একটি ধারাবাহিক প্রেমের গল্প
নীল সাগরের ওপারে
পর্ব ৩ : এক কাপ চা এবং কিছু না বলা কথা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৭ জুন ২০২৬
রাতটা বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে।
সমুদ্রের কাছের ছোট রেস্টুরেন্টটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিশি আর অভিক।
আশপাশে নিয়ন আলো। মানুষের কথাবার্তা, রিকশার টুংটাং, কোথাও আবার হঠাৎ হাসির শব্দ। তবু নিশির মনে হচ্ছিল, আজকের রাতটা অন্যরকম।
হয়তো কারণটা সহজ—আজ প্রথমবার কেউ তার কাছ থেকে কিছু জানতে চাইছে না। কেউ তার হয়ে ঠিক করে দিচ্ছে না, এখন কী করতে হবে।
একটা টং দোকানের সামনে এসে থামল অভিক। চুলার ওপর কেটলি বসানো। বাষ্প উঠছে। পাশে কাঁচের বয়ামে নোনতা বিস্কুট।
“চা খাবেন?”
নিশি একটু অবাক হলো। “চা?”
অভিক হাসল। “হ্যাঁ। সব সমস্যার সমাধান হয় না চায়ে। তবু ভালো এক কাপ চা মাথার ভেতরটা একটু হালকা করে দেয়, আমার এমনই মনে হয়।”
নিশি কিছু বলল না। কাঠের বেঞ্চটায় বসে পড়ল। বেঞ্চের রঙ উঠে গেছে। একপাশে কে যেন খোদাই করে ‘S+J’ লিখে রেখেছে।
অভিক দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিল। আদা বেশি, চিনি কম।
চা এলো। কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। দুজন চুপচাপ বসে রইল। কথা নেই। কিন্তু আগের সেই অস্বস্তিটাও আর নেই।
নিশি কাপের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল, “জানেন, আজ আমি একটা অদ্ভুত কাজ করেছি।”
অভিক ঘুরে তাকাল। “কী?”
নিশি হালকা হাসল। চোখ নামিয়ে নিল। “আজ প্রথমবার নিজের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
অভিক শুনছে। কোনো তাড়া নেই।
“সারাজীবন সবাই আমার জন্য ঠিক করে দিয়েছে। কী পরব, কোথায় যাব, কার সঙ্গে কথা বলব—সব।” একটু থামল সে। “আজ কারো কথা না শুনে একটা বাসে উঠে পড়েছিলাম। কোথায় যাব জানতাম না। তবু উঠেছি।”
তার চোখে সেই পুরনো কষ্টের ছায়াটা আবার ফিরে এলো। গলার স্বর নিচু হয়ে গেল। “হয়তো ব্যাপারটা বড় কিছু না। কিন্তু আমার কাছে ছিল।”
অভিক ধীরে বলল, “নিজের জন্য নেওয়া ছোট সিদ্ধান্তগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে ভারী হয়ে দাঁড়ায়।”
নিশি তাকাল তার দিকে। এই লোকটার কথায় অদ্ভুত একটা শান্তি আছে। যেন শব্দগুলো মাপা, তবু নরম।
“আপনি সবসময় এমন?” হঠাৎ জিজ্ঞেস করল নিশি।
অভিক একটু অবাক হলো। “কেমন?”
“এত শান্ত।”
অভিক মৃদু হাসল। কাপে চুমুক দিল। “না। আমি এমন ছিলাম না।”
নিশির চোখে আগ্রহ। অভিক টের পেল, কিন্তু আর কিছু বলল না। কয়েক সেকেন্ড পর শুধু বলল, “কিছু অভিজ্ঞতা মানুষকে বদলে দেয়। সবসময় ভালোর দিকে নয়।”
নিশি বুঝল, এখানেও একটা গল্প চাপা পড়ে আছে। সে আর প্রশ্ন করল না। কিছু কষ্টের দরজা জোর করে খুলতে গেলে ভেতরের অন্ধকারটা আরও ঘন হয়ে ওঠে, সে সেটা জানে।
“আজ আমারও এখানে থাকার কথা ছিল না,” অভিক চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে বলল। কাপের কানায় একটু ফাটা দাগ।
নিশি তাকাল। “তাহলে?”
অভিক একটু হাসল, যে হাসিতে শব্দ কম। “অন্য একটা জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে সব বদলে গেল।”
“কেন?” প্রশ্নটা মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল। বলেই নিশি নিজেই থেমে গেল। “সরি। বেশি জানতে চাইছি না।”
অভিক মাথা নাড়ল। “সমস্যা নেই।” চুপ করে থেকে বলল, “কখনো কখনো কিছু জায়গা থেকে সরে আসা দরকার হয়ে পড়ে। নিজের জন্যই।”
কথাটা সাধারণ। কিন্তু নিশি টের পেল, এর পেছনে কোনো ঘটনা আছে। কোনো মানুষ। যার নাম অভিক এখনই উচ্চারণ করতে চায় না।
“আপনার কি মনে হয়, মানুষ হঠাৎ বদলে যেতে পারে?” নিশির গলায় দ্বিধা।
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রাস্তার ওপাশে একটা কুকুর ডেকে উঠল। তারপর বলল, “মানুষ বদলায় না, এমনটাই আমার ধারণা। মানুষ বরং নিজের ভেতরের কিছু জিনিস চিনতে শেখে। যেগুলো আগে দেখেও দেখেনি।”
নিশি চুপ হয়ে গেল। কথাটা কোথাও গিয়ে লাগল। বুকের ভেতর ছোট একটা ধাক্কার মতো।
“আপনি কি সবসময় এত প্রশ্ন করেন?” অভিক হেসে বলল।
নিশি একটু ভাবল। “না।” তারপর যোগ করল, “শুধু যাদের উত্তর জানতে ইচ্ছে করে, তাদেরকেই করি।”
বলেই সে নিজেই থেমে গেল। কথাটার ওজন টের পেল দুজনেই।
কেউ আর কিছু বলল না।
রাত আরও গভীর হয়েছে। চায়ের কাপ দুটো কখন খালি হয়ে গেছে, খেয়াল করেনি কেউ। তবু ওঠার তাড়া নেই। যেন এই ছোট সময়টুকু দুজনেই আঁকড়ে রাখতে চাইছে।
ফেরার সময় নিশি একবার সমুদ্রের দিকে তাকাল। ঢেউগুলো আগের মতোই আসছে, ভাঙছে। ফেনা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে বালিতে।
অভিক কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল। কোনো কথা হলো না। শুধু একটা নীরবতা দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। শব্দের চেয়েও স্পষ্ট।
নিশি হাঁটতে শুরু করল। কয়েক পা গিয়ে হঠাৎ পেছন ফিরল।
অভিক তখনও দাঁড়িয়ে।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো নিশির মুখের একপাশে পড়েছে।
তারপর নিশি মুখ ঘুরিয়ে নিল। হাঁটার গতি বাড়াল না, কমালও না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হলো—এই রাতটা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি।
চলবে...
#নীল_সাগরের_ওপারে
#অভিক_ও_নিশি
#পর্ব_৩
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।