যদি সীমিত জীবনের অবিশ্বাসের জন্য অনন্ত জাহান্নাম হয়, তবে তা কি ন্যায়সঙ্গত?
অনন্ত শাস্তি ও আল্লাহর ন্যায়বিচার: ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্লেষণ
ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত আপত্তিগুলোর একটি হলো, "একজন মানুষ পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ৬০, ৭০ বা ৮০ বছর বাঁচে। তার এই সীমিত জীবনের অবিশ্বাস বা পাপের জন্য যদি অনন্তকাল জাহান্নামে শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে এটি কীভাবে ন্যায়সঙ্গত হতে পারে?" প্রথম দৃষ্টিতে প্রশ্নটি আবেগপূর্ণ এবং যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বধারণা রয়েছে। সেটি হলো, শাস্তির পরিমাণ সবসময় অপরাধ সংঘটনের সময়ের সমান হওয়া উচিত। অথচ বাস্তব জীবনেও এমন কোনো নীতি নেই।
ধরুন, একজন ব্যক্তি মাত্র কয়েক সেকেন্ডে একটি নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল। হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে হয়তো এক মিনিটও লাগেনি। কিন্তু সেই অপরাধের জন্য অনেক দেশে তাকে আজীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এখানে শাস্তি নির্ধারিত হয় অপরাধটি কতক্ষণ স্থায়ী ছিল তার ওপর নয়, বরং অপরাধটির প্রকৃতি, গুরুত্ব এবং যার বিরুদ্ধে অপরাধ করা হয়েছে তার ভিত্তিতে।
ইসলামে কুফর বা অবিশ্বাসকে কেবল একটি "ভুল মতামত" হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি সেই সত্তাকে সচেতনভাবে অস্বীকার করা, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, জীবন দিয়েছেন, অগণিত নিয়ামত দিয়েছেন এবং সত্যের জন্য পর্যাপ্ত নিদর্শন পাঠিয়েছেন। কুরআন বলে,
> "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; এর নিচের যা কিছু, তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।"
(সূরা আন-নিসা ৪:৪৮)
অর্থাৎ, ইসলামে কুফরকে সর্বোচ্চ নৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আসে। শাস্তি কি কেবল সময়ের ওপর নির্ভর করে, নাকি অপরাধের প্রকৃতির ওপরও নির্ভর করে? বাস্তব আইনে আমরা দ্বিতীয়টিকেই গ্রহণ করি। একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে অপমান করা এবং একজন সাধারণ নাগরিককে অপমান করা অনেক রাষ্ট্রে একই আইনি গুরুত্ব বহন করে না। কারণ অপরাধের গুরুত্ব নির্ধারণে যার বিরুদ্ধে অপরাধ করা হয়েছে, তার অবস্থানও বিবেচ্য হয়। ইসলামের যুক্তি হলো, যখন অপরাধের লক্ষ্য হচ্ছেন সমগ্র জগতের স্রষ্টা ও সর্বোচ্চ অধিকারী, তখন তার গুরুত্বও সাধারণ অপরাধের মতো হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামে জাহান্নামের অনন্ত শাস্তি সব মানুষের জন্য নয়। কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি ঈমান নিয়ে মারা যায়, সে যদি বড় গুনাহও করে থাকে, তবে আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন, অথবা কিছু সময় শাস্তি দেওয়ার পর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
> "যার অন্তরে একটি অণু পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে একসময় জাহান্নাম থেকে বের হবে।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৪৩৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৩)
অতএব, অনন্ত জাহান্নাম ইসলামী আকীদায় কেবল সেই ব্যক্তির জন্য, যে কুফরের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন কুফরের শাস্তি অনন্ত?
অনেক ইসলামী আলেম এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেন, বিষয়টি শুধু অতীতের কাজ নয়; বরং ব্যক্তির স্থায়ী নৈতিক অবস্থান। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সে যদি অনন্তকাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকত, তবে সেই প্রত্যাখ্যানই চালিয়ে যেত। তার অবিশ্বাস কোনো সাময়িক ভুল নয়; বরং তার স্থায়ী অবস্থান।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) লিখেছেন যে, মানুষের অন্তরের স্থায়ী প্রবণতা ও ইচ্ছাও বিচারের ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ বিচার কেবল অতীতের কয়েকটি কাজের ওপর নয়, ব্যক্তির চরিত্র ও চূড়ান্ত অবস্থানের ওপরও নির্ভর করে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ইসলাম শিক্ষা দেয় না যে, প্রত্যেক অমুসলিম ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাহান্নামে যাবে। বরং কুরআন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ঘোষণা করেছে।
> "আমি কোনো রাসূল পাঠানো ছাড়া কাউকে শাস্তি দিই না।"
(সূরা আল-ইসরা ১৭:১৫)
অর্থাৎ, যার কাছে সত্য ন্যায্যভাবে পৌঁছায়নি, বা যে প্রকৃত অর্থে সত্য জানার সুযোগ পায়নি, তার বিচার আল্লাহ তাঁর পূর্ণ ন্যায়বিচার অনুযায়ী করবেন। ইসলামে আল্লাহ কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেন না।
কুরআন আরও বলে,
> "নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি বিন্দুমাত্রও জুলুম করেন না; বরং মানুষ নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করে।"
(সূরা ইউনুস ১০:৪৪)
এটি ইসলামী ন্যায়বিচারের অন্যতম মৌলিক নীতি।
দার্শনিকভাবে একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। যদি আল্লাহ সত্যিই সর্বজ্ঞ ও সর্বন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে বিচারও তাঁর পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে হবে। কিন্তু মানুষ সীমিত জ্ঞান নিয়ে বিচার করছে। একজন বিচারক যেমন মামলার সব নথি না দেখে রায় দিতে পারেন না, তেমনি মানুষও অন্য মানুষের অন্তর, উদ্দেশ্য, সুযোগ ও জ্ঞানের পরিমাণ জানে না। কিন্তু আল্লাহ সব জানেন।
সবশেষে বলা যায়, ইসলামে অনন্ত জাহান্নামের ধারণা কোনো আবেগপ্রসূত প্রতিশোধ নয়। এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের অংশ, যেখানে বিচার করা হয় মানুষের পূর্ণ জ্ঞান, ইচ্ছা, সুযোগ, চরিত্র এবং চূড়ান্ত অবস্থানের ভিত্তিতে। শাস্তির স্থায়িত্ব কেবল পৃথিবীতে অপরাধ করতে কত সময় লেগেছে তার ওপর নির্ভর করে না।
সুতরাং, "সীমিত জীবনের অবিশ্বাসের জন্য অনন্ত জাহান্নাম কি ন্যায়সঙ্গত?" এই প্রশ্নের ইসলামী উত্তর হলো: ইসলামে শাস্তি সময়ের দৈর্ঘ্য দিয়ে নয়, অপরাধের প্রকৃতি, অপরাধীর চূড়ান্ত নৈতিক অবস্থান এবং আল্লাহর পূর্ণ ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। অনন্ত জাহান্নাম কেবল সেই ব্যক্তির জন্য, যে সত্যকে জেনে-বুঝে প্রত্যাখ্যান করে কুফরের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আর যার কাছে সত্য ন্যায্যভাবে পৌঁছায়নি, তার বিচার আল্লাহ এমন ন্যায়ের সঙ্গে করবেন, যেখানে কোনো জুলুমের অবকাশ নেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।