সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-২
বারোটার ফোন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯, জুলাই, ২০২৬
রাত ঠিক বারোটা।
ফোনের শব্দে অভিকের ঘুম ভেঙে গেল।
এত রাতে ফোন আসা নতুন কিছু নয়, কিন্তু স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে তার হাত থেমে গেল।
রিয়াদ।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ফোনটা ভুল দেখাচ্ছে।
আবার তাকাল।
না, ভুল নয়।
এই নামটা সে শেষ দেখেছিল পাঁচ বছর আগে।
রিয়াদ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার দিন।
সেদিন হাসপাতালেও ছিল অভিক। জানাজায়ও। কবর দেওয়ার সময় শেষ মুঠো মাটিটাও সে ফেলেছিল।
তবু আজ, রাত বারোটায়, ফোন করছে রিয়াদ।
অভিক ধীরে ধীরে কলটা রিসিভ করল।
— হ্যালো...
ওপাশে কোনো কথা নেই।
শুধু যেন খুব আস্তে কেউ শ্বাস নিচ্ছে।
কয়েক সেকেন্ড পর লাইন কেটে গেল।
ফোনটা হাতে নিয়েই বসে রইল অভিক।
কিছুক্ষণ পর নিজের অজান্তেই কল-লগ খুলে দেখল।
নম্বরটাও ঠিক রিয়াদেরটাই।
পরের রাতেও একই সময়ে ফোন এল।
তার পরের রাতেও।
প্রতিবার একই ঘটনা।
কল ধরলে নীরবতা।
তারপর লাইন কেটে যায়।
চতুর্থ দিন অফিসে বসে একটা হিসাব তিনবার মিলিয়েও ভুল করল।
বস অবাক হয়ে বললেন,
— সব ঠিক আছে তো?
অভিক শুধু মাথা নাড়ল।
আসলে কিছুই ঠিক ছিল না।
বাড়ি ফিরে নিশি বুঝে গেল।
খাবারের প্লেট সামনে রেখেও অভিক চুপচাপ বসে আছে।
— কী হয়েছে?
প্রথমে এড়িয়ে গেল।
তারপর একসময় সব বলল।
নিশি মন দিয়ে শুনল।
কোনো মন্তব্য করল না।
শুধু বলল,
— নম্বরটা এখন কার নামে আছে, সেটা জানা যায় না?
পরদিন খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রিয়াদের মৃত্যুর দুই বছর পর নম্বরটা আবার চালু হয়েছে।
অন্য একজনের নামে।
তবু প্রশ্নটা থেকে গেল।
ঠিক রাত বারোটায় কেন?
আর ফোন ধরলে মানুষটা চুপ করে থাকে কেন?
নিশিই বলল,
— চল, মানুষটার সঙ্গে দেখা করি।
দুই দিন পর তারা শহরের পুরোনো এক মহল্লায় পৌঁছাল।
ছোট্ট একতলা বাড়ি।
দরজা খুললেন এক বৃদ্ধ।
অভিক নম্বরটার কথা বলতেই তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— ভেতরে আসো।
ঘরে ঢুকেই অভিকের চোখ পড়ল দেয়ালে টাঙানো একটা ছবিতে।
রিয়াদ।
একই হাসি।
একই চোখ।
বৃদ্ধ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ও আমার ছেলে।
কথাটা বলার সময় তাঁর গলায় কোনো নাটকীয়তা ছিল না।
শুধু ক্লান্তি।
অভিক আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,
— এই নম্বরটা... এখনো রাখছেন?
বৃদ্ধ হালকা মাথা নাড়লেন।
— পারিনি ছাড়তে।
অনেকেই বলেছে নতুন নম্বর নিতে। মনে হয়েছে, এটা ছেড়ে দিলে ছেলের শেষ চিহ্নটাও হারিয়ে যাবে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি আবার বললেন,
— মাঝে মাঝে ওর বন্ধুদের ফোন করি।
কিন্তু কথা বলতে পারি না।
জানি না কী বলব।
শুধু জানতে ইচ্ছে করে... কেউ কি এখনো ওকে মনে রেখেছে?
অভিকের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল।
বৃদ্ধ মানুষটা জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ধীরে ধীরে বললেন,
— শেষ কয়েক দিন ছেলেটা খুব অস্থির ছিল। বারবার বলছিল, সবকিছু ঠিকঠাক লাগছে না। তারপর এক রাতে খবর এল—দুর্ঘটনা।
এরপর আর কিছুই প্রমাণ করতে পারিনি।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
নিশি চুপচাপ বসে ছিল।
তার মনে হলো, এই মানুষটা এত বছর ধরে উত্তর খুঁজছেন না।
তিনি শুধু এমন কাউকে খুঁজছেন, যে এখনো রিয়াদের নাম শুনে থেমে যাবে।
ফিরে আসার পথে গাড়িতে কেউ কথা বলছিল না।
অনেকটা পথ পেরিয়ে নিশি বলল,
— শোকটা বোধহয় সবচেয়ে ভারী হয়, যখন সেটা কাউকে বলা যায় না।
অভিক জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
মনে হচ্ছিল, পাঁচ বছর আগে রিয়াদকে নয়, তার চারপাশের মানুষগুলোকেও যেন সবাই একটু একটু করে হারিয়ে ফেলেছিল।
সেদিন রাতেও ঘড়িতে বারোটা বাজল।
ফোন আর এল না।
অভিক নিজেই নম্বরটা ডায়াল করল।
ওপাশ থেকে বৃদ্ধ মানুষটার গলা ভেসে এল।
— হ্যালো...
অভিক আস্তে বলল,
— চাচা, আমি অভিক।
আপনি যদি কখনো কথা বলতে চান... ফোন করবেন।
আমি ধরব।
ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ ছিল না।
তারপর খুব চাপা একটা কান্না।
অভিক ফোনটা কানে ধরে রইল।
সেদিন সে বুঝেছিল, সব নীরবতার পেছনে রহস্য থাকে না।
কিছু নীরবতার ভেতরে শুধু একজন বাবার না-বলা কথাগুলো জমে থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।