"দাদুর চোখে ১৯৭১" এক রক্তস্নাত স্বপ্নের গল্প।
লেখক: আল-মামুন রেজা
--------------------------------
বিকেলের নরম আলোটা যেন উঠোনে মেখে আছে। আমগাছের পাতায় পাতায় বাতাসের হালকা দোলা। আমি ও আমরা সমবয়সী ভাই বোনেরা মিলে দাদুর পায়ের কাছে বসে আছি। দাদু তার চশমা খুলে কোলের ওপর রাখলেন। চোখে এমন এক গভীরতা—যেন অনেক বছর ধরে লুকিয়ে থাকা গল্পের দরজা খুলে যাচ্ছে।
দাদু একটা দীর্ঘ শ্বাস নিলেন।
“শোনো বাবারা… ১৯৭১ কোনো সাধারণ বছর ছিল না। সেটা ছিল বেঁচে থাকার পরীক্ষা, সাহসের মন্ত্র, স্বাধীনতার জন্মবেদনা।”
তখন দাদুর বয়স মাত্র সতেরো। বললেন—
“সেই সময় আমাদের গ্রামে ভয় যেন নিঃশ্বাসের মতো প্রাকৃতিক হয়ে গিয়েছিল। রাতের আকাশে জোনাকি জ্বলত ঠিকই, কিন্তু মানুষের ঘরে আলো জ্বলত খুব কম। ভয় ছিল হানাদারের ট্রাকের শব্দে। ভয় ছিল গুলির প্রতিধ্বনিতে।”
স্কুলশিক্ষক রফিক স্যার গ্রামের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। তার কণ্ঠস্বর ছিল আশার মতো উজ্জ্বল। তিনি প্রায়ই বলতেন—
“স্বাধীনতা মানে মাথা উঁচু করে বাঁচা। সেই স্বাধীনতার জন্য ভয় পাওয়া চলে না।”
তরুণরা রাতের অন্ধকারে গোপনে জড়ো হতো। বাঁশঝাড়ে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে যেন তারা শপথ করত—
“জয় বাঙালির জয়।”
একদিন এক ভয়াবহ ভোরে গুলির শব্দে পুরো গ্রাম কেঁপে উঠল। কেউ বলল—হানাদার বাহিনী এসেছে। কেউ বলল—আগুন ধরিয়েছে। দাদু বললেন—
“সেদিন আকাশটা ধোঁয়ায় ঢাকা ছিল। মনে হচ্ছিল আকাশও কাঁদছে। মানুষ ছুটছে, বাচ্চারা কাঁদছে, আর আমরা তরুণরা প্রাণপণে সবাইকে নিরাপদে পাঠানোর চেষ্টা করছিলাম।”
দাদু ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে নদীর ওপারের চরে পৌঁছে দিতেন। কিন্তু তার মন পড়ে থাকত ঘরে—মায়ের কাছে, ছোট বোনের কাছে।
সেদিন গ্রামের অনেকেই নিখোঁজ হয়েছিল। বাড়িঘর পুড়ে গিয়েছিল। দাদু বললেন—
“আমি তোমাকে ভয়াবহ দৃশ্য বলব না—কারণ যুদ্ধের কষ্ট বর্ণনায় নয়, বোঝায়। শুধু মনে রাখবে—যুদ্ধ মানুষকে কাঁদায়, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তিও জাগায়।”
গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া মানুষদের আশ্রয় দিত মুক্তিযোদ্ধারা। দাদু নিজ চোখে দেখেছেন—“অল্প কাপড়, অল্প খাবার, ভাঙা অস্ত্র—কিছুই তাদের মন ভাঙতে পারেনি। তাদের চোখে আমি স্বাধীনতার আগুন দেখেছিলাম।”
এক রাতে মুক্তিযোদ্ধারা এসে রফিক স্যারকে বললেন, পরিকল্পনা হবে নতুন করে। দাদুও যাবেন তাদের সঙ্গে।
মা কাঁপা গলায় বলেছিলেন—“বাবা, বেঁচে ফিরলে ভালো। না ফিরলে জানব দেশকে দিয়েছিস। তাতে আমি কাঁদব ঠিকই, কিন্তু আফসোস করব না।”
দাদু বলার সময় থামলেন। কণ্ঠটা ভারী কিন্তু চোখে শান্তির আলো।
ক্যাম্পের দিনগুলো ছিল কষ্টে ভরা, কিন্তু মন ভরা স্বপ্নে। তরুণরা কাঁদত না, অভিযোগ করত না—কারণ তাদের হৃদয়ে বাজত স্বাধীনতার সুর।
দাদু বললেন—“যখন আমাদের হাতে লাল-সবুজ মানচিত্র আঁকা পতাকা দেওয়া হতো, মনে হতো আমি পুরো পৃথিবীকে ধরে আছি।”
রাতে দূর থেকে ভেসে আসত দেশের গান। সেই সুরে ক্লান্তি মিলিয়ে যেত।
"স্বাধীনতার গান মানুষকে আশা দেয়—এটাই তার শক্তি।"
এভাবেই ডিসেম্বর এল। বাতাসে অদ্ভুত উত্তেজনা। সবাই জানত—চূড়ান্ত সময় কাছে।
রফিক স্যার বললেন—“স্বাধীনতা মানে শুধু জমি ফিরে পাওয়া নয়; স্বাধীনতা মানে মানুষের মর্যাদা ফিরে পাওয়া।”
তারপর এল সেই দিন—১৬ ডিসেম্বর।
আকাশ ছিল নির্মল, বাতাস ছিল শান্ত। দাদুর চোখ ঝলমল করে উঠল—“হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে—এই খবর শুনে আমরা দৌড়ে গিয়েছিলাম মাঠের দিকে। মনে হয়েছিল সূর্যটা নতুন করে উঠেছে।”
ঘরে ফেরার পথে সবাই দেখল—ক্ষতি, অশ্রু, হারানো মানুষ। তবুও প্রতিটি মুখে ছিল বিজয়ের আলো।
দাদু আমাদেরকে বললেন—“আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু স্বাধীনতাকে সুন্দর করে গড়ার দায়িত্ব তোমাদের। কারণ স্বাধীনতা শুধু একদিনের জয় নয়—এটা প্রতিদিনের কাজ।”
উঠোনে হালকা বাতাস বয়ে গেল। আমরা দাদুর হাত ধরলাম। সেই হাতে যেন যুদ্ধের সময়ের কাঁপুনি আর সাহস দুটোই রয়ে গেছে।
দাদু মৃদু হেসে বললেন—“ইতিহাস মনে রাখো, বাবারা।
ইতিহাস মানুষকে বড় করে।”
-------------++----------------
গল্প লেখক: আল-মামুন রেজা
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতিচারনমূলক গল্প।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।