#গঙ্গার_সৎ_অসৎ
পর্ব-৫
[ লেখকের অনুমতি নিয়ে ই- নলেজ আইডিয়াতে গল্পটাকে কোনো রকম সংযোজন - বিয়োজন ছাড়া আপলোড করা হয়েছে । আসল লেখার লিংক নিচে ]
কাসেম মিয়া খুব চিন্তিত। বিভিন্ন রকম চিন্তা আর আফসোসে তাকে ঘিরে ধরেছে। কাসেম মিয়া লম্বা চওড়া শক্ত সামর্থ্য বনেদী পুরুষ। বয়স ৪০-৪৫ হবে। আজ থেকে বিশ পচিশ বছর আগে জেলা সদরের ক্লাবে সে নামকরা ফুটবলার ছিলো। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় তার ভ্রমন করার সুযোগ হয়েছে ক্লাবের ফুটবল টিমের সাথে। তখন শার্ট প্যান্ট পড়ে বাবু সাহেব ভাব নিয়ে চলতো, এখন লুঙ্গি পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য কিছু পড়ে না।
তার ছেলে রহিমের গায়ে খুব জ্বর। মাত্র সাত বছরের ছেলেটা জ্বরে খুব কষ্ট পাচ্ছে। কাসেম মিয়া চিকিৎসার কোনো কমতি রাখে নাই। গন্জের ডাক্তার বাড়িতে এনে দেখিয়েছে, মাজারের বাবাকে এবং পুরোহিত বাবাকে বাড়িতে দাওয়াত করে এনে খাইয়েছে আর ছেলের জন্য তদবির তাবিজ নিয়েছে, তবুও জ্বর ওঠে আর নামে। সুস্থতার লক্ষন নেই।
আলেয়াও বাড়িতে নাই। স্কুলে তার পরীক্ষা চলে।
কাসেম মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী আসমা সবে গোসল করে ঘরে এসেছে। সে স্ত্রীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, একেবারে কাচা সোনা গায়ের রঙ, আজ পাচ বছর হলো তাদের বিয়ে হয়েছে, কিন্তু আসমার গায়ের রঙে কোনো ভাটা পড়ে নাই, গরীব ঘরের মেয়ে, এজন্যই তো তিন সন্তানের বাবার কাছে তার বিয়ে হয়েছে। মুখখানি এতো মায়াকাড়া যে বয়স টা কত আন্দাজ করা যায় না, ২৫ থেকে ৩৫ এর ভেতরে হবে বয়স। আসমার ভেজা চুলে, শাড়ি কাপড়ের জায়গায় জায়গায় ভেজা, কাসেম মিয়ার খুব ইচ্ছা হচ্ছে আসমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু তিনি এখন তা করবেন না। আসমার উপরে সে রাগ করে আছে। সে গলা খাকারি দিয়ে আসমা কে বললো "আসমা বেগম তুমি আইজ কামডা ভালা করো নাই"
আসমা খুব বিচলিত হয়ে ভয় পাওয়া গলায় বললো, "জে,,, কোন কামের কথা কন ?
কাসেম মিয়া আসমার দিকে তাকিয়ে ঝাঝালো মেজাজী গলায় বললো, তুমি বড় ভাবীর লগে আইজ সুপারি বাগানের গাছের ভাগ লইয়া তর্ক করসো, বিষয়ডা অন্যায় হইসে, যদি আমার বড় ভাই ভাগে দুইডা বেশি নেয়, নিবো, অসুবিধা কি, আমার ই তো ভাই, তুমি বাড়ির নতুন বৌ হইয়া এইসব বিষয়ে কথা কও কেন? আমি কি তোমার আইজ পর্যন্ত কোনো চাওয়া পূরন না করসি? আমি বাজার থেইকা আইয়া বাড়িতে ঢুকতে নিয়া তোমার তর্ক শুনতে পাইসি। আমি বাড়িতে উপস্থিত না থাকলে তুমি কারো লগে তর্কে জড়াও কেন?
