বিষাদের চিরকুট, একটি গ্যারেজ
—রফিক আতা—
রিকশা পঞ্জি —০৩
প্রবেশপথে এক টুকরো বস্তা পড়ে আছে—হয়তো এটাই পাপোষ। তার ওপর দিয়ে পা ফেলেই ঢুকলাম অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে। ফ্লোরে বিছানো দুটি ছেঁড়া রেক্সিন। দক্ষিণ দেয়ালে একটি বাতায়ন, তার পাশে আড়াআড়ি ঝোলানো রশি। সেখানে শুকোচ্ছে রঙচটা শার্ট, লুঙ্গি আর পুরোনো গামছা। বাতাসে নর্দমার কটু গন্ধ, তার সঙ্গে মশাদের অবিরাম গুনগুনানি।
এটাই হলো গ্যারেজে থাকা রিকশাচালকদের বাসস্থান। বৃহস্পতিবারে সাধারণত মধ্যরাত পর্যন্ত রিকশা চালাই। তারপর মাদ্রাসায় ফিরে যাই। গতরাতে আমি মাদ্রাসায় ফিরিনি; এখানে রাত কাটিয়েছি। তাই খুব কাছ থেকে দেখেছি তাদের জীবনের নির্মম প্রতিচ্ছবি। ছোট্ট এই কামরায় অন্তত পনেরো-ষোলোজন মানুষ গাদাগাদি করে শোয়। প্রত্যেকের শয্যা বলতে একটি কাঁথা, একটি বালিশ। কিন্তু সে বালিশও নরম নয়—ইটের ওপরে সামান্য ফোম ট্যাক্স বসানো। মাথা রাখলে মনে হয় যেন ব্যথার ওপর ব্যথা চেপে বসেছে।
রাতের গভীরে আমি শুয়ে শুয়ে তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছিলাম। কে কেমন ঘুমাচ্ছে, কে কী স্বপ্নে গা ডুবিয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছিল না। তবে তাদের মুখগুলোতে এক ধরনের ক্লান্তি লেগে ছিল, যেন দীর্ঘ পথের ক্লান্ত পথিকরা মুহূর্তের জন্য আশ্রয় নিয়েছে। আমি তাদের পাশে শুয়ে থেকেও বারবার প্রশ্ন করেছি নিজেকে—আমার জীবন আর তাদের জীবনের ফারাক কোথায়? আমি বইয়ের আলোয় স্বপ্ন খুঁজি, আর তারা দিনের পর দিন রিকশার প্যাডেলে নিজেদের জীবন ঘষে ক্ষয় করে।
কিছু কিছু জীবন এভাবেই এগোয়—নিদারুণ কষ্টের বেড়াজালে বন্দি থেকেও চলতে থাকে। মাঝেমধ্যে ক্ষণিকের সুখ তাদের ছুঁয়ে গেলেও অসুখ আর অভাবই হয়ে ওঠে চিরসঙ্গী। তবু এক চিলতে হাসি—সন্তানের মুখে, স্ত্রীর মুখে—তাদের বাঁচিয়ে রাখে। সেই হাসিই হয় তাদের একমাত্র প্রেরণা।
রাত শেষে যখন ভোরের আলো ফোটে, তখন মনে হয়—বিষাদের এই গ্যারেজও যেন নতুন দিনের স্বপ্ন বুনে নেয়। কিন্তু সেই স্বপ্নের রঙ বড়ই ফিকে।
২৭/৬/২০২৫ ইং
শুক্রবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।