শিরোনাম: আদর্শের আলোয় আরিফ।
লেখক: আল-মামুন রেজা
গ্রামের নাম ছিল স্বপ্নপুর। সেই গ্রামেরই এক সাধারণ মধ্যবৃত্ত ঘরে জন্ম নেয় আরিফ। ছোটবেলা থেকেই আরিফ ছিল এক অদ্ভুত শান্ত স্বভাবের ছেলে।সে সর্বদা দুষ্টামি,অভদ্রতা,অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে এড়িয়ে চলতো।তার মধ্যে পারিবারিক সু শিক্ষা লক্ষ্য করা যেত।কখনো কারো মনে কষ্ট দেয়নি।কারো সাথে খারাপ আচরন করতে দেখা যায়নি। ছোটবেলা থেকে মা বাবা তাকে একটায় শিক্ষা দিয়েছে “মানুষ হতে হলে আগে ভালো মানুষ হতে হবে।সৎ পথেই আসল সফলতা"
আরিফ ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা ছিল। সাধারণ সহজ সরল ছিল তার চলাফেরা। তাঁর চোখে ছিল আত্মসম্মান, মুখে লেগে থাকতো সর্বদা কোমল মুগ্ধতাভরা হাঁসি। সহপাঠীরা কখনো কখনো তার সরলতা নিয়ে ঠাট্টা হাঁসি তামাশা করত, তবুও সে কখনো রাগ করত না। বরং মৃদু হেঁসে বলতো-
“নয়তো আমি তোমাদের মতো
নয়তো বেশি দামি-
আমি হলাম খুব সাধারণ,
আমার মতোই আমি!"
তাঁর কথা শুনে সবাই মাঝে মাঝে অবাক হতো।কেউ কেউ পরোক্ষনে তাকে অনুকরন করার চেষ্টা করত।নিজেদের ভুল বুঝতে পারতো।
স্কুলে সে ছিল খুবই ভদ্র। কোনো কিছু না বুঝলে বিনয়ের সাথে বলত,
“স্যার, আমি কি আরেকবার বুঝতে পারি?”
তার এই বিনয়ী আচরণে শিক্ষকরাও মুগ্ধ হতেন।
শিক্ষক শিক্ষিকারাও সর্বদা তাঁর প্রশংসা করতেন।
একদিন স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে কাঁচা রাস্তার পাশে একটি মানিব্যাগ দেখতে পেল আরিফ। মানি ব্যাগটি হাতে নিয়ে খুলে দেখে—ভেতরে অনেকগুলো টাকা। তার চোখে হঠাৎ মায়ের ক্লান্ত মুখটা ভেসে উঠল, বাবার ঘামে ভেজা শার্টটা মনে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য তার মন কেঁপে উঠল মনের মধ্যে হল—
“এই টাকা দিয়ে তো আমাদের অনেক কষ্ট দূর হতে পারে...”
কিন্তু পরক্ষণেই সে উপলব্ধি করল এবং মাথা নাড়িয়ে বলল,
“নাহ, এটা আমার নয়। অন্যের কষ্টের টাকা যার ওপর সুখ গড়া ঠিক না।”
পেছন থেকে আরো কয়েকজন বন্ধু ছুটে গেল-তাঁরা আরিফকে বললো "চল সবাই মিলে টাকাগুলো ভাগ করে নেই। অনেক খেলার জিনিস ও মজার খাবার কিনতে পারব।আরিফ শান্তভাবে বললো " না,এটা আমাদের না।যাঁর জিনিস তাকে ফেরত দেওয়া আমাদের কর্তব্য।
এটা শুনে বাকীদের আশা জলে গেল।
সে মানিব্যাগের মধ্যে একটি পরিচয়পত্র দেখতে পেল।ঠিকানা অনুযায়ী অনেক খোঁজাখুঁজির পর মানিব্যাগের মালিকের বাড়িতে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বলল,
“চাচা, আপনার কি কিছু হারিয়েছে?”
