নিশির দিনগুলো
পর্ব - ১ : বিধবার সাদা শাড়ি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
স্বামী মারা যাওয়ার পর সবাই নিশির চোখের জল দেখেছিল। কিন্তু তার ভেতরে যে স্বপ্নগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল, তার খবর কেউ রাখেনি।
অভিক চলে যাওয়ার দিনটা নিশির কাছে আজও একটা দুঃস্বপ্ন। হাসপাতালের করিডরে ডাক্তার এসে শুধু বলেছিলেন, "আমরা আর পারলাম না।"
তারপর কী হয়েছিল, সবটা তার মনে নেই। শুধু মনে আছে, বাড়ি ফিরে দরজা খুলতেই চৌকাঠের পাশে রাখা অভিকের জোড়া স্যান্ডেলটা চোখে পড়েছিল। তখনই প্রথম বুঝেছিল, একজন মানুষ চলে গেলে শুধু একজন মানুষ হারায় না, একটা আস্ত পৃথিবী হারিয়ে যায়।
তখন বড় মেয়ে মেঘ ক্লাস সেভেনে পড়ে। ছোট মিশি পড়ে ক্লাস টু-তে। ওরা বুঝতে পেরেছিল, বাবা আর ফিরবে না। কিন্তু মৃত্যু শব্দটার ওজন ঠিক কতটা, তা বোঝার বয়স তখনও ওদের হয়নি।
প্রথম কয়েক দিন বাড়িটা মানুষে ভরা ছিল।
"নিশি, শক্ত হও।"
"মেয়েদের মুখের দিকে তাকাও।"
"অভিক খুব ভালো মানুষ ছিল।"
তারপর ধীরে ধীরে সবাই যে যার জীবনে ফিরে গেল। শুধু নিশির জীবনটাই আর আগের মতো রইল না।
সংসারের খরচ তো থেমে থাকে না। বাড়ি ভাড়া, বাজারের থলে, মেঘের স্কুলের বেতন, মিশির বই-খাতা, সব আগের মতোই থেকে গেল। শুধু মাস শেষে অভিকের হাতে করে বাজার নিয়ে ঘরে ফেরাটা বন্ধ হয়ে গেল।
একদিন রাতে খেতে বসে মিশি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
"মা, বাবা কি আকাশ থেকে আমাদের দেখতে পায়?"
নিশির হাত থেমে গেল। ভাতের থালায় আঙুলগুলো আটকে রইল। গলাটা শুকিয়ে এল।
সে হেসে বলল, "পায় তো মা। সব দেখতে পায়।"
সেদিন রাতে নিশির বালিশ ভিজে গিয়েছিল। কিন্তু মেয়েদের সামনে সে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি।
অভিকের রেখে যাওয়া সামান্য সঞ্চয় কয়েক মাসেই ফুরিয়ে গেল।
এক আত্মীয় একদিন এসে বললেন, "দুই মেয়ে নিয়ে এত স্বপ্ন দেখার কী আছে? যেমন করে পারো, বড় করে দাও।"
কথাটা কাঁটার মতো বিঁধে রইল নিশির বুকে।
সেদিনই সে আলমারির ভেতর থেকে নিজের পুরোনো সার্টিফিকেটগুলো বের করল। অভিক একদিন বলেছিল, "কোনোদিন যদি দরকার হয়, তুমি ঠিক পারবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখো।"
সেই একটা কথাই তাকে নতুন করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল।
চাকরি খুঁজতে গিয়ে কম অপমান সহ্য করতে হয়নি তাকে।
কোথাও শুনতে হয়েছে, "এতদিন তো সংসার সামলেছেন, এখন অফিসের কাজ পারবেন?"
আবার কোথাও তার যোগ্যতার চেয়ে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই প্রশ্ন বেশি হয়েছে।
প্রতিদিন ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরত। কিন্তু দরজা খুলেই হাসিমুখে বলত,
"মেঘ, তোর পড়া হলো?"
"মিশি, আজ স্কুলে কী শিখলি?"
সে চাইত না, মেয়েরা কোনোদিন বুঝুক, তাদের মা বাইরে সারাদিন কতটা লড়াই করে এসেছে।
অনেক চেষ্টার পর একটা ছোট প্রতিষ্ঠানে চাকরি হলো তার। বেতন খুব বেশি ছিল না। কিন্তু প্রথম মাসের টাকাটা হাতে নিয়ে মনে হলো, অভিক না থাকলেও সে সংসারের হাল ছেড়ে দেয়নি। সে পেরেছে।
তবু মানুষের কথা থামল না।
একবার ঈদের আগে মেঘ জোর করে মাকে একটা হালকা নীল শাড়ি কিনে দিল।
পাশের বাড়ির এক মহিলা সেটা দেখে বলে ফেললেন, "বিধবা মানুষের আবার রঙিন শাড়ি?"
নিশি সেদিন শুধু মৃদু হেসেছিল, কিছু বলেনি।
রাতে শাড়িটা ভাঁজ করতে করতে সে মনে মনে বলেছিল, "আমার শাড়ির রঙে যদি কারও আপত্তি থাকে, সে আপত্তি তার। আমার দুই মেয়ের মুখে হাসি থাকলেই আমার ঈদ হয়।"
এভাবেই বছর কেটে গেল।
একদিন মেঘ দৌড়ে এসে খবর দিল, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। কিছুদিন পর মিশিও বৃত্তি পেল।
সেদিন দুই মেয়েকে পাশে বসিয়ে নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। কোনো কথা বলতে পারছিল না।
গভীর রাতে সে অভিকের ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আস্তে করে বলল,
"দেখো অভিক, আমি কথা রেখেছি। মেঘ আর মিশিকে আমি কারও কাছে মাথা নত করতে দিইনি। তুমি না থাকলেও তোমার স্বপ্নগুলো আমি বাঁচিয়ে রেখেছি।"
ঘরটা তখন একেবারে নীরব।
তবু নিশির মনে হলো, অভিক যেন খুব কাছেই কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। আর মৃদু হেসে বলছে, "আমি জানতাম, তুমি পারবে।"
মানুষ আজও তাকে বিধবা বলে ডাকে।
কিন্তু মেঘ আর মিশির কাছে সে শুধু বিধবা নয়। সে তাদের মা। যে নিজের সব কান্না আড়াল করে দুই মেয়ের জন্য একটা নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছে।
তাই সাদা শাড়ি তার পরিচয় নয়।
তার আসল পরিচয়, দুই মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে হার না মানা এক মায়ের গল্প।
চলবে......গল্প-২ : দ্বিতীয় বিয়ের প্রশ্ন(আসল প্রশ্ন হলো, একজন বিধবা নারী নিজের জীবন নিয়ে যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, আমরা কি সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে পারি?)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।