যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ হন, তবে পরীক্ষা কেন?
আল্লাহ আগে থেকেই সব জানলে মানুষের পরীক্ষা নেওয়ার অর্থ কী?
ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যতম পুরোনো প্রশ্ন হলো, "যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ হন এবং আগে থেকেই জানেন কে জান্নাতে যাবে, কে জাহান্নামে যাবে, তাহলে আবার পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কী?" অনেকের কাছে এটি একটি শক্তিশালী আপত্তি বলে মনে হয়। কিন্তু প্রশ্নটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে 'জানা' (Knowledge) এবং 'ঘটানো' (Causation) এই দুটি বিষয়কে এক করে ফেলা হয়েছে। ইসলামী দর্শন এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করে।
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হলো, আল্লাহর জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ ও কালাতীত। তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একই সঙ্গে জানেন। কুরআন বলে,
> "নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।"
(সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৬২)
আবার তিনি বলেন,
> "তাঁর কাছে অদৃশ্যের চাবিগুলো রয়েছে। তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না।"
(সূরা আল-আনআম ৬:৫৯)
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। কোনো ঘটনা আগে থেকে জানা মানেই কি সেই ঘটনাকে বাধ্য করা? উত্তর হলো, না।
একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী বহু বছর আগেই নির্ভুলভাবে বলতে পারেন, আগামী ২০৩৫ সালের একটি নির্দিষ্ট দিনে সূর্যগ্রহণ হবে। তাঁর এই জ্ঞান কি সূর্যগ্রহণ ঘটায়? অবশ্যই না। তিনি ঘটনার কারণ নন; তিনি কেবল তা জানেন। একইভাবে, একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক বছরের শুরুতেই বুঝতে পারেন কোন ছাত্র নিয়মিত পড়াশোনা করছে আর কে করছে না। পরীক্ষার আগে তিনি হয়তো ধারণা করতে পারেন কে ফেল করবে। কিন্তু তাঁর জানা ছাত্রকে ফেল করায় না; ছাত্র নিজের কাজের ফল ভোগ করে।
এখানে কেউ বলতে পারেন, "কিন্তু আল্লাহ তো শুধু জানেন না; তিনিই তো সবকিছুর স্রষ্টা।" ইসলামী আকীদার উত্তর হলো, আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছাশক্তি (ইখতিয়ার) দিয়েছেন। মানুষ নিজের ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নেয়, আর আল্লাহ সেই সিদ্ধান্ত আগে থেকেই জানেন। অর্থাৎ, আল্লাহর পূর্বজ্ঞান মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে বাতিল করে না।
কুরআন ঘোষণা করে,
> "যে ইচ্ছা করে সে ঈমান আনুক, আর যে ইচ্ছা করে সে কুফরি করুক।"
(সূরা আল-কাহফ ১৮:২৯)
এই আয়াত দেখায়, মানুষকে নির্বাচন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ জানেন মানুষ কী বেছে নেবে, কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষকে বাধ্য করে না।
এখন প্রশ্ন হলো, আল্লাহ যখন আগেই জানেন, তখন পরীক্ষা কেন?
