যদি সব পূর্বনির্ধারিত (তাকদীর) হয়, তবে বিচার কেন?
তাকদীর ও স্বাধীন ইচ্ছা: ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্লেষণ
ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত দার্শনিক আপত্তিগুলোর একটি হলো, "যদি আল্লাহ আগেই সবকিছু নির্ধারণ করে রাখেন, তাহলে মানুষ তার কাজের জন্য দায়ী হবে কেন? যদি আমি যা করছি, তা আগে থেকেই লেখা থাকে, তাহলে আমাকে শাস্তি বা পুরস্কার দেওয়া কি ন্যায়সঙ্গত?" এই প্রশ্ন নতুন নয়। সাহাবিদের যুগ থেকেই তাকদীর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ইসলামী আকীদা এই বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইসলাম বলে, আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু তাঁর ইচ্ছার বাইরে ঘটে না, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষকে বাস্তব অর্থেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
তাকদীর সম্পর্কে প্রথমেই জানা দরকার যে, ইসলামে তাকদীরের অর্থ "মানুষকে রোবটের মতো পরিচালনা করা" নয়। বরং তাকদীর বলতে বোঝায়, আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞানে সবকিছু জানেন, সবকিছু লিখে রেখেছেন এবং তাঁর ইচ্ছা ও ক্ষমতার মধ্যেই সবকিছু সংঘটিত হয়। কুরআন বলে,
> "নিশ্চয়ই আমি সবকিছু একটি নির্ধারিত পরিমাপ অনুযায়ী সৃষ্টি করেছি।"
(সূরা আল-কামার ৫৪:৪৯)
আবার অন্যত্র বলা হয়েছে,
> "পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের ওপর যে বিপদই আসে, তা আমি সৃষ্টি করার আগেই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।"
(সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২২)
কিন্তু এখানেই অনেকে একটি ভুল ধারণা করেন। তারা মনে করেন, "লিখে রাখা" মানেই "জোর করে ঘটানো"। অথচ এই দুটি বিষয় এক নয়।
ধরুন, একজন শিক্ষক তার ছাত্রদের দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিতভাবে জানলেন যে, একটি নির্দিষ্ট ছাত্র পরীক্ষায় ফেল করবে। পরে সত্যিই সে ফেল করল। এখন প্রশ্ন হলো, ছাত্রটি কি শিক্ষকের জানার কারণে ফেল করল? না। ছাত্র নিজের অবহেলার কারণে ফেল করেছে। শিক্ষকের জ্ঞান ফলাফলের কারণ নয়; বরং ফলাফল সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান।
আল্লাহর ক্ষেত্রেও ইসলামী আকীদা বলে, তাঁর পূর্বজ্ঞান মানুষের কাজের কারণ নয়। তিনি জানেন মানুষ কী করবে, কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষকে বাধ্য করে না।
কুরআন স্পষ্টভাবে মানুষের ইচ্ছা ও দায়িত্বের কথা ঘোষণা করেছে।
> "যে সৎকর্ম করে, তা তার নিজের কল্যাণের জন্য; আর যে অসৎকর্ম করে, তা তার নিজের বিরুদ্ধে।"
(সূরা ফুসসিলাত ৪১:৪৬)
আরও বলেন,
> "আল্লাহ কোনো মানুষের ওপর তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।"
(সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬)
যদি মানুষের কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্তই না থাকত, তাহলে এই আয়াতগুলোর কোনো অর্থ থাকত না। কারণ যে সম্পূর্ণ বাধ্য, তাকে দায়ী করা ন্যায়বিচার নয়।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করুন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও আমরা স্বাধীন ইচ্ছার বাস্তবতা অনুভব করি। আপনি এখন এই লেখা পড়বেন নাকি বন্ধ করবেন, পানি খাবেন নাকি চা খাবেন, সত্য বলবেন নাকি মিথ্যা বলবেন, এসব সিদ্ধান্ত আপনি নিজেই নেন। কেউ আপনার হাত ধরে বাধ্য করছে না। ইসলাম এই অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে না; বরং এটিকেই মানুষের নৈতিক দায়িত্বের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, "যদি আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই না ঘটে, তাহলে মানুষের ইচ্ছার মূল্য কোথায়?" ইসলামের উত্তর হলো, মানুষের ইচ্ছাও আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ মানুষকে সীমিত স্বাধীনতা দিয়েছেন। অর্থাৎ মানুষ স্বাধীন, কিন্তু সর্বশক্তিমান নয়। সে যা ইচ্ছা করে, তা করতে চায়; কিন্তু সবসময় তা করতে পারে না। এই সীমিত স্বাধীনতার মধ্যেই তার পরীক্ষা।