লোকটি অবাক হয়ে জবাব দিল-হ্যাঁ বাবা। গত একদিন আগে আমার একটি টাকা ভর্তি মানিব্যাগ হারিয়ে গেছে।কিন্তু তোমরা কারা বাবা..?
আরিফ মানিব্যাগ টি এগিয়ে দিয়ে বললো "চাচা দেখুনতো এটা আপনার কিনা?
লোকটি অবাক হয়ে মানিব্যাগ নিয়ে দেখলেন—সব কিছু ঠিক আছে। তার চোখে জল চলে এলো। তিনি বললেন,“বাবা, তুমি জানো না, এই টাকাটা আমার মেয়ের চিকিৎসার জন্য ছিল।”টাকাটা হারিয়ে আমি একদম ভেঙে পড়েছিলাম যে" আমার মেয়ের চিকিৎসা টা কি হবেই না!
লোকটি কান্না ভেজা চোখে বললেন, “এমন সৎ ছেলে আজকাল খুব কম দেখা যায়!
আরিফ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল,আপনার জিনিস আপনার নিকট পৌঁছে দিতে পেরে আমিও আনন্দিত।
“আমি শুধু আমার দায়িত্বটুকু পালন করেছি।”লোকটির নিকট দো'আ চেয়ে আরিফ বাড়ি ফিরল।
সেদিন বাড়ি ফিরে তাঁর মা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। বললেন,
“আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু আমাদের ছেলে বড় মনের মানুষ।”
আরিফ শুধু মায়ের কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে রইল। তার মনে এক অদ্ভুত শান্তি—যেন সে নিজের কাছেই জিতে গেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরিফ বড় হতে লাগল। কিন্তু তার ভদ্রতা, নম্রতা আর সততা একটুও বদলায়নি। সে সবসময় নিচু স্বরে কথা বলত, কাউকে কষ্ট দিত না। প্রতিবেশীদের সম্মান করতো,ছোটদের স্নেহ করতো,এছাড়া তাঁকে বিভিন্ন সময় সামাজিক কল্যানমূলক কর্মকান্ড, গরীব অসহায় মানুষদের সাহয্য সহযোগিতা ইত্যাদি কাজ করতে দেখা যেত।গ্রামের বৃদ্ধরা বলতেন,
“এই ছেলেটা একদিন বড় মানুষ হবে—তার চরিত্রই তার আসল শক্তি।”
আরিফ ছোট থেকেই নিয়মিত নামাজ পড়তো,নৈতিক শিক্ষা ও ইবাদতের ব্যাপারেও তাঁর ছিল অসীম আগ্রহ।
একদিন মসজিদের ইমাম সাহেব তাকে ডাকলেন। বললেন,
“আরিফ, দুনিয়ায় অনেক শিক্ষিত মানুষ আছে, কিন্তু চরিত্রবান মানুষ খুব কম। তুমি সেই কম মানুষের একজন হওয়ার পথে আছো।তুমি শুধু পড়াশোনায় নয়, চরিত্রেও সেরা। মনে রেখো, ভালো মানুষ হওয়াটাই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।”
এই কথাগুলো আরিফের হৃদয়ে গেঁথে যায়। সে বুঝে নেয়—জীবনে বড় হওয়া মানে শুধু ধনী হওয়া নয়, বরং একজন আদর্শ মানুষ হওয়া।
এই কথাগুলো তার হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দিল। সে বুঝল—মানুষের আসল মূল্য তার পোশাকে নয়, তার আচরণে; তার টাকায় নয়, তার সততায়।
মূলভাব:
আরিফের জীবন আমাদের শেখায়—অভাব মানুষের চরিত্রকে ছোট করে না, বরং সৎ শিক্ষা ও সুন্দর আচরণ তাকে বড় করে তোলে। নম্রতা, ভদ্রতা আর আদর্শিক গুণাবলিই একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে মহৎ করে তোলে।
তাং-১৪/০৪/২৬
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।