অভুক্তির আপেল
এ শহর কেন এত নিষ্ঠুর?
—রফিক আতা—
রিকশা পঞ্জি —১
বৃহস্পতি এলে মনটা ভীষনভাবে ধড়ফড়িয়ে উঠে। যেন অদৃশ্য কারো তাড়া—এক ভিন্নরকম দায়িত্ববোধ, এক অনিবার্য বোঝা। রিকশা, প্যাডেল, শহর ও ধুলো—এসব যেন বেদনার এক নিরন্তর চিরকুট হাতে তুলে দেয়। আজ প্রয়োজনটা অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি, তাই মধ্যাহ্নেই ছুটতে হলো শহরের পথে।
চিরচেনা গলিপথের বাঁকে গ্রীষ্মের দাবদাহ যেন ছুটির দুপুরটাকে ভস্ম করে দিচ্ছে। তীব্র রোদ্দুরে শহরটা যেন এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। ভাঁপে ভাস্বর ধুলোমলিন পথের বুকে শহর যেন রঙিন হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।
আমি বসে আছি ট্রাংক রোডের দোয়েল চত্তরে, রিকশার ব্রেকে হাত, প্যাডেলে পা—দু-একটা যাত্রীর অপেক্ষায়। অথচ শহরটা দিব্যি নিজের মতো ব্যস্ত।
হঠাৎ চোখে পড়লো আট-দশ বছরের এক পুচকে ছেলে। উন্মত্ত ঘূর্ণির মতো দৌড়াচ্ছে। তার সমগ্র অস্তিত্ব থেকে ঠিকরে পড়ছে ভয়, শংকা আর একরত্বি বিষণ্নতা। পেছনে তাড়া করছে ত্রিশ বছরের এক তাগড়া যুবক—চেহারায় ব্যবসায়ীর ঔদ্ধত্য।
আমি অবাক। যাত্রী পাইনি বলে মন ভেঙে ছিলো, কিন্তু এই দৃশ্য আমাকে যেন এক অদৃশ্য স্রোতের টানে টেনে নিলো। ভাবছি—সে কেন ছেলেটাকে ষাঁড়ের মতো তাড়া করছে?এক খন্ড কৌতূহল আর একরাশ বিস্ময়ে আমি রিকশাসহ তাদের পিছু নিলাম।
ছেলেটি বেশিদূর যেতে পারেনি। শৃগালের মতো এক থাবায় লোকটা তাকে ধরে ফেললো। তখনই লক্ষ্য করলাম—ছেলেটির হাতে একটি আপেল। প্রথমেই লোকটা সেটি কেড়ে নিলো। অতঃপর দুটো বজ্রাঘাতের মতো থাপ্পড় বসালো শিশুটির মুখে। কোমল, স্নিগ্ধ, বিষণ্ন মুখটি মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেলো। বিরক্তির ছাপ রেখে হনহন করে চলে গেলো লোকটা।
এই নিষ্ঠুর শহর তবু সচল—কোন প্রতিক্রিয়া নেই, কোন অভিযোগ নেই। গাড়ির হর্ন, ভ্যাপসা রোদ্দুর, মানুষের দৌড়ঝাঁপ আগের মতোই চলছে। অথচ এক ক্ষুদ্র প্রাণের ভেতরে যেন মুহূর্তেই সময় থমকে গেলো। শ্রাবণের ঘন মেঘে যেমন আচমকা বাঁধভাঙা বৃষ্টি নামে, তেমনই কান্নার বৃষ্টি নেমে এলো এক অবুঝ কলি সত্তায়।
আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেলাম না। আমি তো কেবল এক সাধারণ রিকশাওয়ালা। অথচ আমার মনে হলো, আমার রিকশাটিও বুঝি কেঁদে উঠলো, চাকার গায়ে জমে উঠলো দুঃখের ভার।
ধীরে ধীরে ছেলেটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখনো সে অঝোরে কাঁদছে। হয়তো ও জানে—ভেতরের দুঃখটুকু ধুয়ে মুছে ফেলতে কান্নাই একমাত্র ভরসা। আমি হাত রাখলাম ওর মাথায়। হঠাৎ থেমে তাকালো আমার দিকে। চোখদুটি ভেজা, অথচ কেমন অব্যক্ত নিরাশায় ভরা।
আমি বললাম—
—তোর নাম কী?
হেচকি-তোলা কণ্ঠে সে বললো—
—শায়ন।
নাম বলেই আবারো কেঁদে উঠলো। সেই মুহূর্তে আমার বুকটা আনচান করে উঠলো। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম—
—চিন্তা করিস না। আকাশের ওপারে কেউ একজন সব দেখছেন। উনিই বিচার করবেন।
কিছুক্ষণ থেমে আবার জিজ্ঞেস করলাম—
—আচ্ছা, তুই আপেল চুরি করতে গেলি কেন?
