#তুমি অনিবার্য
Part - 1
শৈশবের বন্ধুতা কী? সে কি নিছকই দুটি মানব-মানবীর মধ্যে সময়ের সেতু? নাকি আরও গভীর কোনো দার্শনিক সত্য?
কৃষ্ণনগর শহরের একটি পুরোনো বাড়ির ছাদে ঈশান দাঁড়িয়ে আছে। বিকেল গড়িয়ে এসেছে, আকাশ এখন গাঢ় নীল আর লালের সীমারেখা। লোহা মেশানো গ্রিলের উপর তার হাত দুটি স্থির, যেন সে জগতের সমস্ত ভার ওই শীতল রডের উপর সমর্পণ করেছে। তার চোখ ছিল বহুদূর প্রসারিত, কিন্তু মনন ছিল অতি নিকটে এক বিশেষ বৃত্তে আবদ্ধ। সেই বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুতে কেবলই মেহু। ঈশানের তখন সবে কৈশোরের দোরগোড়ায়। এই সময়টায় বাইরের পৃথিবীর নানা অস্পষ্ট কথা, ফিসফাস, সংজ্ঞাহীনতা এসে আঘাত করে মনের স্বচ্ছতাকে। সে ভাবছিল তাদের সম্পর্ক নিয়ে। তাদের সম্পর্ক ছিল যেন এক বিরল অপরাহ্ণের সহাবস্থান যেখানে আলো এবং ছায়া একে অপরের পরিপূরক, অথচ কখনও তারা একাকার হয়ে যায় না। তারা ছিল একই বৃত্তের দুটি স্পর্শক, যেখানে সংযোগস্থলটি অতীব সূক্ষ্ম কিন্তু অবিচ্ছেদ্য।
ঈশান অনুভব করছিল এই অচ্ছেদ্যতা। মনে হচ্ছিল, মেহু না থাকলে তার নিজের সত্তার এক বৃহৎ অংশ যেন চিরকালের জন্য গুমোট হয়ে যেত। এই অনুভূতির কোনো সহজ নাম ছিল না।
সিঁড়িতে মৃদু পায়ের শব্দ। ঈশান জানে , এই পদধ্বনি কার। মেহু, হাতে চায়ের ভাঁড় আর একটি পুরোনো গল্পের বই নিয়ে এসেছে। সে যখনই চিন্তাক্লিষ্ট হয়, মেহু বিনা বাক্যব্যয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়।
“কী ভাবছিস এত?” মেহুর স্বর শান্ত, কিন্তু তার গভীর চোখের দৃষ্টিতে ছিল মৃদু উদ্বেগ।
ঈশান গ্রিল থেকে হাত সরিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। হাসিটা সহজ হলো না।
“ভাবছিলাম—আমাদের বন্ধুতা নিয়ে।”
তার ভিতরে একটা চাপা দ্বিধা কাজ করছিল, কারণ এই প্রথম সে তাদের সম্পর্ককে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দেখছে।
মেহু গ্রিলের উপর কনুই রেখে মাথা কাত করল।
“সে কী? বন্ধুত্বতা নিয়েও ভাবনা?”
তার গলায় ছিল এক অবাক সারল্য, যেন বন্ধুতা নিয়ে প্রশ্ন করাটা পৃথিবীর নিয়ম বিরুদ্ধ।
“মা বললো,”
নির্ঝর কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারল না,
“বললো, ছেলেদের সঙ্গে নাকি মেয়েদের এত গা-ঘেঁষা বন্ধুত্ব করা উচিত নয়। বড় হলে নাকি লোকে ‘অন্য কথা’ ভাববে।”
মেহু সামান্য কেঁপে উঠল। এই ‘অন্য কথা’র ভার সেও মাঝে মাঝে অনুভব করে, যখন পাড়ার মহিলারা তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। "অন্য কথা মানে কী? আমরা তো একসঙ্গে হাঁটি, গল্প করি... ছোটবেলা থেকে যা করি, তাই করি।” (তার গলায় ছিল প্রতিবাদের সুর।)
"মানে, প্রেম,”
ঈশানের চোখে কেমন শূন্যতার ছাপ। মেহুর কাছে কেমন অন্যরকম ঠেকল ঈশানের ভারী কন্ঠস্বর। মেহু মৃদু কেঁপে উঠল। মেহু অনুভব করল তার শীরদারার মাঝবরাবর ঠান্ডা কিছু বয়ে গেল । আকস্মিক ভাবে তার পাতলা ঠোঁট ও চোখের পাতা কাঁপছে, মেহু বুঝলো না হচ্ছে টা কী তার সাথে । মেহু নিজেকে যথাসম্ভব নিজেকে সংবরন করার চেষ্টা করল
মেহু স্পষ্ট স্বরে বলল, “লোকে যা খুশি বলুক। এটা বন্ধুত্ব। এই সম্পর্কটা প্রেম নয়, আর কখনও হবেও না। বন্ধুতা আর ভালোবাসা দুটো আলাদা জিনিস, এদের কখনও এক করে দেখা উচিত নয়।”
ঈশানের বুকের মধ্যে তার গোপন ভালোবাসাটি যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। মেহুর এই অকাট্য অস্বীকৃতি তার কাছে এক নির্মম সত্যের মতো বাজল। সে বুঝতে পারল, তার নিজের হৃদয়ের কথা প্রকাশ করলে মেহূ আঘাত পাবে, এবং তাদের বন্ধুত্বটা চিরকালের জন্য ভেঙে যাবে।
সে মনের তীব্র কষ্ট চেপে রেখে শুধু হাসল।
"ঠিক বলেছিস। বন্ধুতা শুধু বন্ধুতা। আমি... আমি তোকে হারাবো না, সেটা আমি জানি।”
ঈশান তার হাত শক্ত করে ধরল। সে অনুভব করল, তাদের হাতের তালু একে অপরের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।
“তুই না থাকলে আমার খেলার রং ফিকে হয়ে যায়, গল্পের বইয়ের অক্ষরগুলো অর্থ হারায়।”
এই কথাগুলি তার মুখ দিয়ে বের হলো না ঈশানের, কিন্তু মেহু যেন তার চোখের দিকে তাকিয়েই যেন সব পড়ে নিল।
চলবে...??
(আজ থেকে শুরু হলো আমার লেখার ছোট্ট যাত্রা।
Part 1-এ পাঠকদের জন্য গল্পের সূচনা, চরিত্রের প্রথম পরিচয়, আর সেই অদেখা কল্পনার দুনিয়া।✨️
নতুন লেখক আমি, তাই ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু আশা করি, এই প্রথম অংশ আপনাদের হৃদয়কে ছুঁতে পারবে এবং পরবর্তী অংশের জন্য কৌতূহল জাগাবে।
আপনারা সমর্থন করলে part-2 লিখতে আগ্রহী হবো
গল্পের যাত্রা এখনই মাত্র শুরু। part 2 এর জন্য কমেন্টে আপনার মতামত জানান )
লেখা : ইসরাত জাহান
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।