হারিয়ে যাওয়া গ্রামের গল্প
গ্রামের উৎসবের বদলে যাওয়া দিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০২ আগষ্ট, ২০২৬
একটা সময় গ্রামের কোনো উৎসব মানেই ছিল সবার উৎসব, শুধু একটি পরিবারের নয়।
কোনো বাড়িতে বিয়ে, ঈদ, পূজা কিংবা গ্রামের মেলা—যে উপলক্ষই হোক না কেন, আনন্দের অংশীদার হয়ে উঠত পুরো গ্রাম। কে আত্মীয়, কে প্রতিবেশী—এই হিসাব কেউ করত না। উৎসবের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, সবাই একসঙ্গে থাকা।
বিয়েবাড়ির প্রস্তুতি শুরু হতো কয়েক দিন আগে থেকেই। কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ প্যান্ডেল বাঁধছেন, কেউ চাল-ডাল গুছিয়ে রাখছেন, কেউ রান্নার আয়োজন করছেন। কাউকে আলাদা করে ডাকার প্রয়োজন হতো না। সবাই নিজের দায়িত্ব মনে করেই কাজে হাত লাগাতেন। মনে হতো, বিয়েটি একটি পরিবারের নয়, পুরো গ্রামের।
ঈদের সকালেও ছিল অন্য রকম আবহ। নামাজ শেষে মাঠেই শুরু হতো কোলাকুলি। তারপর বাড়ি বাড়ি যাওয়া, সেমাই, পায়েস আর নানা রকম খাবার ভাগ করে খাওয়া। নতুন পোশাক পরে শিশুরা সারা দিন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরে বেড়াত। সেদিন গ্রামের কেউ যেন একা থাকত না।
পূজার সময়ও একই রকম মিলনের ছবি দেখা যেত। ধর্ম আলাদা হলেও উৎসবের আনন্দ ছিল সবার। মুসলিম পরিবার পূজামণ্ডপে যেত, আবার হিন্দু প্রতিবেশীরা ঈদের দিনে শুভেচ্ছা জানাতে আসতেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর আন্তরিকতাই ছিল সেই সম্পর্কের ভিত্তি।
গ্রামের মেলা ছিল উৎসবের আরেকটি রূপ। নাগরদোলা, বাঁশি, কাঠের খেলনা, মাটির হাঁড়ি, মুড়কি, জিলাপি—সব মিলিয়ে মেলার দিনটি যেন গ্রামের জীবনে নতুন রঙ এনে দিত। মানুষ শুধু কেনাকাটার জন্য নয়, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা করার জন্য, গল্প করার জন্য, কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানোর জন্যও মেলায় যেত।
আজও উৎসব হয়, আনন্দও হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিধি ছোট হয়ে এসেছে। ব্যস্ত জীবন, ভৌগোলিক দূরত্ব আর বদলে যাওয়া সামাজিক বাস্তবতায় অনেক আয়োজন এখন পরিবারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। যে উঠোন একসময় মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত, সেখানে আজ অনেক সময় নীরবতা নেমে আসে।
পরিবর্তন এসেছে উৎসব উদ্যাপনের ধরনেও। এখন স্মৃতি ধরে রাখার অনেক নতুন উপায় আছে, যা স্বাভাবিকও। কিন্তু কখনো কখনো মুহূর্তটিকে অনুভব করার চেয়ে তাকে ধারণ করার ব্যস্ততাই বেশি হয়ে যায়। অথচ উৎসবের আসল সৌন্দর্য ছিল মুখোমুখি বসে হাসি ভাগ করে নেওয়া, গল্পে মেতে ওঠা, একে অন্যের পাশে থাকার অনুভূতিতে।
তবু এই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। দেশের অনেক গ্রামে এখনো ঈদ, পূজা, নবান্ন কিংবা মেলাকে ঘিরে মানুষ একত্রিত হয়। তরুণেরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেন, কেউ মাঠ পরিষ্কার করেন, কেউ আবার হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ খেলাধুলার প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এসব উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, গ্রামের মিলনমেলার সংস্কৃতি এখনো বেঁচে আছে।
এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে খুব বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই; দরকার আন্তরিকতা।
ঈদের দিনে পাশের বাড়ির একা থাকা প্রবীণ মানুষটির খোঁজ নেওয়া, বিয়েবাড়ির কাজে প্রতিবেশীদের আবার যুক্ত করা, মেলায় গিয়ে পরিচিত দোকানির সঙ্গে কয়েক মিনিট গল্প করা—এমন ছোট ছোট কাজই সম্পর্ককে নতুন করে জীবন্ত করে তুলতে পারে। উৎসব তখন শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষে মানুষে সংযোগের উপলক্ষ।
হয়তো আগের দিনের সেই উৎসব হুবহু আর ফিরবে না। সময় বদলায়, মানুষের জীবনও বদলায়। কিন্তু যদি আমরা উৎসবের আনন্দকে আবার ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে সেই পুরোনো আবহের অনেকটাই ফিরে আসবে।
শেষ পর্যন্ত উৎসবের প্রকৃত অর্থ নতুন পোশাক, বড় আয়োজন কিংবা আলোকসজ্জায় নয়। উৎসবের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে মানুষের হাত ধরার মধ্যে, একসঙ্গে বসে হাসার মধ্যে, একে অন্যের জীবনের অংশ হয়ে থাকার মধ্যে। যত দিন সেই অনুভূতি বেঁচে থাকবে, তত দিন গ্রামের উৎসবও বেঁচে থাকবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।