মায়াভরা কান্নার ঢেউ জড়ানো অস্ফুট স্বরে শায়ন যা বললো, তা শুনে মনে হলো শহর থমকে গেছে, থমকে গেছে গ্যালাক্সির বুকে ঘূর্ণমান পৃথিবীও—
"বাইজান, আমার একটা ছোড বইন আছে। তিনদিন ধইরা জ্বর। কিছুই খাইবার চাইতাছে না। আইজ সকালে আমারে কইছে—তার নাকি আপেল খাইবার মন চাইতাছে। সকাল থেইকা বতল টুকাইয়া বিশ টেহা পাইছি। কিন্তু আপেলের যা দাম। বিশ টেহায় কি আপেল কিনা যায়? তাই বইনের সখ পূরণের লাইগা চুরি ছাড়া আমার আর কোন উপায় আছিল না।"
আমার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলো। প্রতিটা শব্দ বুকের ভেতর তীর হয়ে বিধলো। হায়! এই শহরেরই তো দায়িত্ব ছিলো তাদের খোঁজ নেওয়া, দারিদ্র্য ঘুচানোর চেষ্টা করা, শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া। অথচ শহর শায়নের মতো শিশুকে ঠেলে দিয়েছে চুরির দায়ে—চড় থাপ্পড়! কেবল একটি আপেলের জন্য।
সেই মুহূর্তে মনে হলো—শহরের সব রঙ, সব আলো, সব শব্দ ভেঙে পড়লো এক শিশুর অশ্রুর কাছে।
আমি শায়নের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। ওর চোখের কোণে তখনও ঝরে পড়ছিলো কান্নার ফোঁটা, যেন ছোট নদীর অবিরাম স্রোত। সেই মুহূর্তে মনে হলো—আমি যদি কিছু না করি, তাহলে এই শহরের মতো আমিও পাষাণ হয়ে যাবো।
ধীরে ধীরে হাত ঢুকালাম আমার ছেঁড়া পকেটে। একমাত্র ভাঁজ করা পঞ্চাশ টাকার নোটটি বেরিয়ে এলো। এর সাথে আরো কিছু টাকা যোগ হলে বই কিনার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু তখন মনে হলো—শিশুর চোখের কান্না সমস্ত হিসাব-নিকাশকে পুড়িয়ে দেয়, সমস্ত প্রয়োজনকে তুচ্ছ করে দেয়।
নোটটা শায়নের হাতে গুঁজে দিলাম। বললাম—
—যা ভাই, আপেল কিনে যা। তোর বইনের সখটা একবার পূরণ কর।
শায়নের চোখদুটি হঠাৎ জ্বলে উঠলো এক অদ্ভুত দীপ্তিতে। কান্না থেমে গেলো। বুকের ভেতরকার শিশুসুলভ আনন্দ হঠাৎ মুখে ছড়িয়ে পড়লো। মনে হলো, এ শহর যত অমানবিক হোক না কেন, অন্তত এই ক্ষণে শায়নের ভেতর থেকে একটি ছোট সূর্যোদয় দেখা গেলো।
ও দৌড়ে গিয়ে পাশের ফলওয়ালার কাছ থেকে দুটো লাল টকটকে আপেল কিনলো। হাতে আপেল নিয়ে শায়ন আমার কাছে ফিরে এসে বললো—
—বাইজান, আল্লাহ আপনেরে ভালো করুক।
এই কয়েকটি শব্দ যেন অমূল্য আশীর্বাদ হয়ে এল আমার কানে। আমি তাকিয়ে রইলাম তার আনন্দিত চেহারার দিকে। মনে হলো, সেই আপেলের লাল রঙ আজ আকাশের সূর্যকেও হার মানিয়েছে।
কিন্তু তারপরই বুকের ভেতর আবার কেমন শূন্য হয়ে গেলো। শহরের নিষ্ঠুরতা, মানুষের উদাসীনতা, অন্যায়ের অন্ধকার যেন আমার গায়ের চামড়া ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। ভাবলাম—এ শহর হাজারো শায়নের চোখে অশ্রু নামায়, অথচ কেউ দেখে না। কেউ দেখে না, আবার কেউ দেখলেও চুপ করে থাকে।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিকশার হ্যান্ডেলটা আকড়ে ধরলাম। আবারো প্যাডেলে পা রাখলাম। রোদ্দুর তখনও মাথার ওপর ঝাঁঝালো আগুন ছড়াচ্ছে। শহর তখনও আগের মতোই চলমান, বেপরোয়া। কিন্তু আমার বুকের ভেতর জমে উঠলো তিক্ত এক অভিজ্ঞতা, ভারী এক ক্ষত।
চাকা ঘুরতে লাগলো, কিন্তু মনে হচ্ছিলো—প্রতিটি ঘূর্ণন যেন শহরের হৃদয়হীনতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। আমার রিকশা এগোচ্ছিলো, অথচ আমার হৃদয় থেকে বারবার ভেসে আসছিলো শায়নের কান্নাভেজা মুখ আর সেই লাল টকটকে দুটো আপেলের ছবি।
সেদিন শহরের ভিড়ের ভেতর আমি একা হয়ে গেলাম। রিকশার প্যাডেলে আমার প্রতিটি চাপ যেন অদৃশ্য এক প্রতিজ্ঞার শপথ—
এই শহর যতই নিষ্ঠুর হোক, আমি অন্তত মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবো।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।