বহু ধর্মের অস্তিত্ব কি ইসলামের সত্যতাকে দুর্বল করে?
ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায়ই একটি প্রশ্ন করা হয়, "যদি ইসলামই সত্য ধর্ম হয়, তাহলে পৃথিবীতে হাজার হাজার ধর্ম কেন? যদি আল্লাহ সত্যিই মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে চান, তাহলে সবাইকে একই ধর্মে রাখলেন না কেন?" অনেকের কাছে এটি একটি শক্তিশালী আপত্তি মনে হয়। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি বিষয়ে বহু মত থাকা মানেই কোনো একটি মত সত্য হতে পারে না, এমন নয়। বরং সত্য ও মিথ্যার সহাবস্থান মানব ইতিহাসের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
প্রথমেই একটি যৌক্তিক বিষয় বিবেচনা করা যাক। পৃথিবীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে শত শত ভুয়া চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। তাই বলে কি সঠিক চিকিৎসাবিজ্ঞান নেই? পৃথিবীতে অসংখ্য ভুয়া নোট আছে। তাই বলে কি আসল টাকা নেই? আদালতে অনেক মিথ্যা সাক্ষ্য থাকে। তাই বলে কি সত্য সাক্ষ্য বলে কিছু নেই? অর্থাৎ, অনেক বিকল্পের অস্তিত্ব সত্যকে বাতিল করে না। তাই "অনেক ধর্ম আছে, সুতরাং কোনো ধর্মই সত্য নয়" এই যুক্তি নিজেই যৌক্তিকভাবে দুর্বল।
ইসলাম দাবি করে না যে, পৃথিবীতে সব সময় শুধু একটি ধর্মই ছিল। বরং কুরআনের বক্তব্য হলো, আল্লাহ প্রত্যেক জাতির কাছে নবী পাঠিয়েছেন।
> "আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই একজন রাসূল পাঠিয়েছি।"
(সূরা আন-নাহল ১৬:৩৬)
আবার আল্লাহ বলেন,
> "এমন কোনো জাতি নেই, যার কাছে কোনো সতর্ককারী আসেনি।"
(সূরা ফাতির ৩৫:২৪)
অর্থাৎ ইসলামের দাবি হলো, মানবজাতির শুরু থেকেই আল্লাহ মানুষকে পথনির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষেরা সেই শিক্ষাকে পরিবর্তন করেছে, ভুলে গেছে অথবা নতুন বিশ্বাস যোগ করেছে। তাই বহু ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে।
কুরআন এ বিষয়ে বলে,
> "মানুষ ছিল এক জাতি। তারপর তারা মতভেদে লিপ্ত হলো।"
(সূরা ইউনুস ১০:১৯)
অর্থাৎ, ইসলামের মতে ধর্মের বৈচিত্র্য আল্লাহর ব্যর্থতার প্রমাণ নয়; বরং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও ইতিহাসের ফল।
এখন প্রশ্ন আসে, আল্লাহ চাইলে সবাইকে একই ধর্মে রাখতেন না কেন?
কুরআন নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।
> "তোমার প্রতিপালক যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীর সবাই ঈমান আনত। তাহলে কি তুমি মানুষকে জোর করে মুমিন বানাবে?"
(সূরা ইউনুস ১০:৯৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর ক্ষমতার অভাবে মানুষ ভিন্ন ধর্মে যায়নি। বরং তিনি মানুষকে স্বাধীনভাবে নির্বাচন করার ক্ষমতা দিয়েছেন। কারণ এই পৃথিবী পরীক্ষার স্থান।
আল্লাহ বলেন,
> "তিনি তোমাদের পরীক্ষা করবেন, কে উত্তম আমলকারী।"
(সূরা আল-মুলক ৬৭:২)
যদি সবাই জন্মগতভাবে একই বিশ্বাসে বাধ্য হতো, তাহলে পরীক্ষা, নৈতিক দায়িত্ব ও জবাবদিহির অর্থই থাকত না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বেশি মানুষ কোনো মতবাদে বিশ্বাস করলেই কি সেটি সত্য হয়ে যায়?
ইসলামের উত্তর, না।
কুরআন বলে,
> "তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।"
(সূরা আল-আনআম ৬:১১৬)
ইতিহাসও তাই বলে। একসময় পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করত সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। পরে বিজ্ঞান দেখিয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস সত্যের মানদণ্ড নয়।
কেউ বলতে পারেন, "কিন্তু একজন মানুষ কীভাবে বুঝবে কোন ধর্ম সত্য?"
ইসলাম অন্ধ অনুসরণের নির্দেশ দেয় না। বরং কুরআন বারবার যুক্তি, চিন্তা ও প্রমাণের আহ্বান জানায়।
> "তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে তোমাদের প্রমাণ নিয়ে এসো।"
(সূরা আল-বাকারা ২:১১১)
আবার বলে,
> "তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?"
(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৪)
অর্থাৎ ইসলাম নিজেকে যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে যাচাই করার আহ্বান জানায়।
এখানে একটি দার্শনিক বিষয়ও রয়েছে। যদি আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে সৃষ্টি করেন, তাহলে মতভেদ অনিবার্য। কারণ স্বাধীন মানুষ একই তথ্য দেখে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই বহু ধর্মের অস্তিত্ব স্বাধীন ইচ্ছার একটি স্বাভাবিক ফল। এটি ইসলামের দাবির বিরুদ্ধে নয়; বরং ইসলামের বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে ইসলাম একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যায়বিচারের নীতিও ঘোষণা করেছে।
> "আমি কোনো রাসূল পাঠানো ছাড়া কাউকে শাস্তি দিই না।"
(সূরা আল-ইসরা ১৭:১৫)
অর্থাৎ, আল্লাহ মানুষকে তার জ্ঞান, সুযোগ ও প্রাপ্ত প্রমাণ অনুযায়ী বিচার করবেন। যে ব্যক্তি সত্য জানার বাস্তব সুযোগই পায়নি, তার বিচারও আল্লাহ পূর্ণ ন্যায়বিচারের সঙ্গে করবেন। তাই ইসলাম শেখায় না যে, সব মানুষকে একই মানদণ্ডে বিচার করা হবে।
সবশেষে বলা যায়, পৃথিবীতে বহু ধর্ম থাকা ইসলামের সত্যতাকে খণ্ডন করে না। বরং ইসলামের দাবি হলো, আল্লাহ শুরু থেকেই মানবজাতিকে সত্যের দিশা দিয়েছেন, কিন্তু মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, ইতিহাস এবং বিকৃতির কারণে বহু ধর্মের জন্ম হয়েছে। সত্য একটিই হতে পারে, কিন্তু ভুলের সংখ্যা অনেক হতে পারে।
সুতরাং, "যদি ইসলামই একমাত্র সত্য ধর্ম হয়, তবে পৃথিবীতে এত ধর্ম কেন?" এই প্রশ্নের ইসলামী উত্তর হলো: বহু ধর্মের অস্তিত্ব সত্য ধর্মের অনুপস্থিতির প্রমাণ নয়। ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহ প্রত্যেক জাতির কাছে পথনির্দেশ পাঠিয়েছেন, কিন্তু মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, বিকৃতি ও মতভেদের কারণে বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব হয়েছে। তাই সত্যকে নির্ধারণ করতে হবে প্রমাণ, যুক্তি ও ওহির আলোকে; কেবল অনুসারীর সংখ্যা বা ধর্মের বৈচিত্র্য দিয়ে নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।