অশুভ ও দুঃখ-কষ্টের সমস্যা: ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্লেষণ
ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রচলিত আপত্তিগুলোর একটি হলো, "যদি আল্লাহ সত্যিই সর্বদয় (আর-রহমান) ও সর্বশক্তিমান হন, তবে নিষ্পাপ শিশুদের ক্যান্সার, জন্মগত রোগ বা দুর্ভোগ কেন হয়?" প্রশ্নটি আবেগপ্রবণ এবং গভীর। কোনো শিশুর কষ্ট দেখে মানুষের হৃদয় ব্যথিত হওয়াই স্বাভাবিক। ইসলাম এই কষ্টকে অস্বীকার করে না, বরং স্বীকার করে। তবে ইসলাম মনে করে, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে হলে আগে বুঝতে হবে, পৃথিবীর উদ্দেশ্য কী।
প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় বোঝা জরুরি। ইসলাম কখনোই পৃথিবীকে চূড়ান্ত সুখের স্থান বলে দাবি করেনি। বরং কুরআন স্পষ্টভাবে জানায়, এই পৃথিবী একটি পরীক্ষার স্থান।
> "তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে আমলে উত্তম।"
(সূরা আল-মুলক ৬৭:২)
অর্থাৎ, পৃথিবীর উদ্দেশ্য স্থায়ী আরাম নয়; বরং পরীক্ষা। যদি পৃথিবীই জান্নাত হতো, তাহলে এখানে রোগ, মৃত্যু, বার্ধক্য বা বিপদ কোনোটাই থাকত না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্ন আসে। আমরা যখন বলি, "ভালো আল্লাহ থাকলে কষ্ট থাকবে না", তখন আমরা ধরে নিচ্ছি যে একজন দয়ালু সত্তার একমাত্র কাজ হলো সব কষ্ট দূর করে দেওয়া। কিন্তু বাস্তব জীবনেও তা সত্য নয়। একজন দক্ষ চিকিৎসক রোগীর অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচার ব্যথাদায়ক, কিন্তু নিষ্ঠুর নয়। একজন শিক্ষক কঠিন পরীক্ষা নেন। পরীক্ষা কষ্টকর, কিন্তু ছাত্রের ক্ষতির জন্য নয়। অর্থাৎ, কষ্ট থাকা মানেই দয়ার অনুপস্থিতি নয়। অনেক সময় বৃহত্তর কল্যাণের জন্য সাময়িক কষ্ট প্রয়োজন হয়।
তবে কেউ বলতে পারেন, "ঠিক আছে, বড়দের পরীক্ষা হতে পারে। কিন্তু একটি শিশু কেন কষ্ট পাবে?" ইসলামী আকীদায় এর উত্তর হলো, শিশু কোনো পাপের শাস্তি হিসেবে কষ্ট পায় না। ইসলাম উত্তরাধিকারসূত্রে পাপ (Original Sin) বিশ্বাস করে না। কুরআন ঘোষণা করে,
> "কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।"
(সূরা আল-আনআম ৬:১৬৪)
অতএব, কোনো শিশু তার নিজের বা অন্য কারও পাপের কারণে রোগে আক্রান্ত হয় না।
তাহলে সেই কষ্টের অর্থ কী? ইসলামে বলা হয়, একই ঘটনা বিভিন্ন মানুষের জন্য বিভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। শিশুর জন্য তা শাস্তি নয়; কিন্তু তার মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের জন্য তা পরীক্ষা হতে পারে। সেই শিশুর মাধ্যমে মানুষের ধৈর্য, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দানশীলতা ও মানবিকতা পরীক্ষিত হয়। একটি শিশুর অসুস্থতা বহু মানুষের চরিত্রকে প্রকাশ করে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামে দুনিয়ার জীবনই সবকিছু নয়। যদি মৃত্যুই মানুষের শেষ পরিণতি হতো, তাহলে এই আপত্তি আরও শক্তিশালী হতো। কিন্তু ইসলাম বলে, মৃত্যুর পর অনন্ত জীবন রয়েছে। তাই একটি শিশুর কয়েক বছরের কষ্টকে অনন্ত জীবনের আলোকে দেখা হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