প্রথম কারণ হলো, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। যদি আল্লাহ কোনো পরীক্ষা ছাড়াই কাউকে জান্নাত বা জাহান্নামে পাঠিয়ে দিতেন, তাহলে মানুষ আপত্তি করতে পারত, "আমি তো বাস্তবে কিছুই করার সুযোগ পেলাম না।" তাই মানুষকে বাস্তবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে বিচার দৃশ্যমান ও ন্যায়সঙ্গত হয়।
কুরআন বলে,
> "যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে।"
(সূরা আন-নিসা ৪:১৬৫)
অর্থাৎ, আল্লাহ মানুষের সামনে প্রমাণ সম্পূর্ণ করে দেন, তারপর বিচার করেন।
দ্বিতীয় কারণ হলো, মানুষের চরিত্র প্রকাশ করা। একটি বীজ দেখে আমরা বলতে পারি, এটি আমগাছ হবে। কিন্তু যতক্ষণ না তা অঙ্কুরিত হয়ে গাছে পরিণত হচ্ছে, ততক্ষণ সেই সম্ভাবনা বাস্তবে প্রকাশিত হয় না। একইভাবে, মানুষের অন্তরের ঈমান, ধৈর্য, সততা ও নৈতিকতা বাস্তব জীবনের পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।
এ কারণেই কুরআনে বলা হয়েছে,
> "তিনি তোমাদের পরীক্ষা করবেন, যাতে প্রকাশ পায় তোমাদের মধ্যে কে উত্তম আমলকারী।"
(সূরা আল-মুলক ৬৭:২)
এখানে "প্রকাশ পায়" বলতে আল্লাহর কাছে নতুন কিছু জানা বোঝায় না; বরং মানুষের কর্ম বাস্তবে সংঘটিত হওয়া বোঝায়।
তৃতীয় কারণ হলো, মানুষ নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে যাবে। কিয়ামতের দিন কেউ বলতে পারবে না, "আমি তো এমন ছিলাম না।" কারণ তার নিজের জীবনই তার সাক্ষ্য হবে। কুরআন বলে,
> "আজ আমি তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেব। তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা সাক্ষ্য দেবে তারা যা করত সে সম্পর্কে।"
(সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬৫)
অর্থাৎ, বিচার হবে বাস্তব কর্মের ভিত্তিতে, কেবল পূর্বজ্ঞান বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়।
এখানে একটি দার্শনিক ভুল ধারণাও দূর করা দরকার। অনেকেই মনে করেন, "যদি ভবিষ্যৎ আগে থেকেই জানা থাকে, তাহলে তা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়; সুতরাং স্বাধীন ইচ্ছাও নেই।" কিন্তু এটি একটি যৌক্তিক ভ্রান্তি। কোনো ঘটনা নিশ্চিতভাবে জানা আর সেই ঘটনাকে বাধ্য করা এক বিষয় নয়। ধরুন, আপনি গতকাল কী খেয়েছিলেন তা আজ নিশ্চিতভাবে জানেন। আপনার আজকের জ্ঞান কি গতকালের আপনার সিদ্ধান্তকে বাধ্য করেছিল? না। জ্ঞান ও কারণ ভিন্ন বিষয়। আল্লাহর জ্ঞান নিখুঁত, কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষের ইচ্ছার কারণ নয়।
ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত আল-আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ-এ বলেন:
> "আল্লাহ সবকিছু তাঁর সৃষ্টির আগেই জানতেন। তিনি জানতেন তারা কী করবে, কিন্তু তাঁর জ্ঞান তাদেরকে বাধ্য করেনি।"
এটি আহলুস সুন্নাহর আকীদার অন্যতম মৌলিক নীতি।
সবশেষে বলা যায়, আল্লাহর পরীক্ষা তাঁর অজ্ঞতার প্রমাণ নয়; বরং তাঁর ন্যায়বিচারের প্রকাশ। তিনি পরীক্ষা নেন জানার জন্য নয়, প্রকাশ করার জন্য; তথ্য সংগ্রহের জন্য নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য; নিজের জন্য নয়, মানুষের নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণ সম্পূর্ণ করার জন্য।
সুতরাং, "যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ হন, তবে পরীক্ষা কেন?" এই প্রশ্নের ইসলামী উত্তর হলো: আল্লাহর জ্ঞান পরীক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় করে না। কারণ পরীক্ষার উদ্দেশ্য আল্লাহর জ্ঞান বৃদ্ধি নয়; মানুষের কর্মকে বাস্তবে প্রকাশ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং এমন বিচার নিশ্চিত করা, যার বিরুদ্ধে কারও কোনো ন্যায্য আপত্তি থাকবে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।