. আমার অসুখলিপি
. আলো-আঁধারের আত্মকথন
. 🖊️—রফিক আতা—
বিনিদ্র, বিশীর্ণ চোখে অনভ্যস্ত ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। কৃত্রিম হাসি আর এলোমেলো, ভঙুর বেঁচে থাকার একরত্মি স্বপ্ন গড়াগড়ি খায় যার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। এখানে স্বপ্নেরা জন্ম নেয় এক বিঘত আশা নিয়ে; কিন্তু বয়স না বাড়তেই থেমে যায় তাদের হাঁটা—যেন জন্ম নিয়েই মরতে শেখে।
এদিকে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার যন্ত্রণা বাড়ার আগেই উথলে উঠেছে একশ গজ জ্বরের উত্তপ্ত যন্ত্রণা। সাথে যোগ দিয়েছে ডায়রিয়া, আমাশয়, আর গুটিকয় শারীরিক বিপর্যয় – নামহীন, অথচ নির্মম। পরীক্ষার ঘরে ছিল উত্তেজনার উষ্ণতা, অথচ আমি ছিলাম বাইরে—নিঃসঙ্গ এক নিরুত্তাপ দুপুরে।
হতভাগা রফিক ইয়া বড় ইনজেকশনের অসহ্য ভারে ন্যুব্জ। যদিও ওসব স্রোত ক্যানুলার ফাঁকে বয়ে চলে সমস্ত প্রতিক্রিয়াহীন শরীরে। আমি অনিমিখে তাকিয়ে আছি ছত্রভঙ্গ ধূসর আলো ছড়ানো এক ল্যাম্পপোস্টের দিকে যার মিইয়ে পড়া আলোতে আবছা আবছা ভেসে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন এক ভবনের ছায়া । বড় অক্ষরে লেখা "মর্গ"।
চমকে ওঠার আগেই ধূয়াশার রেশ কেটে যায়। মনে পড়লো—আমি হাসপাতালে ভর্তি। আর এখানে মর্গ, লাশ, চিৎকার, হাহাকার—সবই একান্নবর্তী পরিবারের মতো।
হঠাৎ ভেসে আসে একটি অ্যাম্বুলেন্সের বিষাদ সাইরেন। রাত তখন তিনটা। আমি এখনও জ্বরের আঘাতে আঘাতে পর্যুদস্ত। একটি লা-ওয়ারিশ কুকুর ওয়ার্ডের বাইরে অবিরাম হাঁপাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানো হলো একটি রক্তাক্ত লাশ। তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মর্গের দিকে। লালপুলের ওদিকে ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত হয়েছে একটি হাইসের ড্রাইভার। হয়তো লাশের পরিবার এখনো জানতে পারেনি—তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা, তাদের না বলে ওপারের পথ ধরেছে। —জানি না কুকুরটি হাঁপাচ্ছে কেন!
এখানকার প্রতিটি পুরোনো ভবন যেন হাজার বছরের ইতিহাস গচ্ছিত জাদুঘর। যে জাদুঘরে পর্যটক আসে আরও কিছু ইতিহাস রচনা ও সংযুক্ত করতে। এখানকার জানালাগুলো যেন এক একটি নীরব চাহনি ও বিষণ্নতার দর্পণ, যে জানালায় তাকালেই জলে উঠে শত কষ্টের বিষাদ চিরকুট। এখানকার আলো, বাতাস, পাংশু আঁধার—সবকিছুই যেন এক একটি অনলিখিত গল্প; যে গল্পের শুরু আছে, নেই কেবল শেষ।
এমনিতেই আমার ভাবনাগুলো খুব এলোমেলো, খুব অগোছালো। প্রকট জ্বরের উষ্ণ অভ্যর্থনায় যেন তা আরও এলোমেলো, আরও অগোছালো হয়ে পড়েছে। পাশের বেডে একজন রোগী কাতরাচ্ছে একাকীত্বের বিষাদে। মনে হলো, আহ! মানুষ কতো অসহায়!—এই ভাবনা যখন অন্যমনস্ক করছিল, তখনই আবু হুরায়রা এসে রোগীটির মাথার পাশে দাঁড়ালো; যেন একটি হাদীস আপন চোখে জীবন্ত হয়ে উঠলো।
আবু হুরায়রা আমাদের ক্লাসে বেস্ট স্টুডেন্ট। তবুও বিন্দুমাত্র অহংবোধ নেই। সাদামাটা, সহজ-সরল। কিন্তু তুখোড়, চতুর। সারারাত নির্ঘুম আমার মাথায় জলপট্টি বেঁধে এখন প্রভাতে মাদ্রাসার পথে... কারণ তাকে তো পরীক্ষাটা দিতে হবে।
হাসান, আহমাদ মাইমুন—ওরা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। সরকারি হাসপাতালে পা রাখাও যাদের জীবনে নতুন অভিজ্ঞতা। এই দেখ! ইসলাম ও মাদ্রাসার খাতিরে আজ তারা এক নির্মম পরিহাস ও পরিবেশে।আরে হ্যা! আনাস মাহমুদ মাযহার এদের কথা বলতে তো একদমই ভুলে গেছি। যাদের খেদমতেরও কোন জুড়ি ছিলনা।
আমি সেই রাতের নিস্তব্ধ আঁধারের কথাও ভুলবোনা যে নিশুতিরাতে শাহেদ ভাই এসেছিলো মাদ্রাসা থেকে। অনেকটা গোপনে। অনেকটা আপনে। অতঃপর সারারাত আমার শিয়রে দাড়িয়ে থাকা। নির্ঘুম রজনীতে খেদমতের সৌজন্য এবং প্রভাত উন্মোচনের পূর্বেই মাদ্রাসার পথে কদম রাখা...
