একটা বিয়ের গল্প
লেখা ঃ আল-মামুন রেজা
এক.
মনে আছে এখনো, কয়েকমাস আগের কথা। বিয়ের প্রস্তাব শুনে অবাক হই। অবাক হয়েছিলাম তিনটি কারণে। প্রথম কারণ' আমি এখনো স্টুডেন্ট। দ্বিতীয় কারণ' আমি বেকার। তৃতীয় কারণ, মেয়ে আমার থেকে বয়সে ২ বছরের জুনিয়র হলেও এডুকেশন দিক থেকে এক বছরের সিনিয়র।
.
আমার মতো এমন কাউকে সুস্থ মস্তিষ্কের কারো বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর কথা না। তবে, বিয়ে পড়িয়ে রেখে ছেলে ছেলের বাসায় থাকবে, মেয়ে মেয়ের বাসায় থাকবে। ছেলে পড়ালেখার পাশাপাশি ছোট কিছু কর্ম করে প্রতিষ্ঠিত হলে মেয়েকে নিয়ে সংসার করবে। এই প্রস্তাবটা বেশ মনে ধরেছিল। সেজন্য প্রস্তাব ফেলতে সাহস পেলাম না। খুব কাছের কিছু ভাইদের সাথে, অভিজ্ঞ কিছু অলেমদের সাথে আলোচনা করলাম, ইস্তেখারা করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম। মেয়ের পরিবারের সাথে সরাসরি আমি নিজে কথা বলবো। পারিবারিকভাবে মেয়েকে দেখবো।
দুই.
মেয়ের ফ্যামিলির সাথে কথা বলার জন্য সেদিন সন্ধ্যায়, সাদা একটা পাঞ্জাবী আর খালি হাতে বাসা থেকে বেরিয়েছিলাম। কিছুদিন আগে থেকেই হৃদয়ে গেথে নিয়েছিলাম সূরা ফুরকানের ৭৪ নাম্বার আয়াত। সেদিনও কন্টিনিউয়াস দুরূদ আর সুরা ফুরকানের (২৫:৭৪) “রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিইয়াতিনা” দুয়াটা পড়ছিলাম।
.
আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ সহজ করেছিলেন।
.
কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য বিয়ের কথা শুনলেই সমাজের মানুষ, আত্নীয় স্বজনের রিয়েকশান আর কথা দেখে ভড়কে গেলাম। বিয়ে আর বিছানা যেনো একই ব্যাপার। দায়িত্বের ভয় নাই, বন্ধনের কথা নাই, স্রষ্টার যোগ নাই। খালি টাকা, চামড়া, বিছানা আর খানার গল্প। শুনে মনে হয় বিয়ে মানেই সমাজের চোখে একটা পতিতালয় কেন্দ্রিক হোটেলের নাম!
.
সবসময় একটা চিন্তার সাথে সাংর্ঘষিক ছিলাম। বিশ্বাস করুন পুরো সমাজ ও যদি আমায় ঘেন্না করলেও আমার স্রষ্টা, আমার প্রতিপালক আমাকে ফেলে দিবেন না। অনেক আঁধার পেরিয়ে তাঁর দিকে ফিরে এসেছি এই পবিএ পথেই নিজের সব দিয়ে থাকার চেষ্টা করবো (ইন শা আল্লাহ) সন্তুষ্ট হয়ে। ইসলাম আমাদের সম্পদ সামাজিক সন্ত্রাসের না।
দুই দশমিক পাঁচ.
বিয়ের জন্য তখনও পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। বিয়ে আর সঙ্গীর হক্ব সংক্রান্ত আয়াত আর হাদীসগুলো পড়ে, বই পড়ে, লেকচার শুনে গভীর এক ভাবনায় ডুবে হারিয়ে যাইতাম। কিন্তু সবসময় মাথায় ছিল যে! ফ্যান্টাসির ছেলেমানুষী রঙিন চশমাটা টাশ-টাশ করে ফেটে ভেঙে যায় জ্ঞানের আঘাতে, সম্ভাব্য হক্ব নষ্টের জুলুমের ভারী ভারী সব পাপের ভয়ে (উভয়ার্থে)।
.
পড়ে ভেবে জেনে বুঝে আত্মস্থ করে নেয়ার পরে, নিজেকে শুধু আল্লাহর জন্য গড়ে নিতে আরেকবার নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করি। সমান্য জ্ঞান আর বুঝের কারণে আশার পাশাপাশি ভয়ের ডানাটাও জুড়ে থাকে এই নতুন যাত্রায়। দুই ডানায় ভর আর ব্যালেন্স করেই শুরু হয় আল্লাহর দিকে দাসত্বের এই পবিত্র যাত্রাটা, জীবনে প্রথমবারের মত।
এক ডানায় কি ওড়া যায় কখনো?