কুরআন বলে,
> "তোমাদের মধ্যে যে সোজা পথ অবলম্বন করতে চায়... আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক, ইচ্ছা করেন।"
(সূরা আত-তাকভীর ৮১:২৮-২৯)
এই আয়াত দুটি দেখায় যে মানুষের ইচ্ছা বাস্তব, তবে তা আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার বাইরে নয়।
এখানে একটি বিখ্যাত ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এক ব্যক্তি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে চুরি করার পর বলল, "আমি তো আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী চুরি করেছি।" তখন উমর (রা.) বললেন, "আমরাও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী তোমার হাত কাটব।" অর্থাৎ তাকদীরকে অপরাধের অজুহাত বানানো ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও এই বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সাহাবিরা যখন তাকদীর নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্ক করতে লাগলেন, তিনি বললেন,
> "তোমরা আমল করে যাও। কারণ প্রত্যেককে সে কাজের জন্য সহজ করে দেওয়া হয়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৪৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৪৭)
অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ নিয়ে বসে থাকার নয়; মানুষের কাজ হলো সৎকর্ম করা।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। যদি মানুষ সম্পূর্ণ বাধ্য হতো, তাহলে পৃথিবীতে "ন্যায়", "অন্যায়", "প্রশংসা", "নিন্দা", "আইন", "শাস্তি", "পুরস্কার" এসব ধারণার কোনো অর্থ থাকত না। আমরা কোনো রোবটকে নৈতিকভাবে দোষ দিই না, কারণ সে নিজের সিদ্ধান্ত নেয় না। কিন্তু মানুষকে দোষ দিই, কারণ আমরা জানি সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ইসলামও এই নৈতিক বাস্তবতাকেই স্বীকার করে।
আহলুস সুন্নাহর অন্যতম ইমাম, ইমাম আত-তাহাবী (রহ.) বলেন:
> "মানুষের কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু মানুষই সেই কর্ম অর্জন (কাসব) করে; তাই সে তার কাজের জন্য দায়ী।"
এই "কাসব" (অর্জন) তত্ত্বের মাধ্যমে আহলুস সুন্নাহ ব্যাখ্যা করেছেন যে, আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু মানুষ নিজের ইচ্ছায় কাজ নির্বাচন করে এবং সেই নির্বাচনের জন্যই জবাবদিহি করে।
সবশেষে বলা যায়, তাকদীর ও স্বাধীন ইচ্ছা পরস্পরবিরোধী নয়। আল্লাহর পূর্বজ্ঞান মানুষের স্বাধীনতাকে নষ্ট করে না, যেমন একজন শিক্ষকের পূর্বানুমান ছাত্রকে বাধ্য করে না। আল্লাহ জানেন মানুষ কী করবে, কিন্তু মানুষ নিজের ইচ্ছায় সেই কাজ করে। তাই বিচারও হয় মানুষের নিজের নির্বাচনের ভিত্তিতে।
সুতরাং, "যদি সব পূর্বনির্ধারিত হয়, তবে বিচার কেন?" এই প্রশ্নের ইসলামী উত্তর হলো: তাকদীর মানে বাধ্য করা নয়; বরং আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান ও সর্বময় কর্তৃত্ব। মানুষকে সীমিত কিন্তু বাস্তব স্বাধীন ইচ্ছা দেওয়া হয়েছে। সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করে, আর সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই কিয়ামতের দিন তার বিচার হবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।