ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্লেষণ
অনেকেই প্রশ্ন করেন, "যদি আল্লাহ সত্যিই সর্বশক্তিমান ও সর্বমহান হন, তবে কুরআনে কেন বারবার বলা হয়েছে তিনি মহান, তিনি ক্ষমাশীল, তিনি সর্বশক্তিমান, তাঁরই ইবাদত করতে হবে? একজন সর্বশক্তিমান সত্তার কি এত আত্মপ্রচারের প্রয়োজন আছে?" প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিক মনে হলেও, এর ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বধারণা (presupposition) রয়েছে। সেটি হলো, কুরআনে আল্লাহর নিজের পরিচয় দেওয়াকে মানুষের মতো আত্মপ্রচার (self-promotion) ধরে নেওয়া। অথচ ইসলামী দৃষ্টিতে এই দুই বিষয় এক নয়।
মানুষ যখন নিজের প্রশংসা করে, তখন তার উদ্দেশ্য সাধারণত নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করা, অন্যের স্বীকৃতি পাওয়া বা কোনো অভাব পূরণ করা। কারণ মানুষ অসম্পূর্ণ; সে সম্মান, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার মুখাপেক্ষী। কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে কুরআন ঘোষণা করে,
> "হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, সর্বপ্রশংসিত।"
(সূরা ফাতির ৩৫:১৫)
অর্থাৎ আল্লাহ কারো প্রশংসার মুখাপেক্ষী নন। মানুষের ইবাদত, প্রশংসা বা অস্বীকার তাঁর মর্যাদায় কিছু যোগ বা বিয়োগ করে না।
এই সত্যটি একটি সহিহ হাদিসেও এসেছে। আল্লাহ বলেন (হাদিসে কুদসি):
> "হে আমার বান্দারা! তোমাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, মানুষ ও জিন সবাই যদি সবচেয়ে পরহেজগার ব্যক্তির মতো হয়ে যায়, তবুও তা আমার রাজত্বে কিছুই বৃদ্ধি করবে না। আর সবাই যদি সবচেয়ে পাপিষ্ঠ ব্যক্তির মতো হয়ে যায়, তবুও তা আমার রাজত্বে কিছুই কমাবে না।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৭)
[ সম্পূ হাদীস পড়ার লিংক-
https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=53565
অতএব, আল্লাহর নিজের পরিচয় দেওয়ার উদ্দেশ্য নিজের মর্যাদা বাড়ানো নয়, বরং মানুষের কল্যাণ।
এখানে একটি সাধারণ উদাহরণ দেওয়া যায়। একজন চিকিৎসক যদি রোগীকে বলেন, "আমি একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, আমার নির্দেশনা অনুসরণ করুন", তাহলে কি তিনি আত্মপ্রচার করছেন? না। তিনি নিজের যোগ্যতা জানাচ্ছেন, যাতে রোগী সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারে। একজন শিক্ষক যদি বলেন, "আমি এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ", সেটিও অহংকার নয়; বরং শিক্ষার স্বার্থে পরিচয়। ঠিক তেমনি, আল্লাহ যখন বলেন তিনি আল-আলীম (সর্বজ্ঞ), আল-হাকীম (প্রজ্ঞাময়), আর-রহমান (পরম দয়ালু) বা আল-খালিক (স্রষ্টা), তখন তিনি মানুষের সামনে নিজের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরছেন, যাতে মানুষ জানতে পারে কার ইবাদত করবে, কার ওপর ভরসা করবে এবং কার কাছে জবাবদিহি করবে।
কুরআন নিজেই জানিয়ে দেয়, মানুষ ও জিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী:
> "আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।"
(সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬)
যে সত্তার ইবাদত করার জন্য মানুষ সৃষ্টি হয়েছে, তাঁর পরিচয় দেওয়া কি অপ্রয়োজনীয়? বরং পরিচয় না দিলে প্রশ্ন উঠত, "আমরা কাকে ইবাদত করব, কেন করব, তাঁর গুণাবলি কী?"
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। কুরআনে আল্লাহর গুণাবলির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দুর্বলতা, ভুল, সীমাবদ্ধতা এবং নবীদের সমালোচনামূলক ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। যদি কুরআনের উদ্দেশ্য কেবল আত্মপ্রচার হতো, তাহলে এত আত্মসমালোচনামূলক শিক্ষা, সতর্কবাণী, যুক্তি এবং ইতিহাসের প্রয়োজন হতো না। বরং কুরআনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মানুষকে চিন্তা করতে আহ্বান।
আল্লাহ বলেন,
> "তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না?"
(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৪)
আবার বলেন,
> "নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।"
(সূরা আলে ইমরান ৩:১৯০)
অর্থাৎ কুরআন অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির আহ্বান জানায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পার্থক্য রয়েছে। ইসলামে আল্লাহকে "আল-গনী" বলা হয়েছে, অর্থাৎ যিনি সকল প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আত্মপ্রচার সবসময় কোনো না কোনো প্রয়োজনের ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু যিনি কোনো কিছুরই মুখাপেক্ষী নন, তাঁর ক্ষেত্রে "আত্মপ্রচার" শব্দটি প্রযোজ্য হয় না। বরং এটি মানুষের ভাষায় একটি ভুল উপমা (false analogy)। মানুষের আচরণের মানদণ্ড দিয়ে স্রষ্টার উদ্দেশ্য বিচার করলে যুক্তিগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
কুরআনে আল্লাহ বলেন,
> "যে কৃতজ্ঞ হয়, সে নিজের কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, তবে নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অমুখাপেক্ষী, মহাসম্মানিত।"
(সূরা আন-নামল ২৭:৪০)
অর্থাৎ মানুষের কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতা আল্লাহর কোনো উপকার বা অপকার করে না; লাভ-ক্ষতি সম্পূর্ণ মানুষের নিজের।
সবশেষে বলা যায়, "আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন" এবং "আল্লাহ আত্মপ্রচার করেছেন" এই দুটি বাক্য এক অর্থ বহন করে না। ইসলামের মতে, আল্লাহর পরিচয় প্রদান মানুষের হেদায়েত, শিক্ষা এবং মুক্তির জন্য; নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য নয়। কারণ যিনি স্বয়ং সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং সকল কিছুর মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত, তাঁর কোনো প্রচারণার প্রয়োজন হতে পারে না। কুরআনের ভাষায়,
> "বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।"
(সূরা আল-ইখলাস ১১২:১-২)
সুতরাং, "আল্লাহ কেন নিজের কথা বারবার বলেছেন?" এই প্রশ্নের ইসলামী উত্তর হলো: নিজেকে বড় প্রমাণ করার জন্য নয়, বরং মানুষকে সত্য, স্রষ্টা এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেওয়ার জন্য। এই পরিচয় মানুষের প্রয়োজন; আল্লাহর নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।