#গঙ্গার_সৎ_অসৎ
পর্ব ১০
[ লেখকের অনুমতি নিয়ে ই- নলেজ আইডিয়াতে গল্পটাকে কোনো রকম সংযোজন - বিয়োজন ছাড়া আপলোড করা হয়েছে । আসল লেখার লিংক নিচে ]
আবিদ শম্ভুকে সাথে নিয়ে সাধুজীর বাড়ীর চারপাশে ঘুরে দেখলো। সাধুজীর বাড়ীর পরিধিটা অনেক বড়। বোঝাই যাচ্ছে কোনো এক কালে এই বাড়ী ছিলো ব্রাক্ষ্মণ বনেদী বাড়ী। দোচালা পাকা বাড়ী।
বাড়ীর সামনে বৈঠক খানা, গ্রামের ভাষায় কাচারী ঘর। বৈঠক খানার পরে মূল পাকা বাড়ী। পেছনে বড় পুকুর, নারিকেল আর সুপারী গাছের বাগান। আবিদ আর শম্ভু বৈঠক খানার ভেতরে ঢুকলো। এই বৈঠক খানা কেই সাধুজী পূজার ঘর করেছেন। আছে মাটির তৈরি ছোটো ছোটো রাধা কৃষ্ণের ভাস্কর্য এবং মা দূর্গার প্রতিমা। এখানেই এসে গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় পূজা আর্চনা করে। আবিদ দেখলো লোকজন ভেতরে আসে, পূজা দিয়ে প্রতিমার সামনে যে যা পারে শুকনো খাবার রেখে চলে যাচ্ছে। শার্ট আর লুঙ্গি পড়া একটি ছেলে কিছুক্ষন পর পর খাবার গুলো নিয়ে মূল বাড়িতে রেখে আসছে।
এই ছেলেটি সাধুজীর সেবক। শম্ভু ছেলেটিকে জানালো আবিদ আর সে সাধুজীর সাথে দেখা করতে এসেছে। কিছুক্ষন পরে তারা সাধুজীর মূল বাড়ীতে ঢোকার সুযোগ পেলো। আবিদ শম্ভুকে জানিয়ে দিলো মানসীকে দেখার বিষয়টা সাধুজী কে যেনো না বলে।
সাধুজীর সাথে দেখা হলো। আবিদ দেখলো সাধুজী খুব রাশভারী লোক। বয়স হবে ৭০। ফাদার যেভাবে আন্তরিক হয়ে কথা বলেছেন, ইনি তেমনটা নন। একটু চুপচাপ। মূল বাড়ীর প্রথম ঘরেই সাধুজী একটি কারুকাজ করা বড় কাঠের চেয়ারে বসে আছেন খালি গায়ে, কিন্তু গেরুয়া রঙের ধুতি আছে শরীরে। লম্বা শুকনা একজন মানুষ। গায়ের রঙ শ্যামলা। মুখে কোনো গোফ দাড়ি নেই। ক্লিন শেইভড। তীক্ষ্ম নাক, সরু চোখ। শম্ভু দুই হাত জড়ো করে সাধুজী কে মাথা নত করে প্রনাম করলো। তারপর আবিদ কে নিয়ে সাধুজীর কাছাকাছি যাওয়ার জন্য এগিয়ে যেতে নিলো, কিন্তু সাধুজী হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন।
সাধুজী আপাদমস্তক আবিদ কে দেখে বললেন "আমি তোমারে ঠিক চিনলাম না বৎস"। শম্ভু মাথা নত করে বললো "আজ্ঞে এই কর্তা বাবু হইলেন আমাগো ফয়েজদার বন্ধু, চৌধুরী বাড়ীর মেহমান, নাম আবিদ"।
সাধুজী আবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন "আমার কাছে কি প্রয়োজন"?
আবিদ অনেকটা আজ্ঞাবহ হাসি দিয়ে বললো "সাধুজী আমি ফয়েজের কাছে আপনার কথা, আপনার জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা নিয়ে অনেক গুনগান শুনেছি, তাই দেখা করতে এলাম। আরো শুনেছি আপনি জ্যোতিষবিদ্যায় পারদর্শী, তাই নিজের বিষয়েও একটু আলাপ করতে চাই"।
সাধুজী মুখে পান দিতে দিতে বললেন "বলো কি বলিবা"?