আসমা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, যখনি সে বুঝতে পারে কাসেম মিয়া রেগে আছে বা যাবে, সে কোনো এক ফাকে তার বুক থেকে ধীরে ধীরে কাপড় সড়িয়ে ফেলে,ভাব তার এমন থাকে যে বুকের কাপড় সরে গেছে, এইটা সে জানে না। কিন্তু আসলে জানে, কাসেম মিয়ার মন ডাইভার্ট করার এটা খুব ভালো একটা টেকনিক, সে দেখেছে এটায় কাজ হয়। কথা বলতে বলতে আসমার দিকে তাকালে কাসেম মিয়ার কন্ঠস্বর নরম হয়ে আসে।
আসমা টেকনিক শুরু করলো এবং বললো " বড় ভাবী ই আগে কথা শুরু করসে, আমি করি নাই, বিশ্বাস করেন আফনে।
কাসেম মিয়া আসমার দিকে তাকালো, সত্যি সত্যিই আসমার টেকনিক কাজ করেছে, কাসেমের ইচ্ছা হচ্ছে আসমাকে কোলে নিয়ে খাটে ফেলতে, কিন্তু সময় নেই তার গন্জে যাইতে হবে। সে খাট থেকে উঠে দাড়িয়ে আদরের সুরে আসমার থুতনী ধরে বললো "তোমার বাপের বাড়ি থেকে যে যখন যা সাহায্য চাইসে, আমি কি দেই নাই, কও আসমা? তোমার ছোডো ভাই গন্জে মোবাইলের দোহান দিবো, ধার চাইসে দেড় লাখ, আমি সাথে সাথে দিসি, আইজ পর্যন্ত মুখ ফুইটা টাহা ফেরত চাই নাই, দুই বছর হইলো টাহা নিসে তোমার ভাই, তোমার ছোডো বইনের বিয়ার সময় তোমার বাপ কিছু টাহা চাইলো, তহন ও আমি দিসি দুই লাখ, ঐডা তো শালিরে এমনেই দিসি, ঐডা আমি ফেরত নিমুও না কোনোদিন, তোমারে এই বাড়ি তিন ভরি সোনা দিয়া বৌ কইরা আনসি, যহন যা চাইসো, তাই ই দিসি, আরো দিমু, আমার সব তো তোমার আর আমার মাইয়া পোলার ই। হেই তুমি যদি আমার ভাই ভাবীর লগে ভাগ বাটোয়ারা নিয়া কথা কও, এইডা কি তোমার উচিত?
আসমা নিচের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো আর এই ভুল হইবো না, মাফ চাই।
কাসেম মিয়া খুশি হলো, ভাবলো " নতুন বৌডা বড় ভালা, তহমিনা হইলে এতোক্ষনে তর্ক কইরা বাড়ি মাথায় উডাইতো, একটা কথা মাডিতে পড়তে দিতো না তহমিনায়, আর আমারও এতোক্ষনে হাত উইঠা যাইতো ঐ খবিশের উপরে। সে আসমাকে বললো "তহমিনা, আমি একটু ঘুমামু, তারপরে গন্জে যামু, আমারে বিরক্ত কইরো না, মাথা ব্যাথা করে, তুমি রহিমের দিকে খেয়াল রাইখো। আসমা অভিমানের সুরে বললো , আমার নাম তহমিনা না, আসমা। আফনে তারে ভোলতেই পারেন না। সারাদিন আইজ রহিমের কাছেই ছিলাম, রানতে দেরি হইসে, তাই গোসল করতেও দেরি হইসে। আপনে ঘুমান, আমি রহিমের ঘরে যাই।
কাসেম মিয়া দরজা ভেজিয়ে শুয়ে পড়েছে, কিন্তু তার ঘুম আসে না। সে লজ্জিত আসমাকে ভুলে তহমিনা ডাকার জন্য, এই ভুলটা তার প্রায়ই হয় অনিচ্ছায়। আলেয়া রহিম কেউ অসুস্থ হলে তার খুব ওদের মা তহমিনার কথা মনে পড়ে আর ভাবে আহ্ তহমিনা কি করলি?? তার মনে পড়ে তহমিনা একদিন কল পাড়ে গোসল করে ঘরে আসলো, কাসেম তখন বললো "মিয়া বাড়ির বৌরা এতো খোলা গোসল করে না, বাড়িতে পাকা গোসলখানা আছে, গোসলখানার ভেতরে ঢুইকা দরজা বন্ধ কইরা গোসল করবা কতদিন কইসি তোমারে, সাথে সাথে তহমিনা শুরু করলো চোপা, আমি কলপাড়ে করুম, নয়তো পুকুরে ডুব দিয়া করুম, আমার ইচ্ছা, গোসলখানার ভিতর ঢুকলে আমার দম বন্ধ হইয়া আসে। কাসেম মিয়া জবাবে বলেছিলো " আরে খবিশনী তুই যহন পুকুরে ডুব দিয়া ওডোস, আশে পাশের মানুষ তোরে ভিজা শরীরে দেহে না? তোর শরম করে না? তহমিনা মুখ ঝামটা দিয়া বলতো "শরম করে না।
কাসেমের আরো মনে পড়ে তহমিনা যেদিন চলে গেলো, গ্রামের মসজিদে তখন একজন বয়স্ক ইমাম হুজুর ছিলো, হুজুর কাসেম কে বলেছিলো " বাবাজী বৌ ঝি গোরে পর্দায় রাখতে হইবো, নিজেও নজর হেফাজতে রাখতে হইবো, আল্লাহর রাসূল বলিয়াছেন "দেবরের সহিত করিতে হইবে সীসা পরিমান পর্দা", অর্থাৎ আপন দেবর ভাসুর এবং দুলাভাই এর সামনে কঠিন পর্দা করিতে হইবে, বহু জায়গায় আপন ভাসুর দেবরের সাথে ভাবী চইলা গেসে, আপন বোইনের সংসার ভাইঙ্গা দুলাভাইরে নিয়া শালী চইলা গেসে, আর ইকু তো তোমার আপন ভাই আছিলো না, দূরের আত্বীয় আছিলো, আত্মীয়দের সামনে তোমাগো বাড়ির বৌগো পর্দা ঠিক করো, নয়তো এমন ঘটনা আরো ঘটবো। আগের হুজুরের কথাগুলো মনে পড়লে কাসেম মিয়া আসমাকে নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে। আসমা ঢেকে ঢুকেই চলে পর পুরুষদের সামনে, তহমিনার মতো না সে।
পরদিন সকালে কাসেম মিয়া আর আলেয়া অসুস্থ রহিম কে নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রওনা হলো, আগে গন্জে যেতে হবে, সেখান থেকে লঞ্চে যাবে জেলা সদরে।
রহিমের অবস্থার দিন কে দিন অবনতি হচ্ছে, তারা খাল পাড় হয়ে গন্জে যাবার জন্য সুজনের বড় নৌকায় উঠেছে। নৌকায় আরো আছে গ্রামের মসজিদের বর্তমান ইমাম হুজুর এবং বাইদানী মানসী, মিশনারীজের ফাদার, আরো গ্রামের কিছু লোক। ইমাম হুজুর যাচ্ছে গন্জে তার বোনের বাড়ীতে, মানসী যাচ্ছে গন্জে রঞ্জু চাটুজ্যের ওষুধের দোকানে, আর ফাদার যাচ্ছে গন্জে তাদের মিশনারীজ এনজিওর একটা মিটিংয়ে।
গ্রামের সকালের স্নিগ্ধ হাওয়ায় নৌকা পানিতে ভেসে চলছে, সুজন আড়চোখে বার বার মলিন আলেয়াকে দেখছে, বড় মায়া হচ্ছে তার। কিন্তু আলেয়ার সুজনের দিকে খেয়াল নেই, সে তার অসুস্থ ভাইয়ের জন্য অস্থির।
নৌকায় অসুস্থ রহিম কাসেম মিয়ার কোলে জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল বকছে, একবার ডাকে আম্মা,,, একবার ডাকে দাদু,,,,, ওর কথা শুনে আলেয়া বললো "আব্বা নানা বাড়িতে একটা খবর পাডাইয়া দেন, রহিমে আম্মারে এতো দেখতে চায়,,,,, কাসেম মিয়া রেগে বললো অয় তো তোর মরহুম দাদুরেও ডাকতাসে, এহন আমি কি আমার মরা মায়রে কবর থেইকা উঠাইয়া আনমু? তহমিনা দুই বছরের রহিম করিম রে যহন ফালাইয়া গেলো আমার মায় তহন বাইচা আছিলো, ছাওয়াল দুইডারে পালসে, মায় যদি তহন না থাকতো কে পালতো এই দুইটা দুধের বাচ্চারে? কোন মুখে তহমিনা রে খবর পাঠাইতে কস?
এবার ইমাম হুজুর ওদের কথা শুনতে পেয়ে বুঝানোর ভঙ্গিতে বললো, শুনো কাসেম মিয়া অসুস্থ পোলাডায় নিজের মায়রে দেখতে চায়, দেহার ব্যবস্থা করো, সবখানে রাগ দেহাইলে চলে না মিয়া, তয় তোমরা কিন্ত কেউ কাউরে দেহা দিও না, তালাকের পরে দেহা দেওন জায়েয নাই, শুনলাম তুমি পোলাডারে এতোদিন বাড়িতে রাইখা ওষুধ খাওয়াইসো, আবার মাজার আর পুরোহিত থেইকা তাবিজ নিসো, শোনো কাসেম মিয়া তোমরা এই যুগের লোক হইয়া যদি এতো কুসংস্কারে থাকো, তাইলে হইবো? কতদিন কইসি তোমাগোরে রোগের শেফা দেওয়ার মালিক আল্লাহ, কোনো বাবার সাইধ্য নাই শেফা দেওয়ার, তোমরা এইসব কুসংস্কার থেইকা কবে বাইর হইবা কও তো? শেফার লাইগা আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হয়, ডাক্তার দেহাইতে হয়, আল্লাহ চাইলে ডাক্তারের ওষুধ খাইয়া রোগী ভালো হইবো।
কাসেম মিয়া ইমাম হুজুরের কথায় কোনো জবাব দিলো না, তবে হুজুরের কথা শুনে মিশনারীজের ফাদার একটু মিটি মিটি হাসলেন, এটা কেউ খেয়াল করে নি।
সবাইকে গন্জে নামিয়ে দিয়ে আবার ফিরতি নৌকায় অন্যান্য যাত্রী নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হলো সুজন। নৌকায় মোটামুটি সবাই কম বেশি গ্রামের চেনা লোক, কেউ হয়তো আশ পাশের গ্রামের, কিন্তু একজন লোক অন্যরকম। পুরাই ভিন্ন। এই লোক কে সুজন আগে কখনও অত্র এলাকায় দেখে নি।
দেখে শহরের সাহেব বাবু মনে হয়। বাংলা সিনেমার নায়কদের মতো দামী শার্ট প্যান্ট তার গায়ে। সাথে একটি লাগেজ।
বিদেশি সেন্টের ঘ্রানে নৌকা পুরা মোহিত। সুজন মনে করার চেষ্টা করলো এই পারফিউমের ঘ্রান আগে যেনো কোথায় পেয়েছে, মনে করতে পারছে না। গ্রামের ঘাটে আসার পরে একে একে সব যাত্রী যখন ভাড়া মিটিয়ে নামছে, ঐ সাহেব বাবু নামার সময়ে সুজনের দিকে তাকিয়ে শুদ্ধ ভাষায় জিগেস করলো সুজন ভাড়া কত তোমার? সুজন অবাক হয়ে বললো ৫০ টাহা কিন্তু আফনে আমার নাম জানেন কেমনে? সাহেব বাবু মিষ্টি হেসে সুজনের দিকে একশো টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বললো, নাও পুরোটা রাখো। বলে সে চলে যেতে নিলো, সুজন তাকে থামিয়ে বললো, আফনেরে এই গ্রামে আগে কখনও দেহি নাই, আফনে কেডা ভাইজান? সে সুজনের কাধে এক হাত রেখে বললো, "সুজন মিয়া আমি তোমার ফয়েজ চৌধুরী ভাইয়ের বন্ধু, আমরা একি ইউনিভার্সিটি পড়েছি, চৌধুরী বাড়িতে এসেছি,,,, তোমার সাথে আমার আরও অনেক কথা আছে, তবে এখন আমি ক্লান্ত, আগে ফয়েজের বাড়িতে যাই, পরে আবার তোমার সাথে দেখা করবো,,,,,,,, আসি,,,, ও হ্যা আমি আবিদ, আবিদ খান।
✍️ #Imi_Chowdhury
#ইমি_চৌধুরী
চলবে,,,,,,,
পর্ব ৪
https://www.facebook.com/share/p/g15uNPqUgswupceu/?mibextid=oFDknk
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।