নিশির দিনগুলো
গল্প-৫ : মানুষের দৃষ্টি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
স্বামী মারা যাওয়ার পর তার পোশাক বদলায়নি, বদলে গেছে মানুষের চোখ।
অভিক চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস নিশি খুব একটা বাইরে বের হতো না।
কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তো সংসার চলে না। চাকরি আছে, বাজার আছে, মেঘ আর মিশির পড়াশোনার খরচ আছে। তাই একদিন আবার আগের মতো বাসে চড়ে অফিসে যাওয়া শুরু করল।
প্রথম কয়েক দিনেই সে বুঝে গেল, সবকিছু আর আগের মতো নেই।
আগে যারা হাসিমুখে কথা বলত, তাদের অনেকেই এখন এমনভাবে তাকায় যেন তাকে নতুন করে চিনছে।
একদিন বাসে দেখল, অনেক সিট খালি পড়ে আছে। তবু একজন এসে ঠিক তার পাশেই বসল। অকারণে কথা বলার চেষ্টা করল।
নিশি জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল।
অফিস থেকে কোনোদিন একটু দেরি করে ফিরলে গলির মুখে কারও না কারও প্রশ্ন তৈরি থাকত।
"আজ এত দেরি হলো?"
কথাটা শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু নিশি বুঝত, প্রশ্নটা সময় নিয়ে নয়। প্রশ্নটা তাকে নিয়েই।
একদিন বাজারে মাছ কিনছিল। পেছনে দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন।
"ওই যে, অভিকের বউ না?"
"হ্যাঁ। এখন চাকরি করে শুনেছি।"
আরেকজন নিচু গলায় বললেন, "আগের চেয়ে বেশ গুছিয়ে চলাফেরা করছে।"
নিশি শুনতে পেয়েছিল। শুনেও মাথা তুলল না।
বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে অনেকক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে ছিল। সাধারণ একটা সুতির শাড়ি। চুল খোঁপা করা। মুখে একটু পাউডারও নেই। তবু এত কথা!
এরপর থেকে সে আরও সাবধানে চলতে শুরু করল।
অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে ধরত না। খুব প্রয়োজন ছাড়া কোথাও যেত না। কারও সঙ্গে অকারণে বেশি কথা বলত না।
এসব সে নিজের ইচ্ছায় করেনি। পরিস্থিতি তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল।
একদিন অফিসে একটা ঘটনা ঘটল।
এক সহকর্মী হেসে বললেন, "আপনি তো একা থাকেন। একদিন বাইরে বসে একটু গল্প করলে ক্ষতি কী?"
নিশি খুব ভদ্রভাবে, কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল,
"অফিসের কাজ অফিসেই শেষ করতে চাই। অফিসের বাইরে আমার কোনো আলোচনা নেই।"
এর বেশি কিছু সে বলেনি। কিন্তু সারাদিন কথাটা মাথা থেকে নামেনি।
রাতে বাড়ি ফিরে চুপচাপ বসে ছিল।
মেঘ এসে জিজ্ঞেস করল,
"মা, মন খারাপ?"
নিশি একটু চুপ করে থেকে বলল,
"একটা কথা মনে রাখিস। কেউ যদি ভাবে, তুই একা বলে তোকে যা খুশি বলা যায়, তখন চুপ করে থাকবি না। নিজের সম্মান নিজেকেই রক্ষা করতে হয়। কেউ এসে রক্ষা করে দিয়ে যাবে না।"
মেঘ কিছু বলল না। শুধু মায়ের হাতটা ধরে বসে রইল। পাশে বসে থাকা মিশিও চুপ করে ছিল।
হয়তো ওরা পুরোটা বুঝতে পারেনি। কিন্তু মায়ের মুখের ক্লান্তিটা ঠিকই বুঝেছিল।
সময়ের সঙ্গে নিশি এই দৃষ্টিগুলোর সঙ্গে চলতে শিখে গেল।
সে তিনটে নিয়ম নিজের জন্য তৈরি করে নিল।
এক, কাজের বাইরে কারও কাছে কোনো কৈফিয়ত দেবে না। দুই, অপ্রয়োজনীয় কথায় হাসিমুখে না বলে দেবে। তিন, কোনো ইঙ্গিত বা বাজে কথা শুনলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করবে, সে অফিস হোক বা পাড়া।
মানুষের কথা থামেনি। কৌতূহলও কমেনি।
তবে একটা জিনিস বদলে গিয়েছিল।
আগে এসব শুনে সে কষ্ট পেত। এখন আর নিজের মূল্য মানুষের কথায় মাপে না।
অভিক মারা যাওয়ার পর নিশির জীবন বদলেছিল। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি বদলে গিয়েছিল মানুষের দৃষ্টি।
সেই দৃষ্টির সঙ্গেই তাকে প্রতিদিন পথ চলতে হয়েছে।
আর চলতে চলতেই সে বুঝে গেছে, একজন নারীকে দুর্বল করে না তার একাকীত্ব। দুর্বল করে সেই সমাজ, যে তাকে মানুষ হিসেবে দেখার আগে তার পরিচয়ের বিচার করতে বসে।
চলবে.........গল্প-৬ : চাকরির দরজা (নিশির ইচ্ছে করছিল বলে, "এত বছর একা হাতে সংসারের চাপ সামলেছি, অফিস কি তার চেয়েও কঠিন?")
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।