নিশির দিনগুলো
গল্প-৩ : উত্তরাধিকার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
স্বামী বেঁচে থাকতে যে ঘরটা নিজের ছিল, তার মৃত্যুর পর সেই ঘরেই সে হয়ে গেল অতিথি।
অভিক চলে যাওয়ার এক মাসও হয়নি।
বাড়িতে তখনও আত্মীয়-স্বজনের আসা-যাওয়া চলছে। সেই ভিড়ের মধ্যেই নিশি টের পেল, বাড়িটার বাতাস যেন বদলে গেছে।
একদিন রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, আলমারির চাবিটা আর আগের জায়গায় নেই।
বড় জা বললেন,
"চাবিটা এখন থেকে আমার কাছে থাকবে। সব হিসাব আমরাই দেখব।"
নিশি কিছু বলল না। ভাবল, হয়তো কয়েক দিনের জন্য।
কিন্তু দিন গড়াতে লাগল, আর সে বুঝতে পারল, এটা কয়েক দিনের ব্যাপার নয়।
যে রান্নাঘরে এত বছর নিজের ইচ্ছে মতো রান্না করেছে, সেখানে এখন কিছু করতে গেলেও অনুমতি নিতে হয়।
একদিন মিশি এসে বলল,
"মা, আমাদের ঘরের পর্দা কে বদলে দিল?"
নিশি তখন খেয়াল করল, আলমারির জায়গাটাও বদলে গেছে। অভিকের বইগুলো আর আগের তাকে নেই।
কেউ তাকে কিছু জানায়নি।
একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো তার। মনে হলো, সে এই বাড়িতেই আছে, কিন্তু এই বাড়ির কেউ আর সে নয়।
কয়েক দিন পর বড় ভাশুর ডাকলেন।
টেবিলের ওপর কয়েকটা কাগজ রাখা।
"এখানে সই করে দাও।"
নিশি কাগজের দিকে তাকিয়ে বলল,
"কীসের কাগজ?"
"এত কিছু তোমার জানার দরকার নেই। বাড়ির ব্যাপার।"
নিশি কাগজটা আস্তে করে নামিয়ে রাখল।
"না জেনে আমি কোনো কাগজে সই করব না।"
সেদিন থেকেই সম্পর্কটা আর আগের মতো রইল না।
কথা কমে গেল। খাওয়ার সময় কেউ আর ডাকত না। মাঝে মাঝে এমনও হতো, নিশি আর তার দুই মেয়ে খেয়েছে কি না, সেটা কারও মনেই থাকত না।
মেঘ সব বুঝত। কিন্তু কিছু বলত না।
এক রাতে সে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
"মা... আমাদের কি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে?"
নিশি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে নিজেও জানত না, সামনে কী আছে।
অভিক বেঁচে থাকতে এসব নিয়ে কোনোদিন ভাবতে হয়নি। জমির কাগজ, নামজারি, উত্তরাধিকার, আইনের মারপ্যাঁচ, সব অভিকই সামলাত।
এখন সে বুঝল, কিছুই সে জানে না। আর না জানাটাই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
পরদিন সে অফিসে গেল না। সোজা গেল একজন নারী আইনজীবীর কাছে।
সেখানে বসে প্রথমবারের মতো সে জানল, আইন তাকে ফেলে দেয়নি।
আইনজীবী তাকে বুঝিয়ে বললেন, স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে স্ত্রী হিসেবে তার অধিকার আছে, দুই মেয়ের অধিকার আছে। কেউ চাইলেই কাগজে সই করিয়ে সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ, সব কাগজপত্র নিজের কাছে রাখতে হবে। কোনো কাগজ না পড়ে সই করা যাবে না।
বাড়ি ফিরে নিশি আর আগের মতো চুপ করে থাকল না।
সেদিন সন্ধ্যায় সবাই বসে ছিল। সে শান্ত গলায় বলল,
"আমি কারও সম্পত্তি নিতে চাই না। কিন্তু অভিকের স্ত্রী হিসেবে এবং মেঘ আর মিশির মা হিসেবে আমাদের যা প্রাপ্য, সেটা আমি ছেড়ে দেব না। এটা দয়া নয়, এটা আমাদের অধিকার।"
কিছুক্ষণ ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
তারপর শুরু হলো মনোমালিন্য। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিল। কেউ কথা বলা বন্ধ করে দিল। কেউ বলল, "শেষ পর্যন্ত টাকার জন্য?"
নিশি আর তর্ক করল না। সে আইনের পথেই হাঁটল। কাগজপত্র গুছিয়ে নিজের আর মেয়েদের নামে যা প্রাপ্য, তা বুঝে নিল। সে কারও সঙ্গে ঝগড়া করল না, শুধু নিজের অধিকার থেকে সরে দাঁড়াল না।
কয়েক মাস পর সে একটা ছোট বাসা ভাড়া নিল।
যেদিন বাড়ি ছাড়ছে, মিশি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
"মা, আমরা কি হেরে গেলাম?"
নিশি মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরল।
"না মা। হেরে গেলে আমরা মাথা নিচু করে অন্যায়টা মেনে নিতাম। আমরা হারিনি। আমরা নিজের মতো করে বাঁচতে বের হচ্ছি।"
নতুন বাসায় খুব বেশি কিছু ছিল না। একটা পুরোনো খাট, কয়েকটা চেয়ার আর দেয়ালে অভিকের হাসিমুখের ছবিটা।
কিন্তু অনেক দিন পর নিশির মনে হলো, এই ঘরে অন্তত কেউ তার অনুমতি ছাড়া আলমারির চাবি নেবে না। কেউ তার মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে না।
সেদিন সে বুঝেছিল, উত্তরাধিকার মানে শুধু জমি বা বাড়ি নয়।
আত্মসম্মানও এক ধরনের উত্তরাধিকার। সেটা একবার হারিয়ে ফেললে, আর কিছুই সত্যিকারের নিজের থাকে না।
চলবে.........গল্প-৪ : সন্তানের জন্য(একদিন পাশের বাড়ির একজন বললেন,
"দুই মেয়েকে এত পড়িয়ে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো বিয়েই দিতে হবে।")
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।