রিকশা পুঞ্জি—৯
মধ্যদুপুর। কাঠফাটা রোদ্দুরে নিস্তেজ খণ্ড খণ্ড ছায়াহীন শহর। আর আমি রিকশা হাতে শুক্রর বুকে বিদ্যমান। ঝরা ঘামের পীড়নে। কেবল কয়েক সত্তা যাত্রী পাওয়া না পাওয়ার অপেক্ষায়। আমি অবশ্য পেশাদার রিকশাচালক নই। শহরের এক মাদ্রাসার ক্ষুদ্র এক তালিবুল ইলম। সপ্তাহের পাঁচটি দিন কিতাবের পাতা উল্টাই, উস্তাদের দরসে বসি, ইলমের পেছনে ছুটি। আর বৃহস্পতি ও শুক্রবার এলে জীবনের প্রয়োজন আমাকে টেনে আনে রাজপথে। হাতে তুলে নিই ভাড়ার রিকশার হ্যান্ডেল। দিনশেষে যা পাই, তা দিয়েই চলে নিজের টুকিটাকি খরচ, কিতাব কেনা আর মাদ্রাসার জীবন।
আজও বের হয়েছি সেই প্রয়োজনেই। অথচ সকাল থেকে রোদ যেন আকাশের সমস্ত আগুন পৃথিবীর উপর ঢেলে দিয়েছে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও তেমন কোনো ভাড়া হয়নি। ক্ষুধা, ক্লান্তি আর হতাশা মিলেমিশে এক অদ্ভুত অবসাদ সৃষ্টি করেছে মনে।
হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে। হয়তো কাপল। কিছুটা স্মার্ট। কিছুটা আধুনিক। বেপর্দার নির্লজ্জতা যাদের সমস্ত অবয়বে। হয়তো বাবা-মায়ের চোখ লুকিয়ে বের হয়েছে। টাইম পাস ও সময় কর্তনে, একটুখানি চিল আর টুকরো টুকরো গুনাহ অর্জনে।
— না মানে! কিছু সময় ঘুরতে চাই।
— এই ধরুন, এক দেড় ঘণ্টা।
— ভাড়া কতো দেওয়া লাগবে?
কোন উচ্চ বাক্য না করে ওরা রিকশায় চেপে বসলো। হয়তো ভাবছে— টাকা যাই হোক, রিকশা চালক বয়সে কম। আমাদের পিরিতে প্রতিবন্ধক হবে না।
আমি বুঝতে পারছিলাম, ওরা আধুনিককালের সেই বহুল প্রচলিত শব্দ— ক্রাশ, অতঃপর রিলেশনশিপ। তারপর হারাম ভালোবাসার হাজারো নাটকীয় অধ্যায়। যার নাপাক কলুষ আজ বিশ্বব্যাপী এক স্বাভাবিক সংস্কৃতির নাম। তবুও আমি নিষেধ করলাম না। কারণ আমার ভাড়া দরকার। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও যাত্রী না পাওয়ায় একরাশ হতাশায় জর্জরিত। তবুও নিয়ে নিলাম। মনে মনে ভাবলাম, সুযোগ হলে নিজের পরিচয়টা তুলে ধরে ওদের কিছু বলবো। বদলানো যাবে না জানি, তবুও আমার দুই একটি কথায় যদি সামান্য টুকু অনুভূতির সৃষ্টি হয়!
তারা উঠে বসলো। আমি নিয়ে চললাম। অনির্দিষ্ট কিছু পথ। অমাপিক কিছু স্থান। অথচ উত্তপ্ত এই রোদ মন্থন। উভয়ের মাঝে রিকশার প্রথম প্রহরে পিনপতন নীরবতা। আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম হারাম প্রেমের অদ্ভুত এ হাস্যকর অনুভূতি। এবং অপেক্ষা করতে লাগলাম— কখন প্রথম সংলাপের সূচনা হয়।
অবশেষে মেয়েটাই নীরবতা ভাঙলো।
— এই! আজকের ওয়েদারটা সুন্দর না?