বিয়ে হচ্ছে একটা নিয়ামত। ফলে, প্রতিটা নিয়ামতের মতই এটাও একটা পরীক্ষা। আর পরীক্ষা মানেইতো পাশ করে রাব্বে কারীমের সন্তুষ্টি আর নৈকট্য অর্জনের অপূর্ব সুযোগ। পরীক্ষায় যত ভালভাবে পাশ করা যাবে , তত বেশি আল্লাহর সন্তুষ্টি আর তত বেশি নৈকট্য পাওয়া যাবে। ইন শা আল্লাহ।
তিন.
আলহামদুলিল্লাহ! সব খাদ, সব বাধা পেরিয়ে আল্লাহর রহমতে সুন্নাতি নিয়মে বিবাহ সম্পন্ন হয়। কিন্তু এতে বেশিরভাগ আত্নীয় স্বজনের মন খারাপ। কারণ' আমি স্টুডেন্ট, আমি বেকার, সবে তো একুশ। এই বয়সে বিয়ের মতো একটা কাজে পা দিলাম। অনেকে ছেঃ ছেঃ করতে শুরু করলো।
.
বাহ! টাকা অর্জনের ভিওিতে আমাদের জীবন আর সন্মানের মাপকাঠি নির্ধারণ করে নিয়েছি। আল্লাহ কি বুঝেন না? দেখেন না? এইগুলোর জন্য কি জিজ্ঞাসা করবেন না? সেই জিজ্ঞাসাবাদে দিন আর বেশি দূরে নেই। কাছে খুব কাছে।
.
দ্বীন-চরিএ দেখে হাতে হাত রাখারা ক্যালকুলেশন কয়জন করে বলুনতো? হাত, পেট-মাথা, কানতো ওই গরু ছাগল আর কুত্তা শুয়ারের ও আছে ওইগুলো দিয়ে কি মানুষ হওয়া যায়?
.
হায়! বাঁচতে কয়টাকা লাগে? খুব সামান্য। বাঁচতে কাড়ি কাড়ি টাকা লাগে না। মনুষ্যত্ব লাগে৷ সেইটা বাদ দিয়ে কিসের জিন্দেগী ধারন করতে চাই? পশুর? ভোগের?
.
আমি জানি, টাকার চাহিদার কোন পরিসীমা নেই। হালালভাবে, আল্লাহর অবাধ্য না হয়ে খুব অল্প কিছু টাকা জান্নাতে পৌছে দিবে। ইং শা আল্লাহ।
.
বিয়ের পর থেকেই একটি হালাল চাকুরী খুঁজতে শুরু করলাম বেশ কিছুদিন ধরে।
.
"ইয়া রব, আমাকে একটি ইনকাম সোর্সের ব্যবস্থা করে দিন"
.
প্রচুর দো'আ চললো। শাওয়াল পেরিয়ে জ্বিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন চোখ জোড়া দিয়ে পানি পড়লো। আল্লাহ তখন ও দিলেন না। সবর করালেন, কাঁদালেন। আরো কাছে টানলেন।
.
আলহামদুলিল্লাহ। অশ্রু ভেজানো চোখ জোড়া জানান দিচ্ছিলো সবসময় (সূরাঃ আল ইমরানের ৫৪ নাম্বার আয়াত) "আল্লাহ উওম পরিকল্পনাকারী।"
.
আলহামদুলিল্লাহ, বিয়ের এই ৩ মাসের মাথায় খুব সুন্দরভাবে, গুছিয়ে, সাজিয়ে, মিলিয়ে সবরের উপহার দিলেন। খুব সন্মানিত একটি হালাল জব। (পড়াশুনার পাশাপাশি পার্ট টাইম)
.
আলহামদুলিল্লাহ, আমার এই কষ্ট প্রার্থনাসহ জগতের বাইরে পাঠিয়ে দিতে জায়নামাজই যথেষ্ট ছিলো। যথাসময়ে সেই প্রার্থনার উত্তর পয়েছি।
.
কোন সন্দেহ নেই, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোওম রিজ্বিকদাতা, সর্বোৎকৃষ্ট পরিকল্পনাকরী।
তিন দশমিক পাঁচ.
