নির্বিশেষে। তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য।
ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধির ময়দানে যেমন তিনি এক পরিপূর্ণ পীর, তেমনি রাজনীতির ময়দানে এক বলিষ্ঠ বীর। একজন কওমি ধারার আলেম হয়েও পৌঁছে গেছেন চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান পর্যন্ত। সাইকেল থেকে পাজেরো—সবই যেন তাঁর আকাশছোঁয়া সফলতার সাক্ষ্য।
যখন মাদরাসার আঙিনায় প্রবেশ করি, অজানা থেকে আসা এক পশলা মৃদু বায়ুর আলতো ছোঁয়া আমাকে হঠাৎই উদাস করে তোলে। অবোলা মন থেকে হঠাৎই স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ—
"হ্যাঁ, এ তো সত্যিই আল্লাহওয়ালাদের উদ্যান! আওলিয়া নগর, আওলিয়াদের শহর!"
—মাদরাসা ক্যাম্পাসের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি নীরব আলিশান মসজিদ। তারই পাশে বসে আছেন জান্নাতি সৌরভে ঘেরা এই মহান মানুষটি।
সাধারণ পোশাক। একটিমাত্র কাঠের চেয়ারে বসে। কিন্তু আশ্চর্য এক দৃশ্য! তাওয়াজু ও বিনয়ের এক অকল্পনীয় প্রতিচিত্র।
বড় বড় কিছু বকরি, নিকষ কালো লোমে ঘেরা, সরু শিংযুক্ত, ঘিরে আছে তাঁকে। তিনি স্বহস্তে বন রুটি তুলে দিচ্ছেন তাদের মুখে, নিখাদ স্নেহে।
একটি ছাগল একটু দূরে দাঁড়িয়ে, যেন মন খারাপ তার। হুজুর নিজেই উঠে গিয়ে কাছে যান। মমতার হাত বুলিয়ে দেন মাথায়। সেই ছাগলটিও এবার অন্যদের সঙ্গে মিশে খেতে শুরু করে।
সুবহানাল্লাহ!
আমার অবচেতন মন বুঝে উঠতে পারে না—আল্লাহওয়ালারা এত অমায়িক হন কীভাবে? এত বিনয়ী কেন?
তবে কি তাদের বড় হওয়ার পেছনের রহস্য এটাই?
তবে কি এটাই সেই পুশিদা রাজ, যার মাধ্যমে তাঁরা হয়ে ওঠেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।