প্রচণ্ড রোদের ভেতর কথাটা শুনে আমার হাসি পেলো। যে রোদে আমার শরীরের ঘাম জামা ভিজিয়ে ফেলেছে, যে রোদে মাথা ঝিমঝিম করছে, সেই রোদও কারো কাছে সুন্দর হতে পারে! তবে প্রেমে পড়া মানুষের কাছে বাস্তবতা নয়, অনুভূতিই সত্য।
মনে হলো সে আবহাওয়ার কথা বলছে না। পাশের মানুষটার কথা বলছে।
এরপর ধীরে ধীরে অনর্থক শত গল্পে বিভোর সময়। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কখনো বন্ধুর বিয়ে, কখনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কখনো অকারণ হাসি। যেন পৃথিবীর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রেখে আজ তারা একে অপরকে নিয়েই ব্যস্ত।
আমি এইসব পাগলের ঠুনকো প্রলাপ শুনে মনে মনে বেজায় হাসলাম। আর বুঝতে পারলাম— এই পাগলামো এবং সিট খারাপের নাম প্রেম সংলাপ।
মনে পড়ে গেল মাদ্রাসার এক উস্তাদের কথা। তিনি বলেছিলেন— “শয়তান কখনো মানুষকে সরাসরি বড় গুনাহে নেয় না। প্রথমে সে অনুভূতির দরজা দিয়ে প্রবেশ করে।”
কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভার অনুভব করলাম।
গরমের তাপ ও রিকশার চাপ আমাকে যতটা যন্ত্রণায় ভোগাচ্ছিল, তার চাইতে কয়েকগুণ দীর্ঘ আক্ষেপ নিদারুণ এক অদৃশ্য আঘাতে জর্জরিত করে তুলছিল। কারণ আমি শুধু একটি ছেলে ও একটি মেয়েকে দেখছিলাম না। আমি দেখছিলাম একটি প্রজন্মকে। এমন এক প্রজন্ম, যারা ভালোবাসার সংজ্ঞা জানার আগেই প্রেমে পড়ে যায়। দায়িত্ব বুঝার আগেই সম্পর্ক গড়ে। সংসারের অর্থ না বুঝেই আজীবন একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়।
রিকশা চলছিল। রাস্তার দুপাশে দোকান, মানুষের ভিড়, যানবাহনের শব্দ। অথচ ওরা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে বসবাস করছে। পৃথিবীর আর কোনো কিছুর প্রতি তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
— জানো, তোমাকে ছাড়া আমার দিনই কাটে না।
আমি মনে মনে বললাম— সুবহানাল্লাহ! কত দ্রুত মানুষ নিজের রবকে ভুলে বান্দার উপর নির্ভর করতে শিখে যায়।
কিছুক্ষণ পর ওরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা শুরু করলো। কিভাবে বিয়ে করবে, কোথায় থাকবে, কেমন সংসার হবে। কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল, ভবিষ্যৎ যেন তাদের হাতের মুঠোয় বন্দী। অথচ মানুষ আগামী এক ঘণ্টারও মালিক নয়।
মনে পড়ে গেল কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা অসংখ্য নামহীন কবর। তারাও একদিন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছিল। তারাও পরিকল্পনা করেছিল। অথচ আজ তারা মাটির নিচে নিঃশব্দ।
ধিক্কার হে ইউরোপিয়ান সভ্যতা। ধিক্কার হে ধূসর, নর্দমাময় এ পরিবেশের আবির্ভাবক। যে সভ্যতা মানুষকে স্বাধীনতার নামে প্রবৃত্তির গোলামে পরিণত করেছে। যে সভ্যতা লজ্জাকে পশ্চাৎপদতা আর বেহায়াপনায় আধুনিকতার তকমা দিয়েছে।
আজ তো আজ! ভাবছি— আসন্ন ও অনাগত ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে এই জেনারেশন? আরও কত দূর যাবে? আরও কত সীমা অতিক্রম করবে?
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ওরা নামলো। ভাড়া মিটিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার সময় একবারও পিছনে তাকালো না। আমি অবশ্য তাকালামও না। কারণ আমি জানতাম, এই শহরে এমন দৃশ্য নতুন কিছু নয়। আজ এরা, কাল অন্য কেউ।
আমি আবার রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রাখলাম। সূর্য তখনো মাথার উপর। শহর তখনো ব্যস্ত। মানুষের গন্তব্য তখনো শেষ হয়নি।
আর আমি ভাবছিলাম— এই উম্মাহর সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের নয়, ঈমানের। সবচেয়ে বড় সংকট খাদ্যের নয়, হিদায়াতের। যে দিন মানুষ আবার নিজের রবকে চিনবে, নিজের পরিচয়কে চিনবে, সেদিন হয়তো এই পথগুলোতে হারাম প্রেমের গল্প কমে যাবে, আর বাড়বে লজ্জা, পবিত্রতা ও দায়িত্ববোধের গল্প।
এইসব ভাবতে ভাবতেই আবার প্যাডেলে চাপ দিলাম। সামনে হয়তো আরেকজন যাত্রী অপেক্ষা করছে। আর আমার জন্য অপেক্ষা করছে আরেকটি শিক্ষা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।