শাওয়াল মাসে সুন্নাতি নিয়মে বিয়ে পড়ে রাখা হয়। ঠিক ৪ মাস পরে ১৫ সফর আবারও সুন্নাতি নিয়মেই আত্নীয় স্বজন মিলে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেয়েটা সংসারে আসে জ্যোৎস্না হয়ে।
.
দুজনের মধ্যে ছিল না কোন হারাম রিলেশনশিপ। দুজনই স্টুডেন্ট। পারিবারিকভাবে ও পূর্বসম্পর্কিত নয়। সর্বোপরি দ্বীনের প্রতি কমিটমেন্ট পবিএ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিল।
চার.
আমার পরিবার সঠিকভাবে দ্বীন বোঝে না। কোনভাবেই প্রাক্টিসিং পরিবার বলা যাবে না। তাই একজন প্রাক্টিসিং মুসলিম মেয়েকে পরিপূর্ণভাবে বিয়ের অনুষ্ঠানে পর্দাতে রাখাটা আমার জন্য চেলেঞ্জের বিষয় ছিলো রীতিমতো। চেলেঞ্জটা বহু দিক থেকে- আত্নীয়স্বজনদের টিঁটকারী, কথাকানাকানি, নিজের পরিবারের মানুষগুলোর বিরুপ মনোভাব সব কিছু সামলানোটা যে কতটা দুরুহ তা ভালোমতোনই টের পেয়েছি।
.
আবার, আমি জেনারেল পড়ুয়া স্টুডেন্ট হয়ে হুজুর হয়ে গেছি, বেশি বুঝি, বাড়াবাড়ি করি।
.
আলহামদুলিল্লাহ! মানুষগুলোর হেদায়েতের জন্য দুয়া করি। আপনার-আমার ঘেন্নায় তাদের কিচ্ছুটা ক্ষতি হয় না, হবে না। ক্ষতিটা আমার। ভালো থাকুক আমার সমাজ।
আমি ভালোভাবেই জানি, দুনিয়ার জীবনটা কষ্টের। দুনিয়ার জীবনটা অনেক কষ্টের। দুনিয়ার জীবনটা খুবই খুবই কষ্টের। এখানে শান্তি পাবো না। এটা পরীক্ষার হল, জান্নাত না। এখানে আমি একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে হাসতে চাইলে কিভাবে হবে? হবে না। পুরো পরীক্ষা ভালো ভাবে শেষ করতে হবে। আল্লাহর নাম নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে হবে। পরীক্ষা দিতেই হবে।
.
তাই দ্বীনের ব্যাপারে কোন আপোষ করা যাবে না। বিন্দু পরিমাণ কোন ছাড় খোঁজা যাবে না। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন, আমিন।
পাচ.
বিয়েটা হয়ছিল একদম সাদামাটা পরিবেশে। বিয়ে বাড়িতে কোন গেইট ছিল না, বাড়ির রাস্তায় ছিল না বাতির ঝিলিমিলি। ছিল না কোন ফটোগ্রাফি, ভিডিও,গায়ে হলুদ, ডিজে-ডান্স, সাউন্ড সিস্টেম।
.
বিয়েতে ছিল না কোন দামি ব্রান্ডের শাড়ী। আমার আহলিয়া উনি সাধারণ দিনের মতোই কালো বোরকা, কালো হিজাব, কালো নিকাব পড়েছিলেন। আর, দেন মোহর হিসাবে ছিল কিছু টাকা আর সোয়া দুই পারা কোরআন মুখস্ত।
.
সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো। হ্যা' তারা দুজন আজ একসাথে এক ছাদের নিচে। সব কিছু ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। মনে নেই কোন সংকোচ, নেই কোনও উদ্বিগ্নতা।
আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! ইয়েস, এইরকমভাবে সারপ্রাইজগুলো দিয়ে কাঁদানো আমার লালনে-পালনেওয়ালা রব্বের পক্ষেই সম্ভব।
কথাগুলো শেয়ার করলাম যাতে মানুষের মনে এটাও থাকে যে স্টুডেন্ট অবস্থায় বিয়ে করা যায়, সুন্নাতি নিয়মে এই যুগে বিয়ে করার মানসিকতা তৈরি করা যায়। যেন অন্যরাও ইন্সপায়ার হয়।
সমাজের চশমা পাল্টিয়ে, আল্লাহর রহমতে সবাইকে মানিয়ে ইসলামি রীতি মেনে বিয়ে করতে পারেন। এটার জন্য চাই আপনার এবং আপনার জীবন সাথীর আপ্রাণ চেষ্টা ও ইচ্ছা।
সমাপ্ত
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।