> "মুসলমানের যে কোনো ক্লান্তি, রোগ, দুঃখ, কষ্ট, এমনকি কাঁটার খোঁচাও তাকে আঘাত করলে আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহ মাফ করেন।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৩)
আর যে শিশু বালেগ হওয়ার আগেই মারা যায়, সে ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী জবাবদিহির অধীন নয়। বহু সহিহ হাদিসে এসেছে যে, এমন শিশুরা জান্নাতবাসী হবে। অর্থাৎ, দুনিয়ার কষ্ট তাদের চূড়ান্ত পরিণতি নয়।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। আমরা সাধারণত একটি ঘটনার তাৎক্ষণিক দিক দেখি, কিন্তু আল্লাহ সমগ্র বাস্তবতা জানেন। কুরআনে মূসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনায় দেখা যায়, খিজির এমন কিছু কাজ করেছিলেন যা প্রথম দৃষ্টিতে অন্যায় মনে হয়েছিল। পরে বোঝা গেল, সেগুলোর পেছনে এমন প্রজ্ঞা ছিল যা মূসা (আ.) তখন জানতেন না। (সূরা আল-কাহফ ১৮:৬০-৮২)। এই ঘটনা শেখায়, মানুষের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী।
কুরআন বলে,
> "হতে পারে তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করছ, অথচ তাতেই তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আর হতে পারে তোমরা কোনো জিনিস পছন্দ করছ, অথচ তাতেই তোমাদের অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।"
(সূরা আল-বাকারা ২:২১৬)
এটি কোনো ঘটনার সহজ ব্যাখ্যা নয়; বরং মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার ঘোষণা।
এখানে একটি যুক্তিগত বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত। কেউ যদি বলেন, "আমি কোনো কারণ জানি না, তাই কোনো কারণ নেই", তাহলে এটি যুক্তির ভাষায় argument from ignorance নামে পরিচিত। কারণ আমরা কোনো ঘটনার কারণ না জানলেই যে কারণ নেই, তা প্রমাণিত হয় না। পাঁচ বছরের একটি শিশু যদি দেখে ডাক্তার তার মাকে কষ্ট দিয়ে ইনজেকশন দিচ্ছেন, সে ভাবতে পারে ডাক্তার নিষ্ঠুর। কিন্তু তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে সে চিকিৎসার উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না। মানুষের অবস্থানও আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় তেমনই সীমাবদ্ধ।
সবশেষে মনে রাখা উচিত, ইসলাম কখনো বলে না যে মানুষের কষ্ট দেখে চুপ করে বসে থাকতে হবে। বরং রোগীর চিকিৎসা করা, ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো, এতিমের দেখাশোনা করা এবং বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যদি কষ্টের কোনো অর্থই না থাকত, তাহলে মানুষকে তা দূর করার নির্দেশও দেওয়া হতো না। ইসলামে কষ্ট বাস্তব, কিন্তু তা অর্থহীন নয়।
সুতরাং, "যদি আল্লাহ সর্বদয় হন, তবে শিশুদের ক্যান্সার কেন?" এই প্রশ্নের ইসলামী উত্তর হলো: পৃথিবী জান্নাত নয়, পরীক্ষা। শিশুর কষ্ট তার পাপের শাস্তি নয়। আল্লাহর জ্ঞান মানুষের জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে। আর দুনিয়ার সাময়িক কষ্টকে ইসলামে কখনোই মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখা হয় না; বরং আখিরাতের অনন্ত জীবনের আলোকে বিচার করা হয়। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুর কষ্ট আল্লাহর দয়ার অস্বীকৃতি নয়, বরং এমন এক বাস্তবতার অংশ, যার পূর্ণ অর্থ কেবল আল্লাহই জানেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।