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه، أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ:
"حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ..."
"...وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ، وَإِذَا مَاتَ فَاتْبَعْهُ".
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১৬২)
অনুবাদ:
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে..."
"...যখন সে অসুস্থ হয়, তখন তাকে দেখতে যাও; আর যখন মারা যায়, তখন জানাযায় শরিক হও।"
আমি নির্দ্বিধায় বলি—এই হাদীসের জীবন্ত ব্যাখ্যা যদি কোথাও দেখিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা আমার অসুস্থতার দিনগুলোতে জামেয়া রশীদিয়া ফেনী করে দেখিয়েছে। জামেয়াকে ভালোলাগার এবং সব থেকে বিচিত্র ও ভিন্ন মনে হওয়ার এটাও একটি কারণ।
মেরি মুহসিন উস্তাদ মাওলানা মুহসিন সাহেবের অকৃত্রিম ইহসানের কথা আমি কোনো দিনও ভুলব না। আসলে রশীদিয়া তাকে একটি খাঁটি স্বর্ণে পরিণত করেছে—যা আজ আমাদের মাঝে সৌন্দর্য-সুষমার অবিরাম বৃষ্টি বর্ষণ করে চলেছে। তার একটা ছেলে অসুস্থ—ছেলে নয়, ছাত্র! আচ্ছা! এতটা যত্ন করতে হবে কেন! একজন শিক্ষককে এতটা মহান হতে হবে কেন!
অসুস্থ হওয়ার পর বাড়ির পথে নয়, উস্তাদ আমাকে হাসপাতালে পাঠালেন। হয়তো এই ভেবে যে, বাবা-মা যত্ন করবেন, কিন্তু সময় মতো না; আর উনি সময়ের প্রতিটি ক্ষণে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন—যেখানে হৃদয়, দ্বীন আর দায়িত্ব একসাথে মিশেছে।
প্রতিবার হাসপাতালের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে তার উপস্থিতি আমাকে উদ্বেলিত করতো। হৃদয়ে প্রসন্নতার রং মেখে দিতো। বাড়ি ও মা বাবা থেকে সুদুরে থেকেও মনে হতো তাঁদের ছায়া আমার সঙ্গে।
অসুস্থতার দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় একটি মুহূর্তের কথা, যা আমাকে ভাবিয়েছে, শিহরিত করেছে, এবং আন্দোলিত করেছে সমগ্র শিরা-উপশিরা। যদি তা অনুল্লেখ্য থেকে যায়, তবে তা আমার জন্য হবে এক চরম বোকামি, ও না- শুকরিয়া। রাজশাহীর হুজুর মাও. জয়নুল আবেদীন সাহেব দা.বা.—জামেয়ার একজন প্রবীণ ও মুরব্বি উস্তাদ হিসেবে তিনি সেদিন যে মহানুভবতার দৃষ্টান্ত দিয়েছেন, আমি কোনো দিন তা ভুলব না।
তখনও আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়নি। বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছি। মনে হচ্ছে কেউ বেদম প্রহার করে যাচ্ছে আমায়। হুজুর কামরায় এসেছেন সাথীদের তাকরারের হালচাল দেখতে। এসে দেখেন, আমি কামরার এক কোণে শুয়ে আছি। হুজুরের সাথে আমার কোনো পূর্ব পরিচয় ছিল না। তবুও তিনি মহানুভবতার পরম দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন
—"ওর জন্য মধ্যাহ্নে খাবার গ্রহণ ঠিক হবে না। অন্যথায় পেটের অসুখ আরও বাড়তে পারে। মধ্যাহ্নে আমি ওর জন্য বাড়ি থেকে খাবার পাঠাবো।" দুপুরে দেখি সত্যিই তিনি বাসা থেকে এক আজনবি ছাত্রের জন্য জাউ রান্না করে পাঠালেন। সেদিনের সেই ধোঁয়া ওঠা উষ্ণ জাউয়ের সুবাস এখনো যেন নাকে এসে লাগছে।
এসব কথা আমি লিখতাম না। কিন্তু জামেয়ার আসাতিযাদের আমি যেমন দেখেছি! যেমন অনুভব করেছি! না লিখলে যে আমার অশান্ত হৃদয়টা প্রশান্ত হবেনা। সবচাইতে বড় কথা—
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
"مَن لم يَشْكُرِ النَّاسَ لم يَشْكُرِ اللَّهَ".
(সুনান আবু দাউদ: ৪৮১১, সহীহ)
ওদের এমন নির্ভেজাল ভালোবাসা দেখে মনে পড়ে ভূপেন হাজারিকার প্রসিদ্ধ সেই উক্তি—“মানুষ মানুষের জন্যে।” ভূপেন হাজারিকার উক্তির ছলে আমি রাসূল ﷺ এর মুখনিঃসৃত সেই বাণী একদমই ভুলে যাব না—
"إن العلماء ورثة الأنبياء"
(সুনান আবু দাউদ: হাদীস-৩৬৪১)
উলামাগণ নবীদের ওয়ারিস।
মাসআলা পরিষ্কার—নবীদের ওয়ারিস হওয়া ছাড়া অসুস্থদের পাশে অমন করে দাঁড়ানোর হিম্মত কার থাকতে পারে?
ক্যানুলার সূঁচ শিরা থেকে বের করতেই ফিনিক খেয়ে ছিটকে পড়লো কয়েক ফোঁটা রক্ত। সাদা পশম হাতে ধরে আছি চাপা যন্ত্রণায়। ইষৎ ওয়াক্ত বাদে দমবন্ধ কেবিন থেকে মুক্তি পাবো। এইমাত্র রিলিজ দিয়েছে। আচ্ছা, এটাতো সরকারি হাসপাতাল। তাহলে ডিউটিরত ডাক্তার টাকা খেল কেন?? এটাকে ঠিক “ধান্ধা” বলব না, তবে con, scam, fraud—এসব শব্দে ব্যক্ত করা যেতে পারে।
ওরা কাপড়চোপড় সব ব্যাগবন্দি করলো। ধীরপায়ে পার করলাম হাসপাতালের চৌকাঠ। এই তো, গায়ে এসে লাগছে ন্যাচারাল বাতাস— ঝিরঝিরে শহুরে হাওয়া। আবু হুরায়রা ও আহমদ মাইমুন ভাই আমাদের বিদায় দিয়ে মাদ্রাসার পথ ধরলো। গত তিনদিন ওরা অনেক কষ্ট করেছে। রাতের বেলায় হাসপাতাল, দিনের বেলায় পরীক্ষা। এটা ছিলো তাদের নিত্যদিনের নির্ম নিয়তি।
একটি বিশীর্ণ ঝরাপাতার দেহে। ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের দূষিত প্রলেপ ছেড়ে, প্রকট জ্বরের উত্তপ্ত চাদর ঈষৎ সরিয়ে, প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের উষ্ণতা স্পর্শহীন—আমি এক বিষন্ন জগৎ। ফিরছি বাড়ির পথে ...
উপসংহার...
হাসপাতালের দরজা পেরিয়ে এসে মনে হলো, এ যেন এক অন্তরীক্ষ যাত্রার অবসান। কিন্তু ভিতরে রেখে এলাম এক ঝাঁক স্মৃতি, কিছু যন্ত্রণা, আর কিছু অলঙ্ঘনীয় ঋণ—উস্তাদদের, সাথীদের, জামেয়ার।
গায়ে লেগে আছে ক্যানুলার চিহ্ন, মনে লেগে আছে জাউয়ের গন্ধ।আর অনুভবে মুহসিন কি ইহসান।শরীরের জ্বর হয়তো কেটে যাবে একদিন; কিন্তু হৃদয়ের যে কৃতজ্ঞতা—তা জ্বর না, বরং ভালোবাসার তীব্র আগুন।
"وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ اللَّهُ"
তোমরা যা কিছু ভালো করো—আল্লাহ তা জানেন। (সূরা বাকারা: ২১৫)
ত্রিশ, সাত, পঁচিশ ইং
বুধবার, রাত ১টা ৩মি.
ধারা—মুক্তগদ্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।