দাঁড়িয়ে আছি শান্তিধারা রাস্তার মুখে—এমনভাবে, যেন এই নির্জন পথটাই আমার। অপেক্ষার গভীরে ঢুকে পড়ার জন্য তালা খুলে বসে আছে। চারপাশ নিস্তব্ধ, বাতাসে কেবল ধুলো আর অনিশ্চয়তার গন্ধ। প্রতীক্ষার এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিটি মুহূর্ত যেন একটু একটু করে আমার ধৈর্যের দেয়াল ঘষে ক্ষয় করে দিচ্ছে। যাত্রীর আশায় বুক বেঁধে আছি, অথচ চোখের সামনে দিয়ে সময় কেবল হেঁটে চলে
মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটায় এসে সময়ই বুঝি দাঁড়িয়ে গেছে। অবশেষে যখন নিজের সাথেই সিদ্ধান্ত নিলাম—আর না, এবার চলে যেতে হবে—ঠিক সেই ক্ষণেই চোখে পড়ল দূর থেকে এগিয়ে আসা এক আকর্ষণীয় তরুণী। তার চলনে এক ধরনের দৃঢ়তা, আর হাতের ইশারায় যেন আমার সিদ্ধান্তকে থামিয়ে দিতে চাইছে। তার পাশেই দেখা গেল একজন মধ্যবয়স্ক আংকেলকে। প্রথম দেখায় মনে হলো, নিশ্চয়ই দু’জন একসাথেই আসছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটি এসে আমার রিকশায় এলিয়ে বসল। কিন্তু বিস্ময় তখনই শুরু হলো, যখন দেখলাম সেই আংকেল বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে
সম্পূর্ণ অন্যদিকে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। মেয়েটি প্রথমে ধীর স্বরে বললো, “আঙ্কেল, চলেন!” একটু থেমে আবার বললো, “আঙ্কেল, চলেন!”
কিন্তু লোকটা যেন কিছুই শুনছেন না—নিজের পথেই অটল। তখন মেয়েটি হঠাৎ রেগে গিয়ে জোর গলায় বললো, “আংকেল, চলেন!”
ঠিক সেই মুহূর্তে যেন মাথার ভেতর বিদ্যুৎ খেলল। উপলব্ধি করলাম—এই ‘আংকেল’ ডাকার সম্মানময় অসম্মানটা আসলে আমার জন্যই বরাদ্দ। আমি যাকে এতক্ষণ তার অভিভাবক বা
সঙ্গী ভেবে ভুল করছিলাম, তিনি আদৌ তার কেউ নন। বুঝে উঠতেই মাথায় হাত পড়ল। যৌবন ঠিকমতো শুরু হওয়ার আগেই এক রক্তমাংসের তরুণী আমাকে ‘আংকেল’ বলে ডাকছে—এমন বাস্তবতার ধাক্কা সামলানো সহজ নয়।
ভ্রু কুঁচকে, মুখে এক চিলতে অভিমান মেখে নীরবেই রিকশা চালাতে শুরু করলাম। ট্র্যাংকরোডে পৌঁছে মেয়েটি নেমে পড়ল। ভাড়া মেটাতে গিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দশ টাকা কম এগিয়ে দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো।
আমি তাকে থামিয়ে শান্ত গলায় বললাম, “চাচি, আর দশ টাকা…”
‘চাচি’ শব্দটা তার কানে যেতেই সে থমকে দাঁড়াল। চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে ব্যাগ থেকে দশ টাকার একটি নোট বের করে আমার হাতে দিল। তার দৃষ্টিতে তখন বিস্ময়, অস্বস্তি আর সামান্য রাগের মিশ্রণ।
আমি নোটটা হাতে নিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বললাম, “হিসাব বরাবর।”
মেয়েটি একবার আমার দিকে তাকিয়ে এমন ভঙ্গিতে চলে গেল, যেন আজকের দিনে বয়সের হিসাব-নিকাশ তার সিলেবাসের বাইরে। আর আমি? রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রেখে মনে মনে হাসলাম। ভাবলাম, এই শহরে রিকশা যত দ্রুত চলে, মানুষের সম্মোধন তার চেয়েও দ্রুত বদলে যায়। সকালে যে যুবক, দুপুরে সে আংকেল, আর বিকেলে সরাসরি চাচি-সংলগ্ন কেস! প্যাডেলে পা চাপালাম নতুন উদ্যমে। কারণ বুঝে গেছি—ভাড়া কম-বেশি হলে কথা বলবো, কিন্তু বয়স নিয়ে দরকষাকষি করার কোনো উপায় নেই! হা, হা, হা,
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।