হারিয়ে যাওয়া গ্রামের গল্প
বিলুপ্ত হচ্ছে গ্রামের খেলাধুলা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০২ আগষ্ট, ২০২৬
একটা লাঠি আর একটা কাপড়ের বল। এই দুটো থাকলেই আমাদের একটা গোটা বিকেল কেটে যেত। আলাদা করে দামি খেলনার প্রয়োজন হতো না। একটা খোলা মাঠ আর একঝাঁক বন্ধু—এই ছিল আমাদের আনন্দের পৃথিবী। বিকেল নামলেই কাউকে আলাদা করে ডাকতে হতো না। ঘড়ি না দেখেও সবাই ঠিক সময়ে মাঠে হাজির হয়ে যেত।
গোল্লাছুট, কানামাছি, দাঁড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, ডাংগুলি, বউচি—প্রতিটি খেলার ছিল আলাদা আনন্দ। কোথাও গতি, কোথাও বুদ্ধি, কোথাও দলবদ্ধ লড়াই। হার-জিত নিয়ে মনোমালিন্য হতো, তর্কও হতো, কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই সবাই আবার একসঙ্গে খেলায় মেতে উঠত। অভিমান বেশিক্ষণ টিকত না, কারণ বন্ধুত্বটাই ছিল বড়।
আমাদের শৈশবের বড় একটা অংশ কেটেছে মাঠে। ধুলো মেখে বাড়ি ফিরতাম, জামাকাপড় নোংরা হতো, মায়ের বকা খেতাম। কিন্তু পরদিন বিকেল হলেই আবার মাঠের টান অনুভব করতাম। তখন শরীরচর্চা বা স্বাস্থ্যসচেতনতার কথা আমরা জানতাম না। খেলতে খেলতেই শরীর সুস্থ থাকত, মনও থাকত প্রফুল্ল।
আজ গ্রামের চিত্র অনেক বদলে গেছে। খোলা মাঠের সংখ্যা কমে এসেছে। কোথাও সেখানে বাড়িঘর উঠেছে, কোথাও বাজার, কোথাও আবার ইটভাটা। মাঠ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলার পরিবেশও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর জীবন। এখন অনেক শিশুর বিকেল কাটে মোবাইলের পর্দায়। অনলাইন গেমে তারা হয়তো অসংখ্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকে, কিন্তু পাশের বন্ধুর হাত ধরে দৌড়ানোর আনন্দ, একসঙ্গে হেরে আবার নতুন করে খেলা শুরু করার অভিজ্ঞতা কিংবা মাঠভরা হাসির শব্দ—এসব থেকে তারা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
তবে এর জন্য শুধু শিশুদের বা প্রযুক্তিকে দোষ দিলে চলবে না। বড়দেরও দায় আছে। আগে পরিবারের মানুষ নিজেরাই শিশুদের মাঠে খেলতে উৎসাহ দিতেন। এখন পড়াশোনার চাপ, নিরাপত্তার উদ্বেগ কিংবা ব্যস্ত জীবনের কারণে অনেক শিশুই বাইরে খেলতে যাওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে খেলাধুলা তাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে।
অথচ গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। সেগুলো শিশুদের সহযোগিতা করতে শিখিয়েছে, নিয়ম মেনে চলতে শিখিয়েছে, নেতৃত্ব দিতে শিখিয়েছে, আবার পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিক শক্তিও গড়ে তুলেছে। বই থেকে জ্ঞান অর্জন করা যায়, কিন্তু জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা মাঠেই শেখা যায়।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়, যখন দেখি আজকের অনেক শিশু গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা কিংবা ডাংগুলির নামও জানে না। হাডুডু যে আমাদের জাতীয় খেলা এবং লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেটিও অনেকের অজানা। একটি প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় না জেনেই বড় হয়ে উঠছে।
তবে আশার জায়গা এখনো আছে। ইচ্ছে থাকলে এই পরিবর্তনের ধারা অনেকটাই বদলানো সম্ভব।
প্রথমত, গ্রামের খোলা মাঠগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিটি পাড়ায় অন্তত একটি মাঠ শিশুদের খেলাধুলার জন্য রক্ষা করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, পরিবারকে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিন কিছু সময় খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া শিশুদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, স্কুল, গ্রাম্য মেলা, নবান্ন, ঈদের ছুটি কিংবা পাড়ার বিভিন্ন আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী খেলার প্রতিযোগিতা নিয়মিত আয়োজন করা উচিত। শিশুদের একবার মাঠের আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে তারা নিজেরাই সেই টান অনুভব করবে।
শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি কখনো দামি খেলনা দিয়ে তৈরি হয় না। একটি লাঠি, একটি কাপড়ের বল আর কয়েকজন প্রাণের বন্ধু—এতেই গড়ে উঠতে পারে এক অসাধারণ শৈশব। সেই ধুলোমাখা বিকেলগুলোই বড় হয়ে মানুষের মুখে নস্টালজিয়ার হাসি এনে দেয়।
হয়তো আমরা অতীতকে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্তত সেই ঐতিহ্যের পথ খুলে দিতে পারি। যেন তারা একদিন বলতে পারে—গ্রামের বিকেল মানেই ছিল মাঠভরা ছোটাছুটি, বন্ধুদের হাসি আর প্রাণভরে খেলার আনন্দ। সেই স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।