সাধুজী চেষ্টা করছেন ঢাকা শহর থেকে আসা একটি ছেলের সাথে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে, কিন্তু সেটা সাধু ভাষা হয়ে যাচ্ছে। সাধুজী তার সেবক ছেলেকে ডেকে আবিদ আর শম্ভুকে বসার জন্য চেয়ার দিতে বললেন। তারা বসার পরে সাধুজী আবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন " যেই উদ্দেশ্যে করিয়া আসিয়াছো, তাহা তোমার পূর্ন হইবে না, তোমার ও রাহুকাল ভ্রষ্ট হইবে ফয়েজের মতো। ফয়েজ কে কতোবার বারন করিয়াছিলাম সরকারি কাজ কর্মের বিরুদ্ধে বেশি কথা বলিও না, কিন্তু না ফয়েজ আমার কথার পাত্তাই দিতো না, বলিয়াছিলাম বিরোধী পক্ষের হইয়া ইলেকশন লড়িও না, তাহাও শুনিলো না। আমার চৌদ্দ পুরুষ ব্রাক্ষ্মণ জোতির্বিদ রহিয়াছেন, আমরা যাহা বলি আজ না হোক কাল অবশ্যম্ভাবী হইবে।
সাধুজী ভাষন দেয়ার মতো কথা বলছেন।
আবিদ দেখলো সাধুজী যেই পরিমাণ রাশভারী লোক, ঘরের ভেতরে ঢোকা হয়তো পছন্দ করবেন না। তার ইচ্ছা ছিলো পুরো বাড়ীর ভেতর এবং বাহির টা দেখার। আবিদ সাধুজীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বললো "সাধুজী আপনার চৌদ্দপুরুষের বংশ পরম্পরা তো তাহলে থেমে গেলো, আপনি তো বিয়ে থা করেন নি।
সাধুজী বিরক্তির চোখে তাকিয়ে বললো " ব্রাক্ষ্মনদের কোনো বিনাশ নেই, আমি বিয়ে করি নি তো কি হয়েছে, আমার জ্যেঠা কাকাবাবু এবং তাদের ছেলেপুলেরা সংসারী, আমি জনসেবায় সংসার ত্যাগ করেছি, সংসার ধর্ম ত্যাগ করেই সাধনা অর্জন করা যায়।
আবিদ অবাক হয়ে বললো "তবে কি এতো বড় বাড়ীতে আপনি একা থাকেন"?
সাধুজী বিরক্তির সুরে বললেন " একা হবো কেনো? ঠাকুর দেবতারা আছেন আমার সাথে, গ্রামের ভক্তরা আছে"। এই পর্যন্ত বলে সাধুজী তার পাশে থাকা টেবিলে তামার পাত্রে ঢেকে রাখা পানি নিয়ে পান করতে নিলেন।
আবিদ পরিস্কার দৃষ্টিতে সাধুজীর দিকে তাকিয়ে থেকে বললো "আমার উদ্দেশ্য পূর্ন হইবে না কেনো সাধুজী? উদ্দেশ্য পূরনের জন্য কি করতে পারি?
সাধুজী পানি পান করতে করতে এই কথা শুনে বিষম খেলেন, বললেন " তোমার কিছুই করনীয় নেই, নিজ গন্তব্যে ফিরিয়া যাও" বলেই সাধুজী উঠে দাড়িয়ে আবার বললেন "এখন আমার পূজার সময়, আজ আর এর বেশী সময় দিতে পারিতেছি না" বলে সাধুজী ভেতরে ঘরে ঢুকে গেলেন।
সেবক টি ওদের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি হয়ে বললো "আমনেরা ওঠেন, পূজার ঘরে যান, বসতে চাইলে ওইহানে বসেন।
আবিদ অবাক হয়ে জিগেস করলো "পূজার জন্য সাধুজী পূজার ঘরে যাবেন না? বাড়ীর ভেতরে ঢুকলেন কেনো"?
সেবকটি বিরক্ত হয়ে বললো " এতো কথা বলেন কেন? এইটা সাধুজীর সাধনার সময়, সে নির্জনে নিজের ঘরেই সাধনা করেন"।
আলেয়া তার চাচাতো বড় বোন মদিনা এবং ছোটো আরেকজন চাচাতো ভাইয়ের সাথে খালের পাড়ে নৌকার জন্য দাড়িয়ে আছে, তারা গন্জে যাবে। মদিনা আর আলেয়া গঞ্জের লাইব্রেরি থেকে বইয়ের গাইড কিনবে। আর এই সুযোগে মদিনা তার হবু স্বামীর সাথে দেখা করবে। তাদের সাথে পুরুষ অভিভাবক হিসেবে যাচ্ছে মদিনার ছোটো ভাই মানিক। আলেয়া আর সে সমবয়সী। এই গ্রামে ছোটো এই খালের পাড়ে সব সময় একটার পর একটা নৌকা থাকে। মাঝি বাড়ীর সবার পেট চলে এই নৌকাগুলো দিয়ে। অনেক জেলেও মাছ ধরার পাশাপাশি নৌকায় যাত্রী পাড় করে।
দূর থেকে আলেয়া কে দেখে সুজন ঝড়ের গতিতে নৌকা বেয়ে আসছে, তারা যেনো সুজনের নৌকাতেই উঠতে পারে, অন্য কারো নৌকায় যেনো উঠতে না হয়।
সুজন নৌকা বাইছে, নৌকায় আর অন্য কোনো যাত্রী সে নেয় নি, মদিনা আর মানিক কথাবার্তা বলছে, কিন্তু সুজন খেয়াল করলো আলেয়া একেবারেই চুপচাপ, তার ভাই রহিম মারা গেলো আজ তিন মাস, সে যেনো একেবারেই বোবা মতো হয়ে গেছে, খায় না ঠিকমতো, সাজপোশাক ও অনেকটা হতচ্ছাড়া মতো। কারো প্রতি তার কোনো অভিযোগ নেই। সুজন আলেয়ার দিকে দেখছে বার বার, সে মদিনা আর মানিকের সাথে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করছে, ইচ্ছা আছে এই সুযোগে আলেয়ার সাথে কথা বলার, কিন্তু আলেয়ার কারো কোনো কথপোকথনে খেয়াল নেই। সে সুজনের দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। আলেয়া কালো রঙের বোরখা পড়ে আছে। সুজনের খুব ইচ্ছা অন্তত আলেয়ার কন্ঠ স্বর শোনার, কিন্তু সে নৌকায় একেবারেই চুপ হয়ে আছে, মদিনা আর মানিকের সাথেও কোনো কথা বলছে না। সুজন খুব ধীরে ধীরে নৌকা বাইছে। বেলা ১১ টা বাজে। আকাশে রোদের তাপ। সুজন দেখলো আলেয়ার শ্যামলা বরন মুখখানি রোদের তাপে জ্বল জ্বল করছে। সে কোনোদিন আলেয়ার সাথে সরাসরি কথা বলে নাই, তাদের শুধু চোখে চোখে কথা হয়েছে, সে গন্জের হাট থেকে আলেয়ার জন্য একটি সুন্দর চুলের ক্লিপ আর একজোড়া সিটি গোল্ডের কানের রিং কিনেছে, কিন্তু আলেয়া কে দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, তার ভাই মারা যাবার পরে সে স্কুলে আসা এক রকম ছেড়েই দিয়েছে। সুজনের নৌকা গন্জের পাড়ে আসলো, সবাই নেমে যাচ্ছে। সুজন ও নৌকা বেধে রেখে ওদের পেছন পেছন যাচ্ছে, সে আলেয়া কে ডেকে কথা বলতে চায়। মাঝি, জেলে আর বাইদা রা বড় বাড়ীর কাউকে নাম ধরে ডাকার নিয়ম নেই। বংশ মর্যাদায় বড় বাড়ীর লোকেরা যতোই বয়সে ছোটো হোক, ছোটো বাড়ীর লোকেরা তাদের নাম ধরে ডাকা টা এক রকম যেনো দন্ডনীয় অপরাধ। আলেয়া খেয়াল করেছে সুজন আসছে পেছন পেছন, তাই সে মদিনা আর মানিক কে একটু দূরে রেখে পিছনে পড়েছে। সুজন আলেয়ার মোটামুটি কাছাকাছি এসে বললো "আলেয়া একটু খাড়াও"। এই প্রথম সে আলেয়ার সাথে কথা বললো। আলেয়া তো ভয়ে অস্থির মদিনা আর মানিক আবার শুনে ফেলবে কিনা। আলেয়া পেছনে সুজনের দিকে ফিরলো। সুজন ভয়ে ভয়ে খুবই আস্তে আস্তে বললো "কাইল স্কুলে আইও, শিমুল গাছটার গোড়ায় একটা লাল রঙের পেকেট রাখমু, নিও, তুমি নিলে আমি খুশি হইমু"। আলেয়া কোনো জবাব দিলো না, সে উল্টোদিকে হাটা শুরু করলো, মদিনা আর মানিক কিছু দেখে ফেলার আগে তাকে ওদের কাছে যেতে হবে।
করিম কল পাড়ে গোসল করছে। তহমিনা করিম কে এই গ্রামের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছে। সে রান্নাঘরে কাজ করছে। তার শশুরবাড়ীতে মেহমান আসবে। তহমিনার ননদ কে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে। ইকু বেপারী বাড়ীতে নেই। সে জেলা সদরে গেছে তার ব্যবসার কাজে। বাড়ীতে আছে তহমিনার শশুড় শাশুড়ী, বিবাহ যোগ্য দুই ননদ, ভাসুর দেবর তাদের স্ত্রী সন্তান। তার মৃত ছেলে রহিমের জন্য দুই ফোটা চোখের পানি ফেলার পর্যন্ত সময় নেই, সংসারের কাজের চাপে। ছেলে করিমকেও ভালোভাবে দেখ্ ভাল করতে পারছে না, এই সংসারে তহমিনা করিম কে রাখে, আগের স্বামীর তিন বাচ্চার মা সে। সে বোঝে যে রাজরানীর মতো পায়ের উপরে পা তুলে সে এখানে থাকতে পারবে না, তার কোনো আফসোস নেই। সে তার স্বামী এবং শশুড় বাড়ীর ব্যবহারে খুবই সন্তষ্ট। সে সাত পাচ ভাবতে ভাবতে চুলার পাড়ে রান্না করছে। ছোট্র করিম গোসল শেষ করে এসে বললো "আম্মা পুকুর পাড়ে রাস্তার মাথাত এক মহিলা আইয়া খাড়াইয়া আছে, আমারে কইলো বাড়ীর ভেতরের কাউরে ডাক দিয়া আনো"। তহমিনা ভাবলো ছেলেপক্ষ হয়তো এসে পড়েছে। সে তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে আগত মহিলার সাথে কথা বলার জন্য ঘর থেকে বের হলো। তহমিনা দেখলো বাড়ীর রাস্তার মাথায় অল্পবয়সী একটি গর্ভবতী নারী দাড়িয়ে আছে। তহমিনা এগিয়ে গেলো ঐ আগত নারীর কাছে, ছেলে পক্ষের কেউ ভেবে বললো " আসেন ভেতরে আসেন, আফনে একলা কেন? সাথে আর কেউ আসে নাই?
ঐ নারী ঝাঝালো কন্ঠে উত্তর দিলো "এই বাড়ীতে আইতে হইলে আমার সাথে কাউরে দরকার নাই, আমি একলাই যথেষ্ট, ইকু বেফারীর সন্তান আমার গর্ভে, যহন ই বিয়া করতে কইসি, সে মোবাইল বন্ধ কইরা, যোগাযোগ বন্ধ কইরা দিসে, আমি পুলিশে খবর দিসি, আইজ একটা হ্যাস্তন্যাস্ত করবো"
তহমিনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো,,,,,,,,,,,
✍️ #Imi_Chowdhury
#ইমি_চৌধুরী
Imi Chowdhury
চলবে,,,,,,,,,,
পর্ব ৯
https://www.facebook.com/share/p/aaYCUyz2ARuN1zNB/?mibextid=oFDknk
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।