সিরিজ-মণ্ডপ থেকে জীবনে: দুর্গা পূজা নিয়ে ভাবনা
দুর্গা ও বিজ্ঞান
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৫ অক্টোবর ২০২৬
সন্ধ্যার পর পূজামণ্ডপে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়ে আলো। চারপাশে মানুষের ভিড়, ধূপের গন্ধ, ঢাকের শব্দ, শিশুদের ছুটোছুটি। কেউ প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, কেউ একটু দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছে।
প্রতিমার দিকে তাকালে চোখ আটকে যায় অন্য জায়গায়। দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত করছেন।
দৃশ্যটি আমরা প্রতি বছর দেখি। এতবার দেখি যে অনেক সময় দেখেও দেখি না।
কিন্তু একটু থেমে দেখলে প্রশ্ন আসে—দেবীর দশটি হাত কেন?
একজন মানুষের তো দুটি হাতই যথেষ্ট। তাহলে দেবীকে দশ হাতে কল্পনা করার প্রয়োজন হলো কেন?
এর উত্তর বিজ্ঞান বইয়ে পাওয়া যাবে না। কারণ দুর্গা কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নন। কিন্তু মানুষের কল্পনা, প্রতীক তৈরি করার ক্ষমতা এবং প্রকৃতিকে বোঝার ইতিহাসের দিকে তাকালে দশ হাতকে অন্যভাবে পড়া যায়।
হয়তো এটি মানুষের সেই পুরোনো স্বপ্নের ছবি, যেখানে একজন মানুষ একসঙ্গে অনেক বিপদের মোকাবিলা করতে চায়।
দুর্গার হাতে থাকা অস্ত্রগুলো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নয়। কিন্তু প্রতীক হিসেবে এগুলো মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, সাহস ও প্রতিরোধের ইচ্ছার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।
এখানে একটা পার্থক্য পরিষ্কার রাখা দরকার।
ধর্ম প্রতীক দিয়ে অর্থ খোঁজে। বিজ্ঞান প্রমাণ দিয়ে সত্য যাচাই করে।
দুটোকে এক করে ফেললে সমস্যা হয়। আবার একটিকে অন্যটির শত্রু ভাবলেও মানুষের চিন্তার একটা বড় অংশকে ছোট করা হয়।
বিজ্ঞান জানতে চায়, কোনো দাবির প্রমাণ কী। ধর্ম অনেক সময় জানতে চায়, মানুষের জীবনের অর্থ কী। দুটি প্রশ্ন এক নয়।
তবু মানুষের ইতিহাসে এরা পাশাপাশি হেঁটেছে।
অনেক আগে মানুষ বজ্রপাত, বৃষ্টি, ঝড়, রোগ কিংবা গ্রহণের বৈজ্ঞানিক কারণ জানত না। প্রকৃতির অজানাকে সে গল্প, পুরাণ ও প্রতীকের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেছে।
তারপর প্রশ্নগুলো অন্য পথে হাঁটল।
কেন?
কীভাবে?
প্রমাণ কোথায়?
সেখানেই বিজ্ঞানের শক্তি।
বিজ্ঞান শুধু উত্তর দেয় না, নিজের উত্তরকেও প্রশ্ন করার সুযোগ রাখে।
এই মানসিকতাটা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও দরকার।
আমরা কত সহজে একজন মানুষকে দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি—সে খারাপ, সে অহংকারী, সে অলস। একবারও যাচাই করি না।
ধারণা আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।
আমি যা বিশ্বাস করি, সেটা কেন বিশ্বাস করি—এই প্রশ্নটাও জরুরি। প্রশ্ন করা মানেই অবিশ্বাস করা নয়। কখনো প্রশ্ন করাই বিশ্বাসকে গভীর করে।
দুর্গার দশ হাতকে তাই প্রতীকের ভাষায় পড়লে সেখানে শুধু অস্ত্র দেখি না। দেখি মানুষের বহু রকম ক্ষমতা—জ্ঞান, সাহস, ধৈর্য, বিচারবুদ্ধি, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধ।
আর বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, ক্ষমতা ব্যবহার করার আগে তার পরিণতিও বুঝতে হয়।
পারমাণবিক শক্তির কথাই ধরা যাক। একই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ তৈরি হয়েছে, আবার ভয়াবহ ধ্বংসের অস্ত্রও তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞান সিদ্ধান্ত নেয় না, সেই শক্তি দিয়ে মানুষ কী করবে। সিদ্ধান্তটা মানুষকেই নিতে হয়।
তাই শক্তি কার হাতে আছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—শক্তি দিয়ে সে কী করছে।
এই জায়গায় দুর্গার প্রতীক নতুন অর্থ পায়।
দেবী অসুরের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। আধুনিক মানুষকে দাঁড়াতে হয় অজ্ঞতা, মিথ্যা তথ্য, কুসংস্কার এবং অন্ধ অনুসরণের বিরুদ্ধে।
তবে বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া মানে ধর্মকে নিয়ে ঠাট্টা করা নয়। আবার ধর্মবিশ্বাসী হওয়া মানে প্রমাণহীন দাবিকে বিজ্ঞান বলে চালিয়ে দেওয়া নয়।
দশটি হাতকে দশটি গ্যালাক্সি বলে দিলেই সেটা বিজ্ঞান হয়ে যায় না। মহিষাসুরকে কোনো বৈজ্ঞানিক রোগের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেও পুরাণ বিজ্ঞান হয়ে যায় না।
বিজ্ঞানকে বিজ্ঞান থাকতে দিতে হয়।
পুরাণকে পুরাণ হিসেবে বুঝতে হয়।
প্রতীককে প্রতীক হিসেবে পড়তে হয়।
এই সীমারেখাটাই বুদ্ধিবৃত্তিক সততার জায়গা।
আর মানুষের জীবনে এই সততা খুব দরকার।
“আমি ভুল করেছি”—এই চারটি শব্দ অনেক সময় দশটি অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। কারণ ভুল স্বীকার করার জন্য শুধু জ্ঞান নয়, নিজের অহংকারের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হয়।
আজ আমরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করি। কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা শুধু ল্যাবরেটরি বা প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রশ্ন করার অভ্যাস, প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া, ভুল হলে মত বদলানোর সাহস এবং না জানাকে স্বীকার করার বিনয়।
দুর্গার প্রতীক আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে আরেকটি বিষয়—ভয় পেলেও অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস।
দুটি পথ আলাদা। একটি বিশ্বাস ও প্রতীকের ভাষায় কথা বলে, অন্যটি পরীক্ষা ও প্রমাণের ভাষায়। তবু মানুষের জীবনে তাদের পাশাপাশি বসানোর একটি জায়গা আছে—সেটি হলো কৌতূহল।
পূজামণ্ডপের আলো একসময় নিভে যাবে। ঢাক থেমে যাবে। প্রতিমা বিসর্জনে যাবে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যেতে পারে।
আমি যা বিশ্বাস করি, তার কতটা আমার নিজের বোঝা, আর কতটা শুধু শুনে আসা?
হয়তো সেই মানুষটিই সত্যিকারের শক্তিশালী, যে হাতে শক্তি রেখেও মাথার ভেতরের প